হজ ট্র্যাজেডি
মক্কা মুকাররমা—মরুভূমির তপ্ত বালুকারাশির বুকে এক আধ্যাত্মিক উদ্যান, বিশ্বের কোটি কোটি মুমিনের হৃৎস্পন্দনের কেন্দ্রবিন্দু। অথচ এই পরম শান্তিময় ভূমিটি বারবার মানুষের পাশবিক জিঘাংসা, ক্ষমতার লালসা আর উগ্র মতাদর্শের ঝঞ্ঝাবর্তে রক্তাক্ত হয়েছে। কাবার চত্বরে নিক্ষিপ্ত হয়েছে মানজানিকের পাথর, ঝরানো হয়েছে নিরপরাধ হাজিদের রক্ত।
আবরাহার হাতিবাহিনীর দম্ভ থেকে শুরু করে কারামিতাদের পৈশাচিকতা, আর আধুনিক যুগের জুহাইমান আল-উতাইবির সশস্ত্র বিদ্রোহ—প্রতিটি ঘটনাই এক একটি রক্তাক্ত মহাকাব্য। এই নিবন্ধে আমরা অনুসন্ধান করব সেসব অন্ধকার অধ্যায়, যেখানে উচ্চকিত তালবিয়া ধ্বনির বদলে শোনা গিয়েছিল আর্তনাদ, জমজমের স্বচ্ছ পানির বদলে কাবার আঙিনায় প্রবাহিত হয়েছিল রুধির ধারা।
আবরাহার ঔদ্ধত্য
ইসলামপূর্ব কালে কুরাইশরা ছিল মক্কার আর্থ-সামাজিক ও ধর্মীয় নেতা। সে সময় ইয়েমেনের রাজনৈতিক মঞ্চে আবরাহা নামের এক উচ্চাভিলাষী রাজার আবির্ভাব হয়। এই কুখ্যাত আবরাহাই ছিল কাবা আক্রমণের সর্বপ্রথম খলনায়ক।
আবরাহা আরবদের তীর্থ ও বাণিজ্যের কেন্দ্র মক্কা থেকে সরিয়ে ইয়েমেনের সানআ নগরীতে নিতে চেয়েছিল। এজন্য সে সানআয় ‘আল-কুলাইস’ নামে একটি বিশাল ও কারুকার্যময় গির্জা নির্মাণ করে। কিন্তু এক আরব ব্যক্তি গির্জাটি অপবিত্র করলে আবরাহা কাবা ধ্বংসের সিদ্ধান্ত নেয়। হাতিবাহিনীসহ তার বিশাল সেনাদল মক্কার দিকে অগ্রসর হয়। তারা মক্কায় পৌঁছে সেখানে লুটতরাজ চালায়। ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দের ‘আমুল ফিল’-এ আবরাহা কাবার নিকটে পৌঁছালে আল্লাহ পাখির ঝাঁক পাঠান। তারা কঙ্কর নিক্ষেপ করে আবরাহার বাহিনীকে ধ্বংস করে দেয়।
হাজ্জাজ বিন ইউসুফের মক্কা অবরোধ
খলিফা ইয়াজিদের মৃত্যুর পর আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা.) মক্কায় খেলাফত ঘোষণা করেন। খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান তখন হাজ্জাজ বিন ইউসুফকে মক্কা অভিযানে পাঠান।
হাজ্জাজ বিন ইউসুফ মক্কা অবরোধ করে। মক্কার চারপাশের উঁচু পাহাড়গুলোতে স্থাপন করে বিশাল বিশাল পাথর নিক্ষেপক ‘মানজানিক’। সে দিনরাত কাবার ওপর পাথর ও আগুনের গোলা নিক্ষেপ করতে থাকে। অবরোধের কারণে মক্কায় খাদ্যের অভাব দেখা দেয়। হজের সময়ও হাজ্জাজের আক্রমণ বন্ধ হয় না। কাবার গিলাফে আগুন ধরে যায়, পাথরের আঘাতে কাবার দেয়াল ধসে পড়ে। অবরোধের কারণে হাজিদের পক্ষে আরাফার ময়দানে উপস্থিত হতে ব্যর্থ হয়। ফলে তারা হজ করতে ব্যর্থ হন। কাবা প্রাঙ্গণে আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা.) শাহাদাত বরণ করেন।
