ঢাকা থেকে পাটলী ঘাট, নৌপথে অষ্টগ্রাম; এরপর মিঠামইন-নিকলী—পানি, প্রকৃতি ও মানুষের জীবনসংগ্রামের ইতিহাস সন্ধানে কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে এক স্মরণীয় সফর।
বাংলাদেশকে শুধু শহরের ব্যস্ততা, পাহাড়ের সবুজ কিংবা সমুদ্রের নীল দিয়ে চেনা যায় না। এ দেশের আরো একটি বিস্ময়কর ভূগোল রয়েছে—হাওর। বর্ষায় যেখানে মাঠঘাট ডুবে যায় পানির নিচে, সেখানে নৌকা হয়ে ওঠে মানুষের প্রধান বাহন; আর দিগন্তজোড়া আকাশ এসে মিশে যায় জলরাশিতে।
বাংলাদেশের সেই ভিন্ন রূপ দেখতে সরকারি ছুটির দিনটি কাজে লাগিয়ে আমরা কয়েকজন বেরিয়ে পড়েছিলাম কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে। ভ্রমণসঙ্গী ছিলেন বিক্রমপুরের শাহাদাত হোসেন মিঠু ও শেখ মাইনুল ইসলাম মোল্লা, শ্রীনগরের মিলন শেখ এবং সিরাজদিখানের নাসির উদ্দিন শেখ।
আমাদের গন্তব্য ছিল অষ্টগ্রাম, মিঠামইন ও নিকলী ঘুরে দেখা। তবে উদ্দেশ্য শুধু ভ্রমণ নয়—হাওরের প্রকৃতি, মানুষের জীবনযাপন, নৌপথ, যোগাযোগব্যবস্থার পরিবর্তন এবং পানির বুক চিরে জেগে থাকা অল-ওয়েদার সড়কের অনন্য বিস্ময় উপভোগ করাও ছিল এই অভিযাত্রার অংশ। সফরটি ছিল এক দিনের, কিন্তু অভিজ্ঞতার পরিধি ছিল অনেক বড়।
ভোরে ঢাকা থেকে যাত্রা শুরু
২৫ অক্টোবর, বুধবার। ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফোটেনি। সকাল ৫টায় ঢাকার ব্যস্ত সড়ক পেছনে ফেলে আমাদের যাত্রা শুরু। নগরের কংক্রিট ধীরে ধীরে বদলে গেল সবুজ গাছপালা, কৃষিজমি, ছোট বাজার ও গ্রামীণ জনপদে। নরসিংদীর ইটভাটা এলাকা পেরিয়ে কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার পাটলী ঘাটে পৌঁছাই সকাল ১০টা নাগাদ। এখানেই শেষ হলো সড়কপথের প্রথম অধ্যায়। সামনে অপেক্ষা করছিল জলপথের রোমাঞ্চ।
পাটলী ঘাট থেকে অষ্টগ্রাম
ঘাটে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন স্থানীয় নৌযানচালক আকিরুল ইসলাম। তার ইঞ্জিনচালিত বোটেই অষ্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হলাম। আসা-যাওয়া ভাড়া ছিল দুই হাজার টাকা। ইঞ্জিনের শব্দে বোট যখন ঘাট ছেড়ে এগিয়ে গেল, মুহূর্তেই বদলে গেল চারপাশ। রাস্তা, গাড়ি, বাড়িঘর, কিংবা মানুষের ভিড় নেই। চারদিকে শুধু পানি। দূরে ছোট ছোট গ্রাম; কোথাও গাছের সারি, কোথাও মাছ ধরার নৌকা। মাথার ওপর বিশাল আকাশ, আর তার প্রতিচ্ছবি জলরাশিতে। কেউ ছবি তুলছিলেন, কেউ ভিডিও করছিলেন। কেউ আবার নীরবে বসে উপভোগ করছিলেন প্রকৃতির এই বিশাল আয়োজন। মেঘের ছায়া কখনো পানিতে পড়ছে, আবার রোদের ঝিলিক পানিকে করে তুলছে রুপালি।
হাওড়ের সৌন্দর্য ক্যামেরায় ধরা যায়, কিন্তু তার অনুভূতি পুরোপুরি বন্দি করা যায় না। বিস্তীর্ণ জলরাশি মানুষের মধ্যে এক ধরনের নীরব বিস্ময় তৈরি করে। প্রায় দেড় ঘণ্টার নৌযাত্রা শেষে আমরা পৌঁছালাম অষ্টগ্রামে।
অষ্টগ্রাম : পানির সঙ্গে মানুষের জীবনযাপন
