ধুলোবালি মাখা ইট-পাথরের শহর। এখানে সবুজের সান্নিধ্য পাওয়া দুষ্কর। বুক ভরে নিঃশ্বাস নেওয়ার মতো নির্মল বাতাসের খুব অভাব। এই যান্ত্রিক শহরেও ঋতু পরিবর্তন হয়। প্রকৃতি বৈচিত্র্যময় রূপে সাজে।
আশ্বিনের আকাশে কখনো সাদা তুলোর মতো মেঘের ভেলা ভেসে বেড়ায়; কখনো ঝলমলে রোদ, কখনো ঝুপ করে নামে বৃষ্টি! আবার কিছুক্ষণ পরেই ইট-পাথরের সুউচ্চ প্রাচীর ভেদ করে বহুরূপী আকাশে হেসে ওঠে সূর্য মামা, আকাশ বিলায় নজরকাড়া মুগ্ধতার নীল!
মৃদুমন্দ বাতাস হিমেল পরশ বুলিয়ে জানান দিয়ে যায়, শরতের কোমল কাশফুলের মিষ্টি বার্তা। শরৎ মানেই কাশফুলের শুভ্রতা—মাঠজুড়ে কাশফুলের বাতাসে ঢেউ খেলানো নৃত্য। শরৎ এলেই মন হারিয়ে যেতে চায় কাশবনে। বাংলার সবুজ-শ্যামল প্রকৃতিতে শরতের আগমন আমাদের মুগ্ধ করে, করে বিমোহিত। এজন্যই শরৎকে বলা হয় ‘ঋতুর রানি’।
ভাদ্র-আশ্বিনজুড়ে শরৎকালের রাজত্ব। শরৎকাল এলেই গ্রামবাংলার ঝোপঝাড়, রাস্তাঘাট ও নদীর দুধারসহ আনাচে-কানাচে চোখে পড়ে কাশফুলের মন-মাতানো শুভ্র রূপ-মাধুর্য। শরতের কাশফুল প্রকৃতিকে সাজিয়ে তুলেছে অনন্য রূপে। প্রস্ফুটিত সাদা কাশফুলের রূপ-লাবণ্য ও নয়নাভিরাম সৌন্দর্য পর্যটকসহ প্রকৃতিপ্রেমী মানুষদের যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে।
শরৎকালে আকাশে সাদা তুলার মতো মেঘ ভেসে বেড়ায়। নদীর ধারে নরম কাশফুল বাতাসে দুলতে থাকে। নীল আকাশের নিচে ধবধবে সাদা কাশফুল বাতাসে দুললে শুভ্র সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো মনে হয়। এমন মনোরম দৃশ্য রোমাঞ্চকর অনুভূতি এনে দেয়।
কর্মব্যস্ত নগরবাসীর অনেকের দূরে কোথাও যাওয়ার ফুরসত নেই। কারো কারো আবার সাধ থাকলেও সাধ্যই নেই। তবে রাজধানীর ভেতরই রয়েছে এমন অপরূপ সৌন্দর্য দেখার সুযোগ। আর সেজন্য ছুটে যেতে পারেন ঢাকার কাছেই দিয়াবাড়ী। এছাড়া আফতাবনগর, ঢাকা উদ্যান, দক্ষিণখান, ৩০০ ফিট ও কেরানীগঞ্জের সারিয়াকান্দিতে রয়েছে কাশফুল। সারিয়াকান্দির অবারিত মাঠজুড়ে নদীর তীর ঘেঁষে বিশাল জায়গাজুড়ে রয়েছে কাশফুলের অরণ্য।
আফতাবনগরের কাশবন
কাশফুলের নিবিড় সান্নিধ্য পেতে কোনো এক ঝলমলে বিকালে ঘুরে আসতে পারেন আফতাবনগর। রাস্তার দুপাশে সবুজ গাছের সারি। ছায়ায় ঘেরা প্রশস্ত সড়কের দুপাশ দিয়ে ফুটে আছে সাদা কাশফুল। বিশাল খোলা প্রান্তরে কার্পেটের মতো বিছানো রয়েছে সবুজ ঘাস। ছায়াঘেরা সড়কের শেষ প্রান্তে নদী। ঢাকার ভেতরে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার জন্য আফতাবনগরে এমন খোলামেলা জায়গা ঘুরে আসতে পারেন।
