অমর একুশে বইমেলার দশম দিনে ছুটির দিন ও শিশু প্রহরকে ঘিরে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে মেলা প্রাঙ্গণে। শনিবার (৭ মার্চ) সকাল থেকেই অভিভাবকদের হাত ধরে শিশুদের উপচে পড়া ভিড়ে মুখর হয়ে ওঠে মেলার শিশু চত্বর। পছন্দের বই কেনা, পাপেট শো দেখা, বায়োস্কোপে গল্প শোনা- বিভিন্ন আয়োজনে মেতে ওঠে খুদে দর্শনার্থীরা।
সামগ্রিকভাবে মেলার পরিবেশ কিছুটা নিরুত্তাপ থাকলেও শিশুদের উপস্থিতিতে প্রাঙ্গণের একটি অংশ হয়ে ওঠে বেশ প্রাণবন্ত।
সকাল ১১টা থেকে শুরু হওয়া শিশু প্রহরে মেলা প্রাঙ্গণে ছিল শিশুদের সরব উপস্থিতি। অভিভাবকদের সঙ্গে স্টল ঘুরে ঘুরে পছন্দের বই কিনতে দেখা যায় তাদের। শিশুদের জন্য নির্ধারিত স্টলগুলোতে ছিল অংকের বই, ভৌতিক গল্প, বিজ্ঞান কল্পকাহিনী, রূপকথা, ছবি আঁকার বই ও কমিক্স। পছন্দের বই কিনে খুশি শিশুরা, আর সন্তানদের বইয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পেরে সন্তুষ্ট অভিভাবকেরাও।
বাংলা একাডেমির শিশু চত্বরে ছিল কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটারের পাপেট শো, বায়োস্কোপে কুজি বুড়ির গল্পসহ নানা আয়োজন। পুতুলনাচ, ছড়া, গান ও গল্পের মাধ্যমে শিশুদের দেওয়া হয় বিনোদন ও শিক্ষামূলক বার্তা। পাপেট শো ঘিরে শিশুদের উচ্ছ্বাসে মেলা প্রাঙ্গণ সরব হয়ে উঠে।
বাবা-মায়ের হাত ধরে আজিমপুর থেকে বইমেলায় এসেছে ছোট্ট দুই বোন আনিকা ও আয়েশা। স্টল ঘুরে তারা ভূতের গল্পের বই ও ‘গুড্ডুবুড়া’ কিনেছে বলে জানায়। বই হাতে পেয়ে তাদের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো।
অভিভাবকেরাও শিশুদের জন্য এমন আয়োজনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। ছেলেকে নিয়ে মেলায় আসা সরকারি কর্মকর্তা কামাল হোসেন বলেন, “ বইমেলা আমাদের চিরায়ত সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে। এ আয়োজন বাচ্চাদের মনোজগতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। এতে তারা স্মার্টফোন থেকে দূরে থাকবে, নিজস্ব সংস্কৃতি চর্চা করবে এবং বইয়ের প্রতি আগ্রহ বাড়বে।”
প্রকাশকরা বলছেন, বর্তমান প্রজন্ম ক্রমেই ডিভাইস নির্ভর হয়ে পড়ছে। ফলে বইয়ের প্রতি আগ্রহ কমছে। তবে শিশুদের মধ্যে ছবি আঁকার বই, কমিক্স, পপ-আপ ও ত্রিমাত্রিক বইয়ের চাহিদা বাড়তে দেখা যাচ্ছে।
শিশু প্রহরে বই বিক্রি নিয়ে প্রকাশকদের মধ্যে দেখা গেছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কেউ কেউ বিক্রি নিয়ে সন্তুষ্টির কথা বললেও বেশিরভাগই হতাশা প্রকাশ করেছেন। প্রথমা প্রকাশনীর এক বিক্রয়কর্মী বলেন, “গত বছর প্রতিদিন কয়েক লাখ টাকার বই বিক্রি হতো। কিন্তু এবার তার দশ ভাগের এক ভাগও বিক্রি করতে পারছি না।”
শিলা প্রকাশনীর নির্বাহী কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম বলেন, “যা বিক্রি হয়েছে, তা দিয়ে স্টলের স্টাফদের ইফতার কেনার টাকাও ওঠেনি।”
বর্ণমালা প্রকাশনীর প্রকাশক মামুনুর রশীদ বলেন, “রমজানে মেলার আয়োজন করে বাংলা একাডেমি আমাদের ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছে।”
অন্যপ্রকাশের প্রকাশক মাজহারুল ইসলাম বলেন, “এবারের মেলায় অংশ নিয়ে আমরা নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মেরেছি। সৃজনশীল প্রকাশক ঐক্যের ব্যানারে আমরা ৩২১ জন প্রকাশক এবারের মেলায় অংশ নিতে চাইনি। বাংলা একাডেমি বিনা ভাড়ায় স্টল দিলেও স্টল নির্মাণের খরচটাও আমরা তুলতে পারব না।”
প্রকাশকেরা মনে করছেন, ঈদকে সামনে রেখে অনেক পরিবারের বাজেটের বড় অংশ এখন কেনাকাটায় ব্যয় হচ্ছে। এছাড়া রোজার সময় হওয়ার কারণে মেলায় আশার আগ্রহ কমেছে। ফলে বই কেনার ক্ষেত্রে উৎসাহ তুলনামূলক কম দেখা যাচ্ছে।
সামনের দিনগুলোতে বিক্রিতে পরিবর্তন না এলে বড় ধরনের লোকসানের আশঙ্কা রয়েছে বলেও জানান তারা।