অষ্টগ্রামে পা রেখেই বোঝা গেল, এটি শুধু পর্যটনের স্থান নয়—এটি একটি জীবন্ত জনপদ। বর্ষায় চারদিক পানিতে ভরে গেলে নৌকাই হয়ে ওঠে প্রধান বাহন। এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যাতায়াত, পণ্য পরিবহন কিংবা দৈনন্দিন কাজ—সবকিছুর সঙ্গেই জড়িয়ে থাকে জলপথ। আবার শুষ্ক মৌসুমে একই ভূখণ্ডের চেহারা পাল্টে যায়। পানি সরে গেলে দেখা দেয় বিস্তীর্ণ কৃষিজমি। শুরু হয় কৃষকের ব্যস্ততা। প্রকৃতির ঋতুভিত্তিক এই রূপান্তরই হাওরাঞ্চলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। অষ্টগ্রামে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন অটোরিকশাচালক কামাল হোসেন। এবার শুরু হলো সড়কপথে হাওর ভ্রমণ।
ইতিহাসের ছোঁয়া
অষ্টগ্রামের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর মধ্যে কুতুবশাহী মসজিদ উল্লেখযোগ্য। বিস্তৃত জলাভূমির প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি ভ্রমণে যোগ করে এক ভিন্ন মাত্রা। প্রকৃতি ও ইতিহাসের এমন সহাবস্থান হাওরাঞ্চলের ভ্রমণকে শুধু বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে না; বরং অতীতের সঙ্গে বর্তমানের একটি যোগসূত্র তৈরি করে।
হাওরের বুক চিরে অল-ওয়েদার সড়ক
পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ কিংবা সমুদ্রের পাশের সড়কের সঙ্গে হাওরের বুকের ওপর দিয়ে চলে যাওয়া অল-ওয়েদার সড়কের কোনো তুলনা হয় না। এর সৌন্দর্য অন্যরকম। ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম সড়ক হাওরাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের প্রতীক। একসময় বর্ষায় নৌকাই ছিল প্রধান ভরসা। চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা কিংবা কৃষিপণ্য পরিবহনে মানুষকে নানা দুর্ভোগ পোহাতে হতো। সড়ক যোগাযোগ সেই বাস্তবতায় নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলেছে। অটোরিকশায় আমরা এগিয়ে চললাম সেই সড়ক ধরে। দুপাশে বিস্তীর্ণ জলরাশি। দূরের গ্রামগুলোকে মনে হচ্ছিল ছোট ছোট দ্বীপ। কোথাও নৌকা চলছে, কোথাও জেলেরা মাছ ধরছেন। আকাশ আর পানি যেন একে অপরের সঙ্গে মিশে গেছে। মাঝেমধ্যে থেমেছি। ছবি তুলেছি। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে বাতাসের শীতলতা অনুভব করেছি। কারণ হাওরের সৌন্দর্য দ্রুত দেখে চলে যাওয়ার নয়; এখানে কিছুক্ষণ থামতে হয়, চারপাশের নীরবতা শুনতে হয়।
মিঠামইন ও কামালপুর
অল-ওয়েদার সড়ক ধরে আমাদের যাত্রা এগিয়ে গেল মিঠামইনের দিকে। কিশোরগঞ্জ জেলার একটি দিগন্তবিস্তৃত হাওরবেষ্টিত উপজেলা মিঠামইন, যার একটি অন্যতম সুপরিচিত গ্রাম হলো কামালপুর। বর্ষাকালে এই পুরো এলাকা অথই জলরাশিতে রূপ নেয়, আর শুকনো মৌসুমে মাইলের পর মাইল সবুজ ফসলের মাঠে পরিণত হয়। এখানকার প্রধান আকর্ষণ পানির বুক চিরে চলে যাওয়া দৃষ্টিনন্দন ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম অল-ওয়েদার সড়ক। এছাড়া ঐতিহ্যবাহী দিল্লির আখড়া, কামালপুর জামে মসজিদ এবং বর্ষায় থইথই হাওরের গ্রামীণ শান্ত পরিবেশ পর্যটকদের দারুণভাবে আকৃষ্ট করে।
নিকলীর বিস্তীর্ণ জলরাশি
