রাজশাহী জেলা সদর থেকে মাত্র ২৫ কিলোমিটার দূরে ছোট্ট একটি গ্রাম কোশিয়া। গ্রামে পা রাখতেই চোখে পড়ে সারি সারি মাটির ঘর। ঘরগুলো যেন সময়ের সাক্ষী হয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে। কোনোটি একতলা, কোনোটি দোতলা। ছোট-বড় নানা আকারের এসব ঘরের অনেকগুলোর বয়স অর্ধশতক পেরিয়ে গেছে। পুরোনো গ্রামীণ স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য আর নিপুণ কারুকাজের ছাপ আজও স্পষ্ট হয়ে আছে তাদের গায়ে। মাটির দেয়ালের আড়ালে লুকিয়ে আছে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও স্থানীয় সংস্কৃতির অসংখ্য না-বলা গল্প।
আধুনিকতার ছোঁয়া গ্রামে পৌঁছালেও কোশিয়ার মানুষ তাদের পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া চিহ্ন ভুলে যায়নি। প্রজন্মের স্মৃতি বহনকারী প্রিয় বাড়িগুলো তারা যত্ন করে টিকিয়ে রেখেছেন। একতলা বাড়িগুলোতে সাধারণত দুই থেকে তিনটি ঘর থাকে। তবে বড় পরিবারের ক্ষেত্রে ঘরের সংখ্যা পাঁচ কিংবা ছয়টিও হয়। বাড়ির কাঠামো সরল। একটি শোবার ঘর, সামনে প্রশস্ত বারান্দা এবং পুরো বাড়িকে ঘিরে থাকা দেয়াল। রোদ-বৃষ্টি থেকে রক্ষা পেতে দেয়ালের দুই পাশে বাড়তি ছাউনি থাকে। এই ছাউনির নিচের আবৃত অংশটি বারান্দার মতো ব্যবহৃত হয়। সেখানে হাঁস-মুরগি, ছাগল, গরু কিংবা সংসারিক জিনিসপত্রের ঠাঁই হয়। ছাউনির বাইরের দিকে আরো দেড় থেকে দুই ফুটের মতো একটি সরু অংশ থাকে, যা স্থানীয়ভাবে ‘কাঠি’ বা ‘ধাড়ি’ নামে পরিচিত। বসে বিশ্রাম নেওয়া কিংবা গল্প করার জন্য এটি যেন বাড়িরই এক টুকরো খোলা আঙিনা।
বাড়ির বাইরে আলাদা করে তৈরি করা হয় রান্নাঘর। অধিকাংশ রান্নাঘরই মাটির তৈরি এবং সেখানে এখনো মাটির চুলায় রান্না হয়। পাঁচ বা তার বেশি ঘরের বাড়িগুলো সাধারণত যৌথ কিংবা সচ্ছল পরিবারের। একসময় চোরের হাত থেকে বাড়িকে নিরাপদ রাখতে প্রধান দরজার ভেতরেই তৈরি করা হতো বিশেষ ধরনের একটি অভ্যন্তরীণ বারান্দা, যার নাম ‘ভেতর আগচালি’। বাড়িতে প্রবেশ করতে হলে একের পর এক কয়েকটি দরজা পার হতে হতো। নিরাপত্তার পাশাপাশি এই নির্মাণশৈলী খরা ও শীতের প্রকোপ থেকেও ঘরকে কিছুটা সুরক্ষা দিত। তবে ২০০০ সালের পর থেকে এ ধরনের বারান্দা এখন প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে।
দোতলা বাড়ির কাঠামোও অনেকটা একই রকম। পার্থক্য হলো, ভেতর আগচালির এক পাশে তৈরি করা হয় মাটির সিঁড়ি। নিচতলার ওপর মোটা কাঠের তক্তা কিংবা বাঁশের কাঠামো বসিয়ে তার উপর কয়েক স্তর মাটি দিয়ে তৈরি করা হয় দোতলা। এরপর নির্মাণ করা হয় উপরের তলার দেয়াল। দোতলার বাইরেও থাকে অতিরিক্ত একটি বারান্দা। সেখানে কাঠের রেলিংয়ে সূক্ষ্ম নকশা খোদাই করা থাকে। ফলে বাড়ির সৌন্দর্য আরো বেড়ে যায়।