৬৯৩ খ্রিষ্টাব্দে (হিজরি : ৭২-৭৩) এই আক্রমণ ছিল কাবার ইতিহাসের অন্যতম ন্যক্কারজনক ঘটনা।
কারামাতি গোষ্ঠীর তাণ্ডব
কাবার সঙ্গে মুসলিম ইতিহাসের সবচেয়ে বিভীষিকাময় এবং হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডি ঘটেছিল ৯৩০ খ্রিষ্টাব্দে (৩১৭ হিজরি)। বাহরাইনের উগ্রবাদী ফেরকা (ইসমাইলি শিয়া মতাদর্শের একটি শাখা) ‘কারামাতি’রা মক্কার পবিত্র হারামে নারকীয় গণহত্যা চালিয়েছিল। কারামাতি গোষ্ঠী হজকে একটি ‘জাহেলি প্রথা’ ও ‘মূর্তিপূজা’ মনে করত।
৯৩০ খ্রিষ্টাব্দের হজের অষ্টম দিন কারামাতিদের নেতা আবু তাহির আল-জান্নাবি সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করে। হাজিরা তখন হজের তালবিয়া পাঠে মগ্ন। কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই তার বাহিনী হাজিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। সেদিন কাবা চত্বরে দাঁড়িয়ে সে উপহাস করে কোরআন পাঠ করছিল এবং সঙ্গে সঙ্গে হাজিদের তলোয়ার দিয়ে দ্বিখণ্ডিত করছিল। ইতিহাসবিদদের মতে, এক দিনে প্রায় ৩০ হাজার হাজিকে হত্যা করা হয়েছিল।
কারামাতিদের নৃশংসতা কেবল হত্যাকাণ্ডেই থেমে থাকেনি। তারা নিহত হাজিদের লাশ জমজম কূপে নিক্ষেপ করে, কাবার গিলাফ ছিঁড়ে ফেলে এবং স্বর্ণের নকশা করা কাবার দরজা লুট করে। তাদের নেতা আবু তাহের জান্নাবি হাজরে আসওয়াদ উঠিয়ে বাহরাইনের আহসায় নিয়ে যায়। সেখানে মক্কার বিকল্প হজ কেন্দ্র গড়ে তোলাই ছিল তার উদ্দেশ্য।
এর পরবর্তী ২১-২২ বছর হাজরে আসওয়াদ তাদের দখলে ছিল। এ সময় হজযাত্রা মারাত্মক অনিরাপদ হয়ে পড়ে এবং বহু মুসলিমের জন্য হজ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত আব্বাসীয়দের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে ৯৫১/৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে পাথরটি ফেরত আনা হয়।
ক্রুসেড ও হজপথে ইউরোপীয় দস্যুতা
ক্রুসেড চলাকালে পবিত্র ভূমির দখল নিয়ে যে মহাযুদ্ধ শুরু হয়েছিল, হজের কাফেলাগুলোতেও এর প্রভাব পড়েছিল। ক্রুসেডাররা মক্কা ও মদিনাকে ধ্বংস করার মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর মনোবল ভেঙে দিতে চেয়েছিল।
ক্রুসেডারদের মধ্যে সবচেয়ে ঘৃণিত ও নিষ্ঠুর চরিত্রের লোক ছিল রেনাল্ড দ্য শাতিওঁ (Raynald of Châtillon)। সে ছিল ট্র্যান্স-জর্ডানের শাসক এবং তার প্রধান কাজ ছিল শান্তি চুক্তি লঙ্ঘন করে নিরপরাধ মুসলিম কাফেলা লুট করা। ১১৮২ সালে সে এক ভয়াবহ পরিকল্পনা করে। মদিনা থেকে নবীজি (সা.)-এর দেহ মুবারক চুরি করা এবং মক্কায় হামলা করার উদ্দেশ্যে লোহিত সাগরে নৌবাহিনী গড়ে তোলে।