হাওর ভ্রমণে নিকলীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিস্তীর্ণ জলরাশি ও বেড়িবাঁধ এখানকার প্রধান আকর্ষণ। পানির পাশে দাঁড়ালে মনে হয়, আকাশ আর পৃথিবীর মাঝখানে কোথাও এসে দাঁড়িয়েছি। বর্ষায় ঢেউয়ের শব্দ, বাতাস আর পানির বিস্তার তৈরি করে অনন্য পরিবেশ। বিকেলের আলোয় দৃশ্যটি আরো মোহনীয় হয়ে ওঠে। সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে পানির রং বদলাতে থাকে। নিকলীর ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর মধ্যে স্থানীয়ভাবে ‘দয়াল কুটির’ নামে পরিচিত জমিদারবাড়ি উল্লেখযোগ্য। রয়েছে গুরুই শাহি জামে মসজিদসহ নানা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।
সৌন্দর্যের আড়ালে সংগ্রাম
পর্যটকের চোখে হার যতটা সুন্দর, এখানকার মানুষের জীবন ততটা সহজ নয়। অকাল বন্যা, ফসলহানি, অতিরিক্ত পানি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করেই চলে তাদের জীবন। বোরো ধান এই অঞ্চলের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। একটি ফসলের ওপর নির্ভর করে বহু পরিবারের বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব। ধান কাটার সময় অকাল বন্যার আশঙ্কা তাই কৃষকের কাছে বড় উদ্বেগ। বর্ষায় মাছ ধরা গুরুত্বপূর্ণ জীবিকা হয়ে ওঠে। নৌকা তখন শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়, জীবিকারও অংশ। প্রকৃতির সঙ্গে লড়াইয়ের পাশাপাশি তার নিয়মের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াই হাওরবাসীর জীবনদর্শন।
পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা
অষ্টগ্রাম-মিঠামইন-নিকলী অঞ্চলকে কেন্দ্র করে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন সার্কিট গড়ে তোলার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। জলরাশি, নৌভ্রমণ, অল-ওয়েদার সড়ক, ঐতিহাসিক স্থাপনা, গ্রামীণ জীবন ও রাজনৈতিক ইতিহাস—সব মিলিয়ে এখানে পর্যটনের অনন্য উপাদান রয়েছে।
তবে পর্যটনের বিকাশের সঙ্গে পরিবেশ রক্ষার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। হাওরে প্লাস্টিক ও বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে হবে। পানিদূষণ ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষতি রোধ করতে হবে। নৌযাত্রায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
বিকাল ৪টায় ফেরার পালা
সকাল থেকে ঘুরতে ঘুরতে কখন যে বিকাল নেমে এসেছে, বুঝতেই পারিনি। দিনটি যেন চোখের পলকে কেটে গেল। পূর্বনির্ধারিত সময় অনুযায়ী বিকাল ৪টা নাগাদ অষ্টগ্রাম থেকে ফেরার যাত্রা শুরু করি।
ফেরার পথে সকালের তুলনায় হাওরকে মনে হলো আরো শান্ত। পশ্চিম আকাশের শেষ আলো পানির ওপর ছড়িয়ে পড়ছে। দূরে মাছ ধরার নৌকা, কোথাও পাখির উড়ে যাওয়া, কোথাও গাছের ছায়া—সব মিলিয়ে তৈরি হলো দিনের শেষ দৃশ্যপট।
প্রায় সোয়া এক ঘণ্টার নৌযাত্রা শেষে আবার পাটলী ঘাটে পৌঁছালাম। শেষ হলো এক দিনের হাওর অভিযান। তবে শেষ হলো না অনুভূতি। হাওড়ের বিস্তীর্ণ জলরাশি, অল-ওয়েদার সড়কের বিস্ময়, মানুষের জীবনসংগ্রাম আর সন্ধ্যার নরম আলো মনের ভেতর থেকে গেল।