বরেন্দ্র অঞ্চলের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের মতো কোশিয়ার মাটিতেও দেখা যায় তিনটি রঙ—লাল, সাদা ও কালো। বাড়ির সৌন্দর্য বাড়াতে দেয়ালে দেওয়া হয় সাদা মাটির প্রলেপ। প্রতিবছর উৎসবের আগে নারীরা নিজেদের দক্ষ হাতে দেয়ালে আঁকেন নানা রঙের আলপনা। কাঠি পর্যন্ত দেয়ালের নিচের অংশে দেওয়া হয় লাল মাটির প্রলেপ। সচ্ছল পরিবারগুলোতে, বিশেষ করে দোতলা বাড়িতে, দেয়াল দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখতে এবং সৌন্দর্য বাড়াতে আলকাতরা কিংবা রঙ ব্যবহার করা হয়। মাটির দেয়াল আরো শক্ত করতে লাল ও সাদা মাটির সঙ্গে মেশানো হয় কুচি করা খড় ও ধানের তুষ। প্রতিটি বাড়ির পাশেই থাকে ছোট ‘পুষ্কুনি’।
মুসলিম পরিবারগুলোতে ঈদ ঘিরে বাড়িতে নতুন করে মাটির প্রলেপ ও উৎসবের সাজসজ্জা করা হয়। হিন্দু ও সাঁওতাল পরিবারগুলোয়ও নিজ নিজ উৎসবকে কেন্দ্র করে একইভাবে বাড়িঘর সাজানো হয়। অনেক সময় দেয়ালে আঁকা হয় বর্ণিল আলপনা। মাঠের কাজ শেষে কিংবা নিছক বেড়াতে এসে কৃষক ও অতিথিরা বাইরের কাঠি বা ধাড়িতে বসে বিশ্রাম নেন। দিনের আলো ফুরিয়ে এলে জমে ওঠে গল্পের আসর।
এই মাটির বাড়িগুলো শুধু ঐতিহ্যের স্মারক নয়, প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানেরও এক অনন্য উদাহরণ। গ্রীষ্মে ঘরের ভেতর থাকে স্বস্তিদায়ক শীতলতা, আবার প্রচণ্ড শীত কিংবা খরার সময় ঘরকে রাখে তুলনামূলক উষ্ণ। প্রাকৃতিক এই আরাম এখনো স্থানীয় মানুষকে মাটির বাড়ির প্রতি আকৃষ্ট করে। তবে বর্ষাকালে বাড়ির চারপাশ কাদামাটি ও পানিতে ভরে গেলে কিছুটা দুর্ভোগও পোহাতে হয়।
বাড়ির রান্নাঘরগুলো যেহেতু আলাদা করে বাইরে তৈরি করা হয়, তাই কোশিয়ায় প্রতিবেশীদের মধ্যে উষ্ণতা ও আন্তরিকতার একটি হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য এখনো টিকে আছে। কার বাড়িতে কী রান্না হচ্ছে, তা নিয়ে প্রতিবেশীদের মধ্যে চলে সহজ-স্বাভাবিক কৌতূহল ও বন্ধুত্বপূর্ণ আলাপ। কথার ফাঁকে ফাঁকে একে অন্যের সঙ্গে বিনিময় হয় রান্নার রেসিপি। আর বিশেষ কোনো খাবার রান্না হলে তার এক বাটি প্রতিবেশীর বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়াই যেন অলিখিত রীতি। খাবারকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই সংস্কৃতি আজও ধরে রেখেছে স্বতঃস্ফূর্ত বন্ধুত্ব ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক সুন্দর আবহ।