হোম > সাহিত্য সাময়িকী > মুসলিম বিশ্বের ইতিহাস

বিবর্তনের ধারায় তাজিয়া মিছিল

ফখরুল ইসলাম ফয়সাল

মুসলিম ঐতিহ্যে হজের মৌসুমের পর হিজরি বর্ষের সমাপ্তি ঘটে। ক্যালেন্ডারের পাতায় মহররম মাসের মধ্য দিয়ে শুরু হয় নতুন হিজরি বর্ষ। মহররমের ১০ তারিখ—অর্থাৎ আশুরা ঘনিয়ে এলেই একটি চেনা দৃশ্য চোখে পড়ে। রঙিন কাগজ, বাঁশ ও কাঠের কারুকাজে তৈরি হয় হোসাইন (রা.)-এর সমাধির প্রতিকৃতি। শোকের স্লোগান এবং বুক চাপড়ে কান্নার রোল—এটাই আমাদের পরিচিত তাজিয়া মিছিল। তবে আজকের এই তাজিয়া মিছিল একদিনে এই রূপ লাভ করেনি; এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। এতে যুক্ত হয়েছে দেশ-বিদেশের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি।

‘তাজিয়া’ অর্থ সমবেদনা বা শোক প্রকাশ। পরিভাষাগতভাবে কারবালার ঘটনাকে স্মরণ করে শিয়া সম্প্রদায়ের আয়োজিত শোকানুষ্ঠানকে তাজিয়া বলে। ৬১ হিজরিতে কারবালার প্রান্তরে মহানবী (সা.)-এর দৌহিত্র হোসাইন (রা.) ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের শাহাদতের মর্মান্তিক ঘটনার স্মৃতি ধারণ করেই তাজিয়া প্রথার সূচনা।

তাজিয়া মিছিলের সূচনা

কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার পর থেকেই ইমাম হুসাইন (রা.)-এর স্মরণে শোক প্রকাশের বিভিন্ন রীতি গড়ে ওঠে। প্রাথমিক যুগে আহলে বাইতের অনুসারীরা কারবালায় গিয়ে তাঁর কবর জিয়ারত করতেন এবং বিশেষ করে, ১০ মহররমে একত্র হয়ে তাঁর শাহাদতকে স্মরণ করতেন। ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, মুখতার সাকাফি প্রথমদিকে কুফায় আশুরা উপলক্ষে শোকসভা আয়োজন করেন এবং হুসাইনের স্মরণে বিলাপের ব্যবস্থা করেন।

শুরুতে এসব অনুষ্ঠান স্বতঃস্ফূর্ত ও সীমিত পরিসরের ছিল। মানুষ কোরআন তিলাওয়াত করতেন, দোয়া-দরুদ পড়তেন এবং মর্সিয়া পাঠ করতেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব আয়োজন ধীরে ধীরে নির্দিষ্ট রীতি ও আনুষ্ঠানিকতায় রূপ নেয়।

চতুর্থ হিজরি শতকে বুয়াইহি শাসনামলে ইরাকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় আশুরার শোকানুষ্ঠান পালন শুরু হয়। তখন বাজার বন্ধ রাখা, কালো পোশাক পরিধান, শোকমিছিল ও গণসমাবেশের ব্যাপকতা দেখা যায়। পরে সাফাভি যুগে ইরানে হুসাইন (রা.)-এর স্মরণে শোকানুষ্ঠান আরো বিস্তৃত রূপ লাভ করে এবং তাজিয়া ও কারবালাভিত্তিক নাট্যরূপের বিকাশ ঘটে।

মিসরের ফাতেমীয় শাসনামলেও আশুরা রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন হতো। বাজার বন্ধ রাখা, মিছিল, নওহা ও শোকগাথা পাঠ ছিল এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একইভাবে আন্দালুস, ভারত, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, বাহরাইন, ওমান, লেবানন এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মিলিয়ে আশুরা পালনের ভিন্ন ভিন্ন রীতি গড়ে ওঠে।

দেশে দেশে কারবালা স্মরণের ভিন্ন রূপ

শিয়া মতবাদের মূল কেন্দ্র ইরাক ও ইরান। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, সেখানে কৃত্রিম কবর বানিয়ে তাজিয়া মিছিল করার রেওয়াজ নেই। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন মুসলিম দেশে এই শোক দিবসটি ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে পালিত হয় ।

ইরাক (কারবালা) : মহররমের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো কারবালা শহর। প্রতিবছর সেখানে লাখ লাখ মানুষ হজরত হোসাইন (রা.)-এর মূল সমাধিতে সমবেত হন। তারা কালো পোশাক পরে বিশাল পদযাত্রা করেন। এই মিছিলে কোনো কৃত্রিম তাজিয়া থাকে না। লাখো মানুষের বুক চাপড়ে ‘লাব্বায়িক ইয়া হোসাইন’ ধ্বনিতে চারপাশ প্রকম্পিত হয়।

ইরান : ইরানে শোক প্রকাশের ধরন বেশ নাট্যধর্মী। সেখানে ‘তাজিয়া’ বলতে কাঠের নকল কবর বোঝায় না। সেখানে এটি একটি ঐতিহ্যবাহী শোকনাট্য। অভিনেতারা কারবালার যুদ্ধের ঘটনাটি নাটকের আকারে অভিনয় করে দেখান। এছাড়া তারা ‘নাহল’ নামক বিশাল কাঠের কাঠামো ফুল ও কালো কাপড়ে সাজিয়ে শোভাযাত্রা করেন।

সৌদি আরব : সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ, বিশেষ করে কাতিফ ও আলআহসা এলাকায় শিয়া জনগোষ্ঠীর বসবাস। সেখানে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে নির্দিষ্ট এলাকায় শোকসভা বা ‘মজলিশ’ অনুষ্ঠিত হয়। তারা বুক চাপড়ে শোক প্রকাশ করেন। তবে সেখানে কোনো উন্মুক্ত তাজিয়া মিছিল বা লাঠিখেলা হয় না।

ইয়েমেন : ইয়েমেনের জাইদি শিয়া ও সুন্নি উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে কারবালার স্মরণে ভিন্ন আবহ দেখা যায়। বর্তমান হুতিনিয়ন্ত্রিত সানাআসহ বিভিন্ন এলাকায় মহররমের দিনগুলোয় বিশেষ ধর্মীয় আলোচনা ও কাসিদা পাঠ করা হয়। তারা কারবালার ট্র্যাজেডিকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেন।

লেবানন ও বাহরাইন : মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশগুলোয় বিশাল শোকমিছিল বের হয়। দিনভর চলে ধর্মীয় বয়ান ও শোকগাথা গাওয়া।

তুরস্ক ও আজারবাইজান : এখানকার শিয়া সম্প্রদায়ের মানুষ রক্তদানের মাধ্যমে শোক প্রকাশ করেন। এছাড়া তুরস্কের সুন্নি মুসলমানদের মধ্যেও একটি লোকজ ঐতিহ্য রয়েছে। তারা এই দিনে ‘আশুরে’ নামক এক বিশেষ মিষ্টি অন্ন বা ক্ষীর রান্না করে প্রতিবেশীদের মধ্যে বিতরণ করেন।

পাকিস্তান : পাকিস্তানের করাচি, লাহোর ও রাওয়ালপিন্ডিতে অত্যন্ত বিশাল ও জাঁকজমকপূর্ণ তাজিয়া মিছিল বের হয়। সেখানে বহুতল ভবনের সমান উঁচু ও ভারী কাঠের নিখুঁত কারুকাজ করা তাজিয়া তৈরি করা হয়। পাকিস্তানের এই মিছিলে শিয়াদের পাশাপাশি স্থানীয় সুন্নিদের অনেকেই অংশ নেন এবং তবারক বা খিচুড়ি বিতরণ করেন।

ভারত : ভারতের লখনৌ, হায়দারাবাদ এবং আমরোহা তাজিয়া মিছিলের জন্য বিখ্যাত। লখনৌয়ের ‘বড় ইমামবারা’ থেকে বের হওয়া মিছিলের জৌলুস বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। ভারতের কিছু অঞ্চলে হিন্দু-মুসলিম যৌথ সংস্কৃতির অংশ হিসেবেও তাজিয়া মিছিলে অমুসলিমদের অংশগ্রহণ দেখা যায়।

বাংলাদেশে তাজিয়া মিছিল ও বর্ণাঢ্য উদযাপন

বাংলাদেশে তাজিয়া মিছিলের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো ঢাকা শহর। মোগল সুবেদার শাহ সুজার শাসনামলে ১৬৪২ খ্রিষ্টাব্দে মীর মুরাদ ঢাকার পুরান ঢাকায় ঐতিহাসিক ‘হোসাইনী দালান’ বা ইমামবাড়া নির্মাণ করেন। তখন থেকেই মূলত ঢাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে তাজিয়া মিছিলের প্রচলন শুরু হয়।

ঢাকায় এই শোকের আবহাওয়া মহররমের প্রথম দিন থেকেই শুরু হয়ে যায়। হোসাইনী দালানকে কালো কাপড়ে সাজানো হয়। মহররমের ১ থেকে ৯ তারিখ পর্যন্ত প্রতি রাতে সেখানে মজলিশ বা বিশেষ শোকসভার আয়োজন করা হয়, যেখানে কারবালার বিষাদময় কাহিনি শোনানো হয়।

আশুরার দিন সকালে হোসাইনী দালান থেকে প্রধান তাজিয়া মিছিল বের হয়। ঢাকার এই মিছিলে বেশ কিছু আকর্ষণীয় ও ঐতিহাসিক উপাদান রয়েছে।

রুপার তাজিয়া : মিছিলে কাঠের তৈরি বিশাল একটি প্রধান তাজিয়া থাকে। যার ওপর রুপার চমৎকার আবরণ দেওয়া। ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহ এই রুপার আবরণটি দান করেছিলেন।

দুলদুল বা প্রতীকী ঘোড়া : মিছিলের অন্যতম বড় আকর্ষণ হলো দুটি সুসজ্জিত ঘোড়া। এদের একটিকে সাজানো হয় হজরত হোসাইন (রা.)-এর বিশ্বস্ত যুদ্ধাশ্ব ‘দুলদুল’-এর প্রতীক হিসেবে। ঘোড়াটির গায়ে লাল রঙ বা মেহেদি দিয়ে রক্তের দাগের আবহ তৈরি করা হয়, যা কারবালার ময়দানের ক্ষতকে স্মরণ করায়।

আলম বা নিশান : মিছিলের অগ্রভাগে থাকে ‘আলম’ বা বিশেষ পতাকা বহনকারী দল। এই পতাকাকে ইমাম হোসাইন (রা.)-এর সেনাদলের প্রতীক মনে করা হয়।

বাদ্যদল ও লাঠিখেলা : মিছিলের শুরুতে থাকে ঢাকঢোল ও বাদ্যকরদের দল। তাদের পেছনে একদল যুবক তরবারি, ঢাল ও লাঠি নিয়ে নানা রকম কসরত বা লাঠিখেলা প্রদর্শন করতে করতে এগিয়ে যায়। পুরান ঢাকার হোসাইনী দালান থেকে শুরু হয়ে মিছিলটি বড় কাটরা, চকবাজার, নবাবপুর রোড হয়ে ধানমন্ডির অস্থায়ী ‘কারবালা’ প্রাঙ্গণে গিয়ে শেষ হয়। এছাড়া মিরপুরের শিয়া ক্যাম্প ও মোহাম্মদপুর থেকেও ঢাকার বিভিন্ন রাস্তায় ছোট-বড় অনেক তাজিয়া মিছিল বের হয়।

ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি ও বিতর্ক

তাজিয়া মিছিলটি লোকজ সংস্কৃতির অংশ হিসেবে সমাজে টিকে আছে। তবে ইসলামি শরিয়তের মূলধারায় এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে এবং এ বিষয়ে বিভিন্ন মতপার্থক্য দেখা যায়। ওলামায়ে কেরাম ও ইসলামি গবেষকদের একাংশের মতে, ইসলামে এ ধরনের প্রতিকৃতি তৈরি করে মিছিল করা কিংবা মাতমের কোনো স্থান নেই।

তাছাড়া, ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, এই মিছিলের বাহ্যিক অবয়ব এবং বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার অনেক সময় অন্য ধর্মীয় উৎসবের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাদের মতে, এটি ইসলামের মৌলিক তাওহিদি চেতনার পরিপন্থী হতে পারে।

ইতিহাসের সন্ধিক্ষণ

তাজিয়া মিছিল আজ শুধুই একটি ধর্মীয় আচার নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাসের নানা বাঁকবদল, মোগল স্থাপত্যের স্মৃতি এবং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মুসলিম সংস্কৃতির বৈচিত্র্য। সময়ের নিয়মে হয়তো এর ভেতরের রক্তাক্ত মাতম ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসছে। কানফাটা ঢাকের আওয়াজও কমে গেছে। কিন্তু ৩৫০ বছরের পুরোনো হোসাইনী দালানের ফটক পেরিয়ে যখন আজও রুপালি রঙের তাজিয়াটি রাস্তায় বের হয়, তখন তা এক ভিন্ন আবহ তৈরি করে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় কয়েকশ বছর আগের হারিয়ে যাওয়া ঢাকাকে। বিবর্তনের এই ধারায় তাজিয়া মিছিল তার জৌলুস হারালেও ইতিহাসের পাতায় এর দাগ থেকে যাবে আরো বহু বছর।

ইতিহাস বিশ্লেষণ রুহানিয়াত অনুসন্ধান

মুসলিম বিশ্বের ইতিহাস ক্যালেন্ডার

মধ্যযুগ : বহুমুখী জ্ঞানচর্চার স্বর্ণসময়

ইরাক অঞ্চলে অন্যান্য বিজয়

মুসলিম বিশ্বের টুকরো ইতিহাস

নৌপ্রযুক্তিতে মুসলিম সভ্যতার অবদান

আব্বাসী খেলাফতের শাহি রান্নাঘরে

সুলতানা শাজারাতুদ দুর

খেলাফতে রাশেদার শাম অভিযান : আজনাদাইনের যুদ্ধ

আলজাজারির বিস্ময়কর উদ্ভাবন