ক্রুসেডার নেতা রেনাল্ড লোহিত সাগর উপকূলে হজযাত্রীদের ওপর হামলা চালিয়ে আজহাব ও জেদ্দা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এতে মুসলিম বিশ্বে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ুবী শপথ করেন, তিনি নিজ হাতে রেনাল্ডকে হত্যা করবেন। পরে তার ভাই আল-আদিল ক্রুসেডার নৌবাহিনীকে পরাজিত করেন। অবশেষে ১১৮৭ সালের হাত্তিনের যুদ্ধে রেনাল্ড বন্দী হলে সালাহউদ্দীন তাকে নিজ হাতে মৃত্যুদণ্ড দেন।
মঙ্গোল আগ্রাসন; হজের চেয়ে জিহাদ বড়
ইসলামি ইতিহাসে তাতার বা মোঙ্গলদের আক্রমণ ছিল এক অন্ধকারতম অধ্যায়। ৬১৫ হিজরিতে মোঙ্গলদের উত্থান এবং খাওয়ারেজম সাম্রাজ্যের পতনের পর মধ্য এশিয়া ও পারস্যের হজের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। তাতারদের অগ্রযাত্রার ভয়ে খোরাসান, হামাদান ও ইসফাহানের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের মানুষ হজে যাওয়ার সাহস হারান।
৬৩৪ হিজরিতে তাতাররা বাগদাদের উপকণ্ঠে হানা দিলে খলিফা আল-মুসতানসির বিল্লাহর সময়ে আলেমরা ফতোয়া দেন, হজে যাওয়ার চেয়ে মাতৃভূমি রক্ষার উদ্দেশ্যে জিহাদ করা বেশি জরুরি। এই সিদ্ধান্তের কারণে টানা প্রায় দশ বছর ইরাক অঞ্চল থেকে কেউ হজে যেতে পারেননি। এরপর ১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দে বাগদাদের চূড়ান্ত পতনের পর এই স্থবিরতা আরো দীর্ঘায়িত হয় এবং পরবর্তী ১০ বছর ইরাকি কাফেলাগুলো মক্কায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিল।
ভাস্কো দা গামার নৃশংসতা
ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো যখন এশিয়ায় সাম্রাজ্য বিস্তারের শুরুর পর্যায়ে তখন তারা হজকেও বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করে। এই ক্ষেত্রে পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো দা গামার পৈশাচিক ভূমিকা ছিল।
ভাস্কো দা গামা দ্বিতীয় ভারত সফরে আসার পথে ১৫০২ সালের অক্টোবরে ‘মেরি’ (Miri) নামক একটি জাহাজ আটক করে। এই জাহাজটি ভারত থেকে নারী ও শিশুসহ প্রায় চারশত হজযাত্রী নিয়ে মক্কায় যাচ্ছিল। পর্তুগিজরা জাহাজটি লুট করার পর ভাস্কো দা গামা জাহাজটিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেয়। প্রত্যক্ষদর্শী থোম লোপসের বর্ণনায়, হজযাত্রীরা নিজেদের সব সম্পদ দিয়ে প্রাণভিক্ষা চেয়েছিল; মায়েরা পর্যন্ত শিশুদের কোলে তুলে করুণা প্রার্থনা করেছিলেন। কিন্তু ভাস্কো দা গামা নির্মমভাবে জাহাজের যাত্রীদের ভেতরে আটকে আগুন ধরিয়ে দেয়। চার দিন ধরে জ্বলতে থাকা জাহাজ থেকে মানুষের আর্তনাদ ভেসে আসে। ঘটনাটি ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর নিষ্ঠুরতা ও মুসলিমদের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি তাদের অবজ্ঞার এক ভয়াবহ দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
