নারীরা মায়ের জাত; একদিকে পারে নিজের ঘর সামলাতে, তেমনি পারে বাইরের সব দিক সামলাতে। একজন মেয়ে প্রথমে কারো সন্তান, তারপর হয় তরুণী, তারপর কারো স্ত্রী এবং তারপর কারো মা। বিয়ের আগে নারী তার বাবার সংসারে পালিত হয়, আর বিয়ের পর স্বামীর সংসারে। একটা সময় নারীরা নিজেরা উপার্জন করত না। তারা যেকোনো কিছুর জন্য অন্যের ওপর নির্ভর করত। যাবতীয় দৈনন্দিন খরচ চালানোর জন্য তাদের অন্যের কাছে হাত পেতে টাকা নিতে হতো; যেমন নিজের হাত খরচ, মাসিক টুকিটাকি দ্রব্য ক্রয়, বাহ্যিক খরচ প্রভৃতি। এমনকি নিজের শখ পূরণ করতেও তাদের আরেকজনের মুখাপেক্ষী হতে হতো। তবে সময়ের সঙ্গে বদলেছে সমাজকাঠামো, বদলেছে সমাজের রীতিনীতি। নারী এখন শুধু সন্তান লালন-পালন আর সাংসারিক কাজে সীমাবদ্ধ নেই। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নারী আজ স্বাবলম্বী।
তারই এক অনন্য দৃষ্টান্ত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অন্তরা বালা। অনেক স্বপ্ন, আশা ও আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন। তিনি অনার্স তৃতীয় বর্ষে ফলিত পুষ্টি ও খাদ্য প্রযুক্তি বিভাগের ছাত্রী। তার বাসা নাটোরে। তিনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকেন। প্রথম দিকে বাসা থেকে টাকা নিয়ে নিজের যাবতীয় খরচ চালাতেন। তবে এতে তার পুরো মাসের খরচ চালানো কঠিন হয়ে যেত। বাকি সবার মতো শুরুর দিকে অন্তরা টিউশনি করতে শুরু করেন। তবে তা থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী তার উপার্জন হতো না। আবার বছরের বেশিরভাগ সময়ই টিউশনি পেতেন না। কিছু কিছু সময় এমন হয়েছে—যে সময়ে তার ক্লাস বা পরীক্ষা থাকে, সেই সময়গুলোয় টিউশনি পড়ানোর সময় নির্ধারিত হয়। এজন্য তিনি টিউশনি চালিয়ে যেতে পারেননি । ফলে অন্তরা ভাবলেন, এমন কিছু করতে হবে, যেটায় সারা বছর তার উপার্জন হবে, পাশাপাশি নিজের সুবিধামতো আয় করতে পারবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ঝাল চত্বরের সামনে তিনি প্রতিদিন ভ্রাম্যমাণ বা অস্থায়ী দোকান দেন, যেখানে মেয়েদের কসমেটিকস বা সাজের সামগ্রী পাওয়া যায়; যেমন—টিউব মেহেদি, সেফটিপিন, হেয়ার ব্যান্ড, মাথার ক্লিপ, আংটি, ব্রেসলেট, লিপস্টিক, কানের দুল, হাতের চুড়ি, গয়না, নাকফুল ইত্যাদি। সাজসামগ্রী ছাড়াও মোবাইল স্ট্যান্ড, মানিব্যাগ, হ্যান্ডব্যাগ, পকেট টিস্যু, চাবির রিং, ছোটোখাটো শোপিস, নেলকাটার, ডিজাইন কলম, পেনসিল, কলমদানিসহ হরেক রকম জিনিস পাওয়া যায়। মেয়ে শিক্ষার্থীদের ভিড় বেশি জমে অন্তরা বালার দোকানে। মাঝেমধ্যে ছেলে শিক্ষার্থীরাও তার দোকানে যান এবং পছন্দসই জিনিস কেনেন। তার দোকানে এসে কিছু না কিনে ফিরে যায় এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যা বিরল। তিনি যা যা আনেন রোজই প্রায় সবই বিক্রি হয়ে যায়। সাশ্রয়ী মূল্যে শিক্ষার্থীরা তাদের চাহিদা অনুসারে কোনো দ্রব্য এখানে পেয়ে থাকেন । দ্রব্যগুলোর দাম ২০ থেকে ১২০ টাকা হয়ে থাকে। সাজ ছাড়া অন্যান্য দ্রব্যের দাম ১৩০ থেকে ৩৫০ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে। অর্থাৎ, সুলভ মূল্যে দ্রব্য পান শিক্ষার্থীরা।
অন্তরা জানালেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ধনী, প্রভাবশালী থেকে শুরু করে নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানেরা পড়াশোনা করেন। তাদের সবার আর্থিক দিক বিবেচনায় রেখে অন্তরা শিক্ষার্থীদের সামর্থ্যের মধ্যে থাকে এমন দাম নির্ধারণ করেন। এজন্য সব ধরনের শিক্ষার্থীরা তার দোকানে আসেন। মাঝেমধ্যে তার কাছ থেকে কিছু কিনলে শিক্ষার্থীরা পরে টাকা পরিশোধ করে, অর্থাৎ বাকিতে দ্রব্য কেনার সুযোগ এখানে রয়েছে। মাঝে মাঝে বিশেষ অফার চলে তার দোকানে। তিনটা দ্রব্য কিনলে একটা ফ্রি পাওয়া যায়। প্রতিদিন অন্তরার আয় হয় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। অর্থাৎ প্রতি মাসে আনুমানিক ১২ হাজার থেকে ১৪ হাজার টাকা। এই টাকা দিয়ে তিনি তার একাডেমিক খরচ, বই কেনা, মাসিক হল ফি, খাওয়া খরচ, হাতখরচ সবকিছুই চালান। বাসা থেকে টাকা নেন না বললেই চলে। অন্তরা নিজে তো আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন, সেই সঙ্গে অন্য মেয়েদেরও অনুপ্রাণিত করেন নিজ উদ্যোগ, দক্ষতা ও সামর্থ্য অনুযায়ী আত্মনির্ভরশীল হওয়ার জন্য। অন্তরার এই কাজ অন্য নারীদের উৎসাহ জোগাবে নিজেই যাতে স্বাবলম্বী হওয়া যায়, সেজন্য। নারী শুধু ঘর নয়, হয়ে উঠবে নিজেই নিজের পথচলার কারিগর।