রামপুরা সেতুর উত্তর-পূর্ব পাশে জহুরুল ইসলাম সিটির প্রবেশপথ দিয়ে খানিকটা এগোলেই লোহার সেতু। সেতু পেরোলেই যেন ভিন্ন জগৎ। ইট-কাঠের এই শহরে সবুজের সান্নিধ্য পেতে আর কাশফুলের হাসি দেখতে আফতাবনগরে এই সবুজ প্রান্তরে চাইলেই হারিয়ে যেতে পারেন। বিস্তৃত জায়গাজুড়ে রয়েছে নয়নাভিরাম কাশফুলের অরণ্য। লোহার সেতু পেরিয়ে আধা কিলোমিটার গেলেই কাশবন। কাশফুলের রূপে চোখ জুড়াবে, প্রশান্ত হবে প্রাণ।
নদীর তীরে কিংবা বিস্তৃত মাঠজুড়ে চলে কাশফুলের বাঁধভাঙা উল্লাস! কাশফুল মনের আনন্দে বাতাসে হেলেদুলে নৃত্য করে সৌন্দর্যপিয়াসীদের মোহাবিষ্ট করে রাখে। আর বিকাল গড়াতেই আকাশে দেখা যায়, এক ফালি চাঁদ। সন্ধ্যা গড়াতেই চাঁদের আলো উজ্জ্বল হতে থাকে। আর ভরা পূর্ণিমার রাত আর কাশফুলের রূপ তো বর্ণনাতীত। ২৩ সেপ্টেম্বর ছিল চোখ ঝলসানো জোছনা রাত। আকাশে পূর্ণ শশী আর ঝলমলে রুপালি আলো, জমিনে কাশফুলের অপরূপ সৌন্দর্য!
আফতাবনগর যেভাবে যাবেন : ঢাকার যেকোনো এলাকা থেকে প্রথমে রামপুরা ব্রিজে আসতে হবে। ব্রিজের পাশে আফতাবনগরের গেট। গেটের কাছেই রিকশা পাবেন, ভাড়া ৫০ থেকে ৬০ টাকা। রিকশায় ওঠার আগে ভাড়া ঠিক করে নেওয়া ভালো।
দিয়াবাড়ী : ঢাকার কংক্রিটের শহরে কিছু সময়ের জন্য স্বস্তি পেতে চলে যেতে পারেন প্রকৃতির নিখাদ মাধুর্যে ভরপুর দিয়াবাড়ী। রাজধানীর অদূরে উত্তরা দিয়াবাড়ী এলাকায় ফুটে আছে নজরকাড়া শুভ্র কাশফুল। এই অঞ্চলটি প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে খুবই প্রিয়। বিশেষ করে শরতের সময়, দিয়াবাড়ীর কাশবন যেন এক অনন্য রূপে সেজে ওঠে। সারি সারি কাশফুল দক্ষিণা হাওয়ায় দুলে ওঠে, রুপালি ঢেউ বয়ে যায়। সেই শুভ্র কাশের কোমল রূপ শুধু প্রকৃতিপ্রেমীদেরই বিমুগ্ধ করে না, সাধারণ মানুষকেও আকৃষ্ট করে। কাশফুলের এমন শুভ্র হাসিতে মানুষের মনও মোহিত হয়। ভ্রমণপিয়াসীদের করে মুগ্ধ ও আন্দোলিত।
আপনি চাইলে নিজে কিংবা প্রিয়জন নিয়ে হারিয়ে যেতে পারেন উত্তরার এই জায়গায়। দিয়াবাড়ীর বিশাল এক লেক ও লেকের বাঁধানো পাড়। এই লেকে উদাস হয়ে বসে থাকা ছাড়াও নৌকায় ঘুরতে পারবেন।
দিয়াবাড়ীর কাশফুল শরতের প্রকৃতির এক অনন্য উপহার। এ সৌন্দর্য শুধু চোখ জুড়ায় না, মানসিক প্রশান্তিও এনে দেয়। প্রকৃতির এই নীরব সৌন্দর্যের মাঝে কিছুটা সময় কাটানো আমাদের শরীর ও মনের জন্য অপরিহার্য। শহরের কোলাহল ভুলে প্রকৃতির সঙ্গে অবাধে সংযোগ স্থাপন করার জন্য দিয়াবাড়ীর পরিবেশ অনন্য।
দিয়াবাড়ী একটি প্রাকৃতিক এলাকা, উত্তরা এলাকার এ অঞ্চলে নদী বয়ে গেছে। নদীর পাড়ে এবং আশপাশের মাঠগুলোয় প্রচুর কাশফুল ফোটে। কয়েক বছর ধরে এটি একটি জনপ্রিয় ভ্রমণস্থল হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ছুটির দিনগুলোয় কাশফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য এ স্থান সৌন্দর্যপিয়াসীদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে।
