ভাইভা মূলত একটি স্নায়বিক চাপের পরীক্ষার খেলা। এখানে শুধু জ্ঞান ও প্রস্তুতি নয়, বরং চাপের মুহূর্তে নিজেকে স্থির রাখা, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উত্তর দেওয়া এবং বিভিন্ন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সক্ষমতাও যাচাই করা হয়। প্রীতিকর থেকে অপ্রীতিকর—নানা ধরনের প্রশ্ন ও পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় প্রার্থীকে। তাই জ্ঞানের পাশাপাশি কিছু কৌশল ও দক্ষতা ভাইভাকে সহজ করে তুলতে পারে। নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে তেমনই কিছু কার্যকর কৌশল ও পরামর্শ তুলে ধরেছেন ৪৩তম বিসিএসে সহকারী পুলিশ সুপার পদে যোগ দেওয়া নাভিদ তাসনিম।
যা জানতেই হবে
নিজের পরিচিতি খুব সুন্দর করে প্রস্তুত ও বহুবার অনুশীলন করে যেতে হবে, কারণ এটি ভাইভা বোর্ডে সর্বাধিক জিজ্ঞাসিত একটি প্রাথমিক প্রশ্ন। খুব সংক্ষেপে সর্বোচ্চ এক থেকে দেড় মিনিটে নিজের পরিচয় তুলে ধরতে হবে। নাম, জেলা, পড়াশোনা, আগের চাকরির অভিজ্ঞতা এবং প্রথম ক্যাডার চয়েসের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো দক্ষতা থাকলে সেটা। অপ্রাসঙ্গিক কিছু বলার প্রয়োজন নেই, সময়ও দেওয়া হবে না।
নিজের জেলার বিখ্যাত বা কুখ্যাত বিষয়, কৃষিসম্পদ, নদী-নালা ও বাণিজ্যিক গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে হবে। এককথায় নিজেকে নিজ এলাকার একজন প্রতিনিধি ভাবুন এবং নিজ জেলার পরিচয় সম্পর্কে কাউকে দুটো কথা বলার মতো জ্ঞান অর্জন করুন। নিজের পঠিত বিষয়ে সম্মান ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের মৌলিক থেকে মাঝারি মানের জ্ঞান রাখতে হবে, বিশেষত প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষাগুলো জেনে যেতে হবে।
মুক্তিযুদ্ধে নিজ জেলার অবদান বা ঐতিহাসিক যোগসূত্র থাকলে তা জানা আবশ্যক। প্রথম ও দ্বিতীয় পছন্দের ক্যাডার বিষয়ে সাধারণ জ্ঞান থাকতে হবে, বিশেষত প্রথম পছন্দটিই দেখা হয়। নিজের স্নাতক-স্নাতকোত্তর কোর্সে পঠিত বিষয়ে অর্জিত জ্ঞানের সঙ্গে এই পছন্দ কীভাবে সম্পর্কিত হবে, তার উত্তর প্রস্তুত থাকতে হবে। চলমান বাস্তব সমস্যা থেকে প্রশ্ন আসতে পারে, তাই প্রতিদিন পত্রিকা পড়তে হবে।
বাংলা নাকি ইংরেজি : কোন ভাষায় উত্তর
রুমে প্রবেশের আগে গেট থেকে বাংলায় সালাম দিয়ে অনুমতি নেওয়াই ভালো। গুড মর্নিং দিলে পরের কথোপকথন ইংরেজিতে চলতে পারে, যা আপনার জন্য সুবিধা বা অসুবিধা—দুই-ই হতে পারে।
তাই নিজের সামর্থ্য বুঝে সিদ্ধান্ত নেবেন। ভাইভার অলিখিত নিয়ম হলো, যে ভাষায় প্রশ্ন করা হয়, সেই ভাষাতেই উত্তর দিতে হবে। না পারলে কিছুটা চেষ্টা করে বিনয়ের সঙ্গে নিজের সুবিধাজনক ভাষায় বলার অনুমতি চাওয়া যেতে পারে। তবে ইংরেজিতে সাবলীল কথোপকথন জীবনের সব ক্ষেত্রেই সুবিধা দেয়, তাই এটি আয়ত্তে আনা প্রার্থীর ব্যক্তিত্বের অংশ হওয়া উচিত। ভুল করতে করতে শিখুন, তবে শিখুন। খুব দক্ষ হতে হবে না, শুদ্ধতা বজায় রেখে কাজ চালানোর মতো বলতে পারলেই চলবে।
আগমন থেকে প্রস্থান : আপনাকে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে
রুমে ঢুকবেন অনুমতি নিয়ে, চেয়ারের পাশে দাঁড়িয়ে আবার সালাম দেবেন। বসার অনুমতি পেলে বসবেন, নইলে অপেক্ষা করবেন। চেয়ার নিঃশব্দে টেনে বসবেন, টেবিলের সঙ্গে একেবারে মিশিয়ে দেবেন না—মাঝে একটু ফাঁকা রাখবেন। ভাইভা শেষে চেয়ার ছেড়ে উঠে নিঃশব্দে আগের জায়গায় রেখে দেবেন, তারপর আগের মতো চেয়ারের পাশে দাঁড়িয়ে সালাম দেবেন। দরজা খুলে বেরিয়ে গেটের বাইরে থেকে আরেকবার সালাম দিয়ে দরজা বন্ধ করবেন। এসব খুঁটিনাটি কেউ দেখে না বলে মনে হলেও ভাইভার প্রথম ও শেষ মুহূর্তগুলোই কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মাঝে অনেক কিছু কমবেশি হতে পারে; কিন্তু যার শুরু ও শেষ সুন্দর, সে সামগ্রিকভাবে সুবিধা পাবেই। এসব ছোটখাটো বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক থাকুন। মেরুদণ্ড সোজা রেখে, দুই হাত দুই হাঁটুর ওপর রেখে বসবেন, তবে একেবারে আড়ষ্ট হয়ে নয়। যতটা সম্ভব স্বাভাবিক থাকুন—স্বাভাবিকভাবে প্রশ্বাস নিন। হাত মুষ্টিবদ্ধ রাখা, টেবিলে রাখা, বুকের কাছে ভাঁজ করা, বারবার মুখে হাত দেওয়া, অতিরিক্ত ঘামা—এসব আচরণ নার্ভাসনেস প্রকাশ করে, তাই এগুলো যথাসম্ভব এড়াতে হবে।
সব উত্তর পারার আশা করবেন না
একটা বিষয় সহজে বোঝা দরকার। একাডেমিক জ্ঞানের যথেষ্ট প্রমাণ আপনি প্রিলি ও রিটেনে দিয়ে এসেছেন, আর সেটির বলেই এই বোর্ডে বসার যোগ্যতা অর্জন করেছেন। তাই বোর্ড কেবল আপনি কয়টি প্রশ্নের উত্তর পারলেন বা পারলেন না, সেই গণনায় আপনাকে বিচার করে না এবং সত্যি বলতে, ভাইভা বোর্ডে একজন প্রার্থী সবকটি প্রশ্নের উত্তর পারবে, এমনটা বোর্ড আশাও করে না। তাই সবারই কমবেশি ‘সরি’ বলে নিজের অজ্ঞতা স্বীকার করতে হয় এবং সেটাই স্বাভাবিক। মেনে নিন। ভদ্রতা প্রদর্শন করুন, শিখতে আগ্রহী হোন, নিজের ভুল স্বীকার করার মতো বিনয়ী হোন এবং সেগুলো ভবিষ্যতে সংশোধনের আত্মবিশ্বাসও রাখুন। না পারলে মৃদু হেসে বলুন, ‘সরি স্যার, এটা আমার জানা নেই বা এখন মনে পড়ছে না, ভবিষ্যতে অবশ্যই জেনে নেব।’ হয়ে গেল।
নম্রতা ও শিষ্টাচার দেখান
রুমে প্রবেশ করা থেকে চেয়ারে বসা, ওঠা ও বের হওয়া পর্যন্ত আপনার প্রতিটি আচরণ পর্যবেক্ষণ করা হয়। তাই বোর্ডের সামনে যে সময়টুকু থাকবেন, কয়েকটি বিষয় উপস্থাপনের চেষ্টা করবেন। আপনি নম্র, ভদ্র এবং শিষ্টাচার জানেন; আপনি নতুন কিছু শিখতে আগ্রহী এবং নিজের ভুল বা অজ্ঞতা শুধরে নিতে সবসময় প্রস্তুত। কোনোভাবেই বোর্ডের সঙ্গে তর্কে জড়ানো যাবেন না, আপনি যতই সঠিক হোন না কেন। ভাইভার সেই মুহূর্তটুকু বাদে বাকি সব জায়গায় শুদ্ধতা দেখান, সমস্যা নেই।
চোখে চোখ রেখে কথা বলুন
কথা বলার সময় দৃষ্টিসংযোগ ধরে রাখা আবশ্যক, তবে রোবটের মতো নয়। সবকিছুতেই বিনয় ও মৃদু হাসি থাকবে। যার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন, তার দিকে চোখ রেখে কথা বলবেন, মাঝে মাঝে অন্য সদস্যদের দিকেও দৃষ্টি ঘোরাবেন, যাতে সবাই বোঝেন আপনি সকল বোর্ড সদস্যের প্রতি খেয়াল রাখছেন। একসঙ্গে একাধিকজন প্রশ্ন করলে দ্বিতীয় প্রশ্নকর্তার কাছ থেকে প্রথমজনের প্রশ্নের উত্তর শেষ করার অনুমতি চেয়ে নিয়ে উত্তর চালিয়ে যাবেন।