জুহাইমানের বিদ্রোহ
বিংশ শতাব্দীতে যখন সারা বিশ্ব হজের প্রযুক্তিগত উন্নতি আর হাজিদের আরাম-আয়েশ নিয়ে ব্যস্ত, ঠিক তখনই কাবা প্রাঙ্গণে সংঘটিত হয় এক অভাবনীয় রক্তক্ষয়ী ঘটনা। ২০ নভেম্বর ১৯৭৯, হিজরি ১৪০০ সালের প্রথম দিন। ফজরের নামাজের পর জুহাইমান আল-উতাহিবির নেতৃত্বে একদল সশস্ত্র উগ্রবাদী পবিত্র মসজিদ আল-হারাম দখল করে নেয়।
জুহাইমান ছিল একজন সাবেক সেনাসদস্য এবং সৌদি রাজতন্ত্রের ঘোর বিরোধী। সে দাবি করে যে, তার শ্যালক মুহাম্মদ আবদুল্লাহ আল-কাহতানি হলেন ইসলামের প্রতিশ্রুত ‘মাহদি’। তারা কাবার সব দরজা বন্ধ করে দেয় এবং হাজার হাজার মুসল্লিকে জিম্মি করে। তাদের অভিযোগ ছিল, সৌদি শাসকগোষ্ঠী পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে মিত্রতা করে ইসলামকে কলুষিত করছে।
মসজিদ আল-হারামে রক্তপাত ও যুদ্ধ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কিন্তু পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে সৌদি সরকার ওলামাদের কাছ থেকে সামরিক অভিযানের ফতোয়া নেয়। সৌদি বাহিনী বেশ কয়েকবার ব্যর্থ হওয়ার পর ফরাসি এলিট ফোর্স GIGN-এর সহায়তা চায়। যেহেতু মক্কায় অমুসলিমদের প্রবেশ নিষেধ, তাই গুঞ্জন রয়েছে যে, সেই ফরাসি কমান্ডোদের সাময়িকভাবে ইসলাম গ্রহণ করিয়ে মক্কায় নেওয়া হয়েছিল। তারা ভূগর্ভস্থ টানেলে রাসায়নিক গ্যাস ব্যবহার করে বিদ্রোহীদের কাবু করে। দীর্ঘ দুই সপ্তাহের লড়াইয়ে কয়েকশ মানুষ নিহত হয় এবং কাবার চত্বর পরিণত হয় এক ধ্বংসস্তূপে।
কেন এ আঘাত
ইতিহাসের দীর্ঘ পরিক্রমায় আমরা যদি বিশ্লেষণ করি—কেন ইসলামের এই পবিত্রতম ইবাদত বারবার সহিংসতার শিকার হয়েছে, তবে কয়েকটি মূল কারণ বেরিয়ে আসে:
রাজনৈতিক বৈধতা : কাবার হেফাজতকারী হওয়া মানেই হলো মুসলিম বিশ্বের অবিসংবাদিত নেতা হওয়া। তাই বিভিন্ন রাজবংশ ও শক্তি সবসময় মক্কার নিয়ন্ত্রণ নিতে চেয়েছে।
অর্থনৈতিক গুরুত্ব : প্রাচীনকাল থেকেই মক্কা ছিল বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র। হজের সময় যে বিপুল বাণিজ্য ও অর্থের প্রবাহ থাকে, তা দখল করা ছিল অনেকেরই লক্ষ্য।
মতাদর্শিক সংঘাত : কারামাতি বা আধুনিক নানা উগ্রবাদীরা মনে করে, প্রচলিত হজ ব্যবস্থাটি ভুল। তারা তাদের নিজস্ব ‘বিশুদ্ধ’ ইসলাম চাপিয়ে দিতে বারবার হারামে রক্তপাত ঘটিয়েছে।
মানসিক আঘাত : শত্রুরা জানত, মক্কা বা হজের ওপর আঘাত করলে সমগ্র মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হবে। তাই ক্রুসেডার বা পর্তুগিজরা হজযাত্রীদের ওপর হামলাকে যুদ্ধের কৌশল হিসেবে বেছে নিয়েছিল।