বছরের অন্যান্য সময়েও মানুষ দিয়াবাড়ী ঘুরতে আসে। তবে শরৎকালে কাশফুলের অপরূপ সৌন্দর্য এ জায়গাটিকে আরো দৃষ্টিনন্দন ও আকর্ষণীয় করে তোলে। এখানকার মনোরম দৃশ্য, খোলা আকাশ এবং নদীর তীরে বাতাসে দুলতে থাকা কাশফুল প্রকৃতিপ্রেমীদের নজর কাড়ে, হৃদয় হরণ করে।
দিয়াবাড়ীতে কাশফুলের সমুদ্রের মাঝে বসে থাকা মানেই হলো প্রকৃতির সান্নিধ্য পাওয়া। নিস্তব্ধতা ও প্রশান্তিতে যেন কিছুক্ষণের জন্য জীবন পূর্ণতার স্বাদ পায়। কাশফুলের স্নিগ্ধতা ক্লান্তি দূর করে দেয় স্বস্তি; শহুরে জীবনের ক্লান্তি-কোলাহল, যানজট, দৈনন্দিন জীবনের চাপ আর অবসাদ দূর করে দেয় অন্যরকম আনন্দ। নীল আকাশ আর খোলা প্রান্তর মনে এনে দেয় নতুন উদ্যম ও শক্তি।
যারা নিয়মিত ভ্রমণে আগ্রহী, তাদের জন্য দিয়াবাড়ী উপযুক্ত স্থান। ঢাকার খুব কাছেই অবস্থিত হওয়ায় এখানে সহজেই পৌঁছানো যায়। শরৎকালে বিশেষ করে সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোয় পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে আসার জন্য দিয়াবাড়ী খুবই জনপ্রিয় একটি স্থান। আর মেট্রোরেল থাকায় যাতায়াত অনেক সহজ ও ঝামেলামুক্ত হয়েছে।
শরৎকালে বিকাল বা সকালবেলায় গেলে কাশফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন। আর সূর্যাস্তের সময় আলোকচিত্রের জন্য সময়টা অনেক সুন্দর। এভাবে পরিকল্পনা করে গেলে দিয়াবাড়ীর কাশফুলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পুরোপুরি উপভোগ করতে পারবেন।
কেরানীগঞ্জের সারিয়াকান্দি : ঢাকার পাশেই রয়েছে মাওয়া ও কেরানীগঞ্জের সারিয়াকান্দি। সময়-সুযোগ থাকলে চলে যেতে পারেন ঢাকার অদূরে সারিয়াকান্দি। সারিয়াকান্দির বিস্তৃত মাঠজুড়ে রয়েছে নয়নাভিরাম কাশফুলের রাজ্য। বাতাসের আলতো ছোঁয়ায় যখন কাশফুলগুলো হেলেদুলে হাসে, তখন মনে হয় কাশের সমুদ্রে ঢেউ খেলে যাচ্ছে। এই শুভ্র হাসির অনিন্দ্য রূপ ও মোহনীয় সৌন্দর্য বর্ণনাতীত, যা কিছু সময়ের জন্য হলেও আপনাকে স্বপ্নের সাগরে ভাসাবে, আবার ডোবাবে!
এই রূপে মুগ্ধ হয়ে ভাসতে ভাসতে আর ডুবতে ডুবতে হয়তো আনমনে আপনিও গেয়ে উঠতে পারেন—
‘আমার মাঝে নেই এখন আমি
স্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে স্বর্গে নামি
যেন অন্যরকম এক ভালোবাসাতে...।’
যতই থাকুক ক্লান্তি-অবসাদ, মনের গোপন প্রকোষ্ঠে জমা থাকুক বিরহ-বেদনা-দহন—নীল আকাশ, সাদামেঘের ভেলা আর চোখ জুড়ানো কাশফুলে ভরা শরতের এই নির্মল রূপ-মাধুর্য এক নিমেষে উধাও করে দেয় সকল বিষাদ। সবার মনে বাস করুক কাশফুলের শুভ্রতা, শরতের মেঘমুক্ত আকাশ!
দিয়াবাড়ী কীভাবে যাবেন
মেট্রোরেল : মেট্রোরেলে উত্তরা উত্তর স্টেশনে নেমে রিকশা বা অটো সিএনজি নিয়ে দিয়াবাড়ীতে পৌঁছাতে পারবেন।
বাস : উত্তরা বা মিরপুরগামী বিভিন্ন বাসে করে উত্তরার আজমপুর পর্যন্ত গিয়ে সেখান থেকে সিএনজি বা অটোরিকশা নিতে পারেন।