ব্রিটিশদের আগে মোগল আমলে সিলেট ছিল বাংলার সীমান্তবর্তী বিচ্ছিন্ন একটি অঞ্চল। এ অঞ্চলের মানুষকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য বাংলার মোগল শাসকরা প্রচুর করছাড় দিতেন। মোগলদের পূর্ববর্তী আফগান-পাঠান শাসকরাও সিলেটের মানুষের ওপর করের বোঝা চাপিয়ে দেননি। শেরশাহর আমলের সিলেটের করের তুলনায় নবাব সিরাজউদ্দৌলার আমলে সিলেটের কর কিছুটা কমই ছিল। কিন্তু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই সিলেটের ওপর করের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছিল!
মোগল সম্রাট আকবরের আমলে রচিত ‘আইনে আকবরী’তে সিলেটের বার্ষিক রাজস্ব ১,৪৭,৫৬৫ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। টোডরমল শেরশাহর আমলের নথি থেকে এই হিসাব সংগ্রহ করেছিলেন। ১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার দেওয়ানি লাভের পর সিলেটের রাজস্ব দ্রুত বাড়তে থাকে। ১৭৭২ সালে তা ১,৭০,০০০ টাকা, ১৭৭৬ সালে ২,০০,০০০ টাকা এবং ১৭৭৮ সালে রবার্ট লিন্ডসে ২,৫০,০০০ টাকা করা হয়। অর্থাৎ মাত্র ছয় বছরে কর ১,১৪,০০০ টাকা বেড়ে যায়।
মুসলমান আমলে সিলেটে বহু জমিদার সামান্য বা বিনা খাজনায় জমি ভোগ করতেন। ব্রিটিশদের বাড়তি করের চাপ জমিদার ও প্রজা উভয়ের ওপর পড়ে এবং ক্রমে ব্রিটিশবিরোধী অসন্তোষ তীব্র হয়। উইলিয়াম হলান্ড সিলেটের মানুষকে ‘অবাধ্য’ এবং খাজনা আদায়কে সমস্যাপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছিলেন। রবার্ট লিন্ডসের আমলে এই অসন্তোষ দৃশ্যমান রাজনৈতিক বিদ্রোহে রূপ নেয়।
সিলেটের কালেক্টরের দায়িত্ব নিয়ে আসার পর লিন্ডসে প্রথমেই যে বিদ্রোহের মুখোমুখি হয়েছিলেন, তা সিলেটের ইতিহাসে ‘মহররমের বিদ্রোহ’ নামে পরিচিত। ব্রিটিশ সরকারের ভাষ্যে এই বিদ্রোহকে একটি ‘হাঙ্গামা’ হিসেবে ধরা হলেও খোদ লিন্ডসের বক্তব্য থেকেই বোঝা যায় যে, এটি রাজনৈতিক বিদ্রোহ ছিল। ঘটনাটি ১৭৮২ সালের। এ ঘটনায় সিলেট শহরের দুই-তৃতীয়াংশ বাসিন্দা জড়িত ছিল।
১৭৮২ সালে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির বিভিন্ন স্থানে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছিল। ঢাকা ও সিলেটেও এর রেশ ছড়িয়ে পড়েছিল। প্রান্তিক জনপদ সিলেটের মানুষের বিদ্রোহী মনোভাব ছিল খুবই জোরালো। সিলেটের মুসলমানদের বার্ষিক মহররম উৎসবের কয়েক দিন আগে লিন্ডসে খবর পেলেন যে, মহররমের দিন মুসলমানরা ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ সংবাদ পাওয়ার পরপরই তিনি জমাদারকে ডেকে পর্যাপ্ত সৈন্য প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দিলেন। জমাদার তার নির্দেশমতো যেকোনো জরুরি পরিস্থিতির জন্য সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে রাখলেন। মহররমের দিন সকাল থেকে লিন্ডসে ও তার বাহিনী যেকোনো সংঘর্ষের জন্য প্রস্তুত হয়ে রইলেন। বিকাল ৫টার দিকে খবর এলো, বিদ্রোহ শুরু হয়েছে। লিন্ডসে সঙ্গে সঙ্গেই তার বাহিনী নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছালেন।