উত্তর যথাসাধ্য সংক্ষিপ্ত রাখুন
প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেবেন, না পারলে ‘সরি’ বলবেন; তবে কথা দীর্ঘায়িত করবেন না। স্যারেরা এটি খুব অপছন্দ করেন। কথা লম্বা করার জায়গা রিটেনের খাতা, ভাইভা বোর্ড নয়।
আবেগ প্রকাশে সংযত থাকুন
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অনেক প্রশ্নের উত্তর আপনি নাও পারতে পারেন, আর সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু না পারার পর আপনার অভিব্যক্তি কী, তা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। নার্ভাস হওয়া এক বিষয়, আর নার্ভাসনেস দেখানো আরেক বিষয়। হতাশ হওয়া, কাঁধ ঝুঁকে যাওয়া, শরীর শিথিল হয়ে যাওয়া, দৃষ্টিসংযোগ হারানো, মুখের হাসি মিলিয়ে যাওয়া, ঘেমে ওঠা, হাত মুঠো করে ফেলা—এগুলো করা যাবে না। সব ঠেকাতে পারবেন না, তবে যতটা সম্ভব ঠেকান। চাকরি পেলে আপনি ক্যাডার হবেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ পদে নেতৃত্ব দেবেন, আপনার সিদ্ধান্তে অধস্তনদের জীবন নির্ভর করবে। দাঙ্গা, মারামারি ও আলোচনা সামলাতে গিয়ে নিজেই নার্ভাস হয়ে গেলে অধস্তনদের কীভাবে নেতৃত্ব দেবেন? সেটা ভেবে হলেও মাথা ঠান্ডা রাখুন। আবার অনেকে ভাবেন বোর্ডের সামনে অসহায়ত্ব দেখালে সহানুভূতি পাবেন; পেতেও পারেন, কিন্তু ভাইভা বোর্ড সহানুভূতি অর্জনের জায়গা নয়, যোগ্যতা প্রমাণের জায়গা। আর সেটা কখনোই সহানুভূতির মাধ্যমে হয় না। হয় নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করবেন, নয়তো ব্যর্থতা মেনে পরবর্তী যোগ্যজনের জন্য জায়গা ছেড়ে দেবেন। তাই সাহসী হোন। যা-ই ঘটুক হাসিমুখ, বিনয় ও আত্মবিশ্বাস ধরে রাখতে হবে।
বিশেষ পরামর্শ
সব প্রস্তুতি শেষ, অনেক পড়েছেন, তবু মাথায় থাকছে না; মনে হচ্ছে সব হারিয়ে গেছে! একটু বিরতি নিন। মাথায় সবই আছে, কেবল উত্তেজনার কুয়াশায় ঢাকা পড়ে গেছে। এই সময় নিজেকে আশ্বস্ত করা দরকার। আমি নিজের মা, বাবা, ভাই, আপনজন ও বন্ধুদের মুখগুলো মনে করতাম, তাদের সংগ্রাম, আমাকে ঘিরে তাদের স্বপ্ন ও আশাগুলো নিয়ে স্মৃতিচারণ করতাম। সেই মুখগুলো চিন্তাচেতনায় স্পষ্টতা আনত যে, আমি এখন কোথায় আছি, কেন আছি এবং এখানে কী করতে হবে। তা এই বিশ্বাস জোগাত যে, সাধ্যমতো সবই করেছি, বাকিটা সৃষ্টিকর্তার সিদ্ধান্ত। আমার কাজ নিজের পক্ষে যতটা সম্ভব সেটা করা, এখন তাই-ই করব। এই অভিজ্ঞতা রোমাঞ্চকর হবে, ভয় ও নার্ভাস লাগবে—এটাই তো স্বাভাবিক, তাই না! ‘সব ঠিক আছে, দেখি কী হয়’—এই ভেবে আসন্ন রোমাঞ্চটা মেনে নিয়েই ভাইভায় যেতাম। ভাইভা বাস্তবে যতটা ভীতিকর নয়, মানসিকভাবে তার চেয়ে অনেক বেশি ভয়ংকর লাগে। ভাগ্য অবশ্যই বড় একটি বিষয়, তবে আমার-আপনার কাজ হলো নিজের পক্ষে যতটা সম্ভব করা, বাকিটা সৃষ্টিকর্তার সিদ্ধান্ত। অনেক খারাপ ভাইভা দিয়েও ক্যাডার হতে দেখেছি (নিজেকেও), আবার অনেক ভালো ভাইভা দিয়েও অকৃতকার্য হওয়ার কথা শুনেছি। তাই ‘কর্ম করে যাও, ফলের চিন্তা করো না’—এটাই আমার সার্বিক মূলমন্ত্র ছিল এবং উপদেশও সেটাই থাকবে।