হোম > সাহিত্য সাময়িকী > মুসলিম বিশ্বের ইতিহাস

ইতিহাস বিশ্লেষণ রুহানিয়াত অনুসন্ধান

মিসরের মাশহাদে হুসাইন

আব্দুল্লাহ আল মাহী

মহররম মাসের ১০ তারিখে কারবালার প্রান্তরে নবী পরিবারের সঙ্গে সংঘটিত মর্মান্তিক ঘটনার কারণে মুসলিম বিশ্বে কারবালা ও মহররম হয়ে উঠেছে অত্যাচার এবং জুলুমের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও বেদনার এক অনন্য আখ্যান। মহররম ও কারবালা নিয়ে বহু কবি কবিতা লিখেছেন, বহু গায়ক গান গেয়েছেন; বহু চোখ অশ্রুসিক্ত হয়েছে, অসংখ্য হৃদয় বিদীর্ণ হয়েছে।

৬১ হিজরির কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার পর হুসাইন (রা.)-এর পবিত্র মাথা মোবারকের পরিণতি সম্পর্কে ইতিহাসে একাধিক মত পাওয়া যায়। তার দেহ কারবালায় দাফন করা হয়। আর তার খণ্ডিত মাথা মোবারক দামেস্কে ইয়াজিদের দরবারে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলে অধিকাংশ ঐতিহাসিক সূত্র উল্লেখ করেছে। দামস্ক থেকে এরপর তার মস্তক কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়, সে বিষয়ে বিস্তর মতভেদ রয়েছে।

১. একদল ঐতিহাসিকের মতে, দামেস্ক থেকে হুসাইন (রা.)-এর মাথা মোবারক কারবালায় এনে দাফন করা হয়। ২. অন্যমতে, সিরিয়ার আলেপ্পোতে দাফন করা হয়েছিল; সেখানে একটি মাজারও রয়েছে। ৩. কেউ কেউ বলেন, ফিলিস্তিনের আসকালানে দাফন করা হয়েছিল। ৪. অন্য একটি প্রসিদ্ধ মতে, আসকালান থেকে ৫৪৯ হিজরি (১১৫৩ খ্রিষ্টাব্দ) সালে ক্রুসেড যুদ্ধের সময় কায়রোতে স্থানান্তর করা হয় এবং সেখানে দাফন করা হয়।

হুসাইন (রা.)-এর মাথা মোবারক নিয়ে সম্ভাব্য যতগুলো স্থানের নাম উঠে এসেছে, সব জায়গায় মাজারের উপস্থিতি আছে। এর বড় কারণ, স্থানীয় ধর্মীয় কর্তৃত্ব এবং রাজনৈতিক কৃতিত্বকে রক্ষা করা।

ইরাক, আলেপ্পো এবং আসকালানের মাজারগুলো কারবালার ঘটনার সমসাময়িক সময়ে গড়ে ওঠার পেছনে সুস্পষ্ট ঐতিহাসিক কারণ রয়েছে। তবে কারবালার ঘটনার প্রায় ৫০০ বছর পর পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। এ ঘটনাটি ঘটে ৫৪৮ হিজরি (১১৫৩ খ্রিষ্টাব্দ) সময়ে, যখন ফাতিমি সাম্রাজ্যের শেষ পর্যায় চলছিল। একই সময় ক্রুসেড যুদ্ধ চলমান ছিল।

ফাতিমিদের হাত থেকে একের পর এক অঞ্চল শত্রুর দখলে চলে যাচ্ছিল। ফিলিস্তিনের আসকালান তখনো ফাতিমিদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। সেখানেই হুসাইন (রা.)-এর শির মোবারক দাফন করা ছিল বলে ঐতিহাসিকভাবে উল্লেখ পাওয়া যায়। ফাতিমি সাম্রাজ্য আহলে বাইয়াতের ঐতিহ্যকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে মিসরসহ আশপাশের বহু সুন্নি অধ্যুষিত অঞ্চল দীর্ঘদিন শাসন করেছিল।

রাষ্ট্রীয় সংকটময় পরিস্থিতিতে ফাতিমিরা আশঙ্কা করছিল যে, যদি হুসাইন (রা.)-এর মাশহাদ ক্রুসেডারদের হাতে চলে যায়, তবে তা তাদের জন্য বড় রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংকট সৃষ্টি করবে। তখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, শির মোবারক আসকালান থেকে কায়রোতে স্থানান্তর করা হবে।