তিনি দেখলেন, জনৈক পিরজাদার নেতৃত্বে বেশ কিছু লোক জড়ো হয়েছে। তারা একটি টিলার নিচে অবস্থান নিয়েছে। তাদের নেতা পিরজাদাকে দেখতে বেশ খানদানি লোক বলেই মনে হচ্ছিল। তার দলের লোকসংখ্যা ছিল প্রায় ৩০০। এমন একটি ঝুঁকিপূর্ণ কাজে এত লোক জড়িয়ে পড়বে—তা লিন্ডসের ভাবনায় ছিল না। কিন্তু তার বাহিনীর পূর্ণ প্রস্তুতি ছিল। তাই তিনি দ্বিধা না করে সংঘর্ষের জন্য এগিয়ে গেলেন। তার বাহিনী অগ্রসর হতেই বিদ্রোহীরা টিলার উপরে অবস্থান নিল। আর লিন্ডসের বাহিনী তাদের বিপরীতে সমতল ভূমিতে অবস্থান নিল। বিদ্রোহীদের কাছে কোনো আগ্নেয়াস্ত্র ছিল না। তাদের নেতার হাতে ছিল একটি তরবারি। লিন্ডসের হাতেও একটি তরবারি ছিল। তবে তা ছিল মূলত প্রতিপক্ষকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য (লড়াইয়ের জন্য নয়)। লিন্ডসে নিজের নিরাপত্তার জন্য দুটি পিস্তল সঙ্গে এনেছিলেন। তার জমাদারের কাছে এগুলো লুকানো ছিল।
বিপদের মুহূর্তে কীভাবে পিস্তল এগিয়ে দিতে হবে, তা জমাদারকে আগেই শিখিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এবার এই কৌশল কাজে লাগানোর পালা! লিন্ডসে তার বাহিনীকে পাহাড়ের নিচে মোতায়েন রেখে জমাদারকে নিয়ে পাহাড়ে উঠতে শুরু করলেন। ব্রিটিশ পক্ষের অধিনায়ককে মাত্র একজন লোকসহ এগিয়ে আসতে দেখেও বিদ্রোহীরা তার ওপর কোনো সম্মিলিত হামলা চালাল না। লিন্ডসে জানতেন, তিনি নিজ বাহিনীকে পেছনে রেখে অগ্রসর হলে প্রতিপক্ষের অধিনায়কও একই কাজ করবেন। তৎকালীন যুগের রীতি এমনই ছিল। লিন্ডসে এই রীতিকে কাজে লাগালেন। বিদ্রোহীদের নেতা পিরজাদা তার দিকে একাই এগিয়ে এলেন। তার হাতে একটি খাপবদ্ধ তলোয়ার ছিল। তিনি কাছাকাছি আসামাত্রই লিন্ডসে তাকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানালেন।
কিন্তু পিরজাদা এই আহ্বানের জবাবে খাপ থেকে তলোয়ার বের করে বলে উঠলেন, ‘আমরা কি ফিরিঙ্গিদের কুকুর যে তাদের হুকুম তামিল করব? আজ মারার অথবা মরার দিন। ইংরেজ রাজত্ব আজ খতম।’ এ কথা বলেই তিনি তরবারি দিয়ে লিন্ডসের ওপর আক্রমণ চালালেন। লিন্ডসে তার হাতের তরবারি দিয়ে এই আক্রমণ প্রতিহত করলেন। ততক্ষণে তার হাতে পিস্তল চলে এসেছে। এই পিস্তল দিয়ে তিনি বেশ কাছ থেকেই পিরজাদাকে গুলি করলেন। গুলিবিদ্ধ হয়ে পিরজাদা মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। এতটাই কাছ থেকে তিনি গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন, বারুদের বিস্ফোরণে তার কাপড়ে আগুন ধরে গিয়েছিল। এই ঘটনা বিদ্রোহীদের চমকে দিল। কিন্তু তারা আত্মসমর্পণ করল না।
সাধারণ অস্ত্রশস্ত্র নিয়েই তারা যুদ্ধের জন্য এগিয়ে এলো। লিন্ডসের সৈন্যরাও নিচ থেকে উপরে উঠে গুলি চালাতে শুরু করল। আগ্নেয়াস্ত্রের সঙ্গে প্রায় খালি হাতের এই অসম যুদ্ধে বিদ্রোহীদের পরাজয় ছিল নিশ্চিত ব্যাপার। বাস্তবে হলোও তাই। অল্প সময়ের মধ্যেই সরকারি বাহিনীর গুলিতে পিরজাদার ভাইসহ বিদ্রোহীদের অনেকেই নিহত হলেন। সরকারি সৈন্যদের বেয়নেটের আঘাতেও অনেকে নিহত হলেন। সরকারি পক্ষের একজন সৈন্যও নিহত হয়েছিলেন। যখন যুদ্ধ শেষ হলো, তখন রাত নেমে এসেছে।