রিশাদ বারান্দার গ্রিলের দিকে তাকিয়ে আছে। চার নম্বর খাঁজ আর পাঁচ নম্বর খাঁজের মধ্যবর্তী দূরত্বটা কোনো এক অজানা কারণে অন্যগুলোর চেয়ে ঠিক দেড় মিলিমিটার বেশি। মিস্ত্রি ইউনুস যখন গ্রিলটা বসাচ্ছিল, রিশাদ তখন তিনবার ফিতা দিয়ে মেপে দিয়েছিল। ইউনুস বিড়ি টানতে টানতে বলেছিল, ‘খালুজান, চোখের আন্দাজে ধরলে দুনিয়া সিধা। ফিতার মাপে চললে কলিজা ফাইটা যাইব।’
ইউনুসের কলিজা ফাটেনি, সে বিল নিয়ে বিদায় হয়েছে। কিন্তু রিশাদের বুকের ভেতর এই দেড় মিলিমিটার একটা ধারালো পেরেকের মতো খচখচ করছে। আশ্বিