হোম > সাহিত্য সাময়িকী

ইসমাইল হোসেন সিরাজী সম্পর্কে কাজী নজরুল ইসলাম

ডেস্ক রিপোর্ট

সিরাজী সাহেব ছিলেন আমার পিতৃতুল্য। তাহার সমগ্র জীবনই ছিল অনল-প্রবাহ। আমার রচনায় সেই অগ্নি-স্ফুলিঙ্গের প্রকাশ। আজ সিরাজগঞ্জে আসিয়া সর্বপ্রধান অভাব অনুভব করিতেছি, আমাদের মহানুভব নেতা, বাংলার তরুণ মুসলিমের সর্বপ্রথম অগ্রদূত, তারুণ্যের নিশান-বর্দার মৌলানা সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী সাহেবের।

সিরাজগঞ্জের সিরাজীর সাথে বাংলার সিরাজ, বাংলার প্রদীপ নিভিয়া গিয়াছে। যাঁহার ‘অনল-প্রবাহ’-সম বাণীর গৈরিক নিঃস্রাব জ্বালাময়ী ধারা মেঘনিরন্ধ্র গগনে অপরিমাণ জ্যোতি সঞ্চার করিয়াছিল, নিদ্রাতুরা বঙ্গদেশ উন্মাদ আবেগ লইয়া মাতিয়া উঠিয়াছিল—‘অনল প্রবাহে’র সেই অমর কবির কণ্ঠস্বর বাণীকুঞ্জে আর শুনিতে পাইব না। বেহেশতের বুলবুলি বেহেশতে উড়িয়া গিয়াছে। জাতির কওমের, দেশের যে মহাক্ষতি হইয়াছে—আমি শুধু তাহার কথাই বলিতেছি না, আমি বলিতেছি আমার একার বেদনার ক্ষতির কাহিনি।

আমি তখন প্রথম কাব্য-কাননে ভয়ে ভয়ে পা টিপিয়া টিপিয়া প্রবেশ করিয়াছি—ফিঙে বায়স বাজপাখীর ভয়ে ভীরু পাখীর মতো কণ্ঠ ছাড়িয়া গাহিবারও দুঃসাহস সঞ্চয় করিতে পারি নাই, নখ-চঞ্চুর আঘাতও যে না খাইয়াছি এমন নয়। এমনি ভীতির দুর্দিনে মানি অর্ডারে আমার নামে দশটি টাকা আসিয়া হাজির। কুপনে সিরাজী সাহেবের হাতে লেখা—

‘এই সামান্য দশটি টাকা আমার আন্তরিক স্নেহের প্রতীকস্বরূপ পাঠালাম। এই টাকাটা দিয়ে তুমি একটা কলম কিনে নিও। আমার কাছে এর বেশি এখন নেই। যদি বেশি থাকত তোমাকে আরও বেশি পাঠিয়ে দিয়ে নিজেকে ধন্য মনে করতাম। তা হলো না।’

চোখের জলে স্নেহ-সুধাসিক্ত ওই কয় পঙ্‌ক্তি লেখা বারেবারে পড়িলাম, টাকা দশটি লইয়া মাথায় ঠেকাইলাম। তখনো আমি তাঁহাকে দেখি নাই। কাঙাল ভক্তের মতো দূর হইতেই তাঁহার লেখা পড়িয়াছি, মুখস্থ করিয়াছি, শ্রদ্ধা নিবেদন করিয়াছি। সেই দিন প্রথম মানসনেত্রে কবির স্নেহ-উজ্জ্বল মূর্তি মনে মনে রচনা করিলাম, গলায়-পায়ে ফুলের মালা পরাইলাম। তাহার পর ফরিদপুর ‘বঙ্গীয় প্রাদেশিক কনফারেন্সে’ তাঁহার জ্যোতির্বিমণ্ডিত মূর্তি দেখিলাম। দুই হাতে তাঁহার পায়ের তলার ধূলি কুঁড়াইয়া মাথায় মুখে মাখিলাম। তিনি আমায় একেবারে বুকের ভিতর টানিয়া লইলেন, নিজ হাতে করিয়া মিষ্টি খাওয়াইয়া দিতে লাগিলেন। যেন বহুকাল পরে পিতা তাহার হারানো পুত্রকে ফিরাইয়া পাইয়াছেন।

আজ সিরাজগঞ্জে আসিয়া বাংলার সেই অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি, মনস্বী দেশপ্রেমিকের কথাই বারেবারে মনে হইতেছে। এ যেন হজ করিতে আসিয়া কাবা শরিফ না দেখিয়া ফিরিয়া যাওয়া। তাঁহার রুহ মোবারক হয়তো আজ এই সভায় আমাদের ঘিরিয়া রহিয়াছে। তাঁহারই প্রেরণায় হয়তো আজ আমরা তরুণেরা এই যৌবনের আরফাত ময়দানে আসিয়া মিলিত হইয়াছি। আজ তাঁহার উদ্দেশে আমার অন্তরের অন্তরতম প্রদেশ হইতে শ্রদ্ধা-তসলিম নিবেদন করিতেছি, তাঁহার দোয়া ভিক্ষা করিতেছি।

(১৩৩২ বঙ্গাব্দে সিরাজগঞ্জে অনুষ্ঠিত ‘বঙ্গীয় মুসলিম তরুণ সম্মেলনে’ সভাপতির অভিভাষণ)

হজযাত্রায় বদর প্রান্তরে কিছুক্ষণ

বিবি হাজেরা: সব নারী-পুরুষের আদর্শ

যুগে যুগে কাবা আক্রমণ ও হজ কাফেলায় হামলার ইতিহাস

তিনটি দানা

সমকালে কাজী নজরুল

নতুন যুগে কাজী নজরুল

মৃত্যুক্ষুধায় সমাজ ও সংস্কৃতি

ঔপনিবেশিক বাংলার জমিদার ও বাঙালি মুসলমান

মসনদে আলা ঈসা খানের চট্টগ্রামে অবস্থান ও আধ্যাত্মিকতা চর্চা

মুসলিমপূর্ব বঙ্গে গরু কোরবানির স্বাধীনতা