ফাতিমি শাসনের শেষপর্যায়ে রাষ্ট্রে উজিরদের প্রভাব খলিফার চেয়েও বেশি ছিল। তাই উজির সালিহ তলাঈর তত্ত্বাবধানে কায়রোর শহর প্রাচীরের বাইরে একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়, যেখানে শির মোবারক সংরক্ষণ করা হবে। এর মাধ্যমে ফাতিমিরা রাজনৈতিক ও ধর্মীয়ভাবে নিজেদের অবস্থান আরো শক্তিশালী করতে চেয়েছিল। এ ঘটনার শত বছর পরে ফাতিমি ও মামলুকি ঐতিহাসিক মাকরিজি বলেন, “৫৪৮ হিজরির ৮ জমাদিউস সানি (৩১ আগস্ট ১১৫৩ খ্রিষ্টাব্দ) তারিখে ইমাম হুসাইন (রা.)-এর মস্তক মোবারক আসকালান থেকে কায়রোতে স্থানান্তর করা হয়। ফাতেমীয় যুবরাজ সাইফুল মামলাকা তামিম এই স্থানান্তরের দায়িত্বে ছিলেন। ১০ জমাদিউস সানি (২ সেপ্টেম্বর ১১৫৩ খ্রিষ্টাব্দ) মস্তক মোবারক কায়রোতে পৌঁছালে বিশেষ আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে তা রাজপ্রাসাদে নেওয়া হয় এবং পরে দাইলামের গম্বুজের নিচে দাফন করা হয়। এ উপলক্ষে উজির সালিহ তালাঈ বাব জুওয়াইলার বাইরে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। মসজিদটি ‘মসজিদে সালিহ তালাঈ’ নামে পরিচিত। বর্ণনা অনুযায়ী, মস্তক মোবারককে এই মসজিদে গোসল করানো হয়েছিল এবং সেই কাজে ব্যবহৃত কাঠের তক্তা দীর্ঘকাল সেখানে সংরক্ষিত ছিল।”

বর্তমান কায়রো পৃথিবীর অন্যতম টুরিস্ট ডেসটিনেশন। সে সুবাদে প্রতিবছর পৃথিবীর বহু প্রান্ত থেকে দর্শনার্থী ও ভক্তকুল সবাই কায়রোর মাশহাদে হুসাইনে এসে থাকে এবং হুসাইন (রা.)-এর মাথা নিয়ে ভিন্নমত বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে মিসরের দারুল ইফতা বলেন, ‘সাইয়েদানা ইমাম হুসাইন (রা.)-এর মস্তক মোবারক কায়রোতে দাফন করা হয়েছে কি না, এটি ঐতিহাসিক বিতর্ক, কোনো আকিদাগত বা শরয়ি বিষয় নয়। তাই এ বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করলে কাউকে গুনাহগার বা বিভ্রান্ত বলা যায় না। এটি মূলত ঐতিহাসিক তথ্যের গ্রহণ-বর্জনের প্রশ্ন।

ইতিহাসবিদ ও জীবনীকাররা একমত যে, ইমাম হুসাইন (রা.)-এর দেহ মোবারক কারবালায় দাফন করা হয়েছে। তবে মস্তক মোবারকের দাফনস্থান নিয়ে মতভেদ রয়েছে। একদল ইতিহাসবিদের মতে, পরবর্তীকালে তা মিসরে স্থানান্তর করা হয়েছিল। ইবনে মুইসসার, কালকাশান্দি, সিবত ইবনুল জাওজি, হাফিজ সাখাবিসহ বহু ইতিহাসবিদ এ মতের সমর্থন করেছেন।

যদিও ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কারণে শিয়া ফাতিমিদের হাত ধরে ইমাম হুসাইন (রা.)-এর শির মোবারক কায়রোতে আনা হয়েছিল, তবে নবী পরিবারের প্রতি জনসাধারণের ভক্তি ও শ্রদ্ধা-পরবর্তী শতাব্দীগুলোয় আইয়ুবি, মামলুক, উসমানি ও আধুনিক মিসরের বিভিন্ন শাসককে এই মাজারের প্রতি একধরনের ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতায় যুক্ত করে রেখেছে।

প্রত্যেক শাসকই এই মাজারে নিজের স্থাপত্য ও প্রশাসনিক ছাপ রেখে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। বর্তমানে মিসরেও ইমাম হুসাইন (রা.)-এর মাজার-মসজিদটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে বিশেষ মর্যাদা বহন করে।

মিসরে প্রতিবছর রবিউল আখিরের শেষ মঙ্গলবার মওলিদে হুসাইন উদযাপিত হয়। এই দিবসটি মূলত তার স্মরণ দিবস হিসেবে পালিত হয়। কায়রোর গামালিয়া ডিস্ট্রিক্টের অলিগলি মানুষ, তাঁবু এবং মুসাফিরদের আগমনে গমগম করতে থাকে।

এখানে-সেখানে তাঁবু ফেলে দূরদূরান্ত থেকে আসা লোকজন জিকির-দোয়ায় মশগুল থাকেন। উট ও দুম্বা জবাই করা হয়। মুসাফিরদের জন্য রান্নাবান্নার আয়োজন চলে। রাত নামলেই অলিগলিতে জিকিরের ধ্বনি ছড়িয়ে পড়ে। আহলে বাইত এবং নবী (সা.)-এর শানে পরিবেশন করা হয় ঐতিহ্যবাহী সংগীত। গাওয়া হয় মর্সিয়া ও কসিদায়ে বুরদা। দফ ও হাতের নানা তালের কলাকৌশলে সৃষ্টি হয় এক ভিন্নতর পরিবেশ।

সাত দিন ধরে চলে মওলিদে হুসাইন। মিসরের বিভিন্ন সুফি তরিকা এতে অংশগ্রহণ করে। আলেম-উলামা, পির-মাশায়েখ, ধনী-গরিব সবাই মিলেমিশে উৎসবমুখর পরিবেশে একাকার হয়ে যান।

মিসরের অনেক জায়গা, অনেক গ্রামে আমি গিয়েছি। কোথায় থাকি—এই প্রশ্নের উত্তরে যখন বলি, ‘কায়রো’, তখন প্রায় সবাই একটি কথাই বলেন—‘মাওলা সাইয়্যিদিনা হুসাইনের দরবারে আমার সালাম পৌঁছে দিও।’

পাকিস্তান থেকে একবার এক টুরিস্ট এলেন। নাম নিয়াজি। আমাকে এক টুকরো সবুজ কাপড় দেখিয়ে বললেন, ‘আমি এটা আমার প্রতিবেশীর মাধ্যমে কারবালার মাজার থেকে আনিয়েছি। আর আজকে এখানে (কায়রোর মাশহাদে হুসাইন) নিয়ে আসতে পারলাম। আলহামদুলিল্লাহ, অর কুচ নেহি চাহিয়ে।’

বাংলাদেশ থেকে আরেকজন টুরিস্ট এসেছিলেন। অনেক দিন পর আমাকে ফোন করে বলছিলেন, ‘বিশেষ একটা নিয়ত নিয়ে আমি কায়রোর হুসাইনের মাজারে গিয়েছিলাম। আমার নিয়ত পূর্ণ হয়েছে।’

ইমাম হুসাইন হচ্ছেন পৃথিবীর ইতিহাসে নির্যাতন, জুলুম, অবিচার, অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে অনমনীয়তার প্রতীক। আর মহররম হচ্ছে, আমাদের চেতনার জুলাই।

মুসলিম যুবসমাজকে ইমাম হুসাইনের মতো অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথানত না করার আহ্বান জানিয়ে কবি বলেছেন,

দুই হাত কাটা তবু শের নর আব্বাস

পানি আনে মুখে হাকে ‘দুশমন ও সাব্বাস’ ।

দ্রিম দ্রিম বাজে ঘন দুন্দভী দামামা

হাকে বীর ‘শীর দেগা নেহী দেগা আমামা’

(মোহররম, কাজী নজরুল ইসলাম)

লেখক : শিক্ষার্থী, হিস্টোরি অ্যান্ড সিভিলাইজেশন, আল-আজহার ইউনিভার্সিটি, কায়রো, মিসর

বিবর্তনের ধারায় তাজিয়া মিছিল

মুসলিম বিশ্বের ইতিহাস ক্যালেন্ডার

মধ্যযুগ : বহুমুখী জ্ঞানচর্চার স্বর্ণসময়

ইরাক অঞ্চলে অন্যান্য বিজয়

মুসলিম বিশ্বের টুকরো ইতিহাস

নৌপ্রযুক্তিতে মুসলিম সভ্যতার অবদান

আব্বাসী খেলাফতের শাহি রান্নাঘরে

সুলতানা শাজারাতুদ দুর

খেলাফতে রাশেদার শাম অভিযান : আজনাদাইনের যুদ্ধ

আলজাজারির বিস্ময়কর উদ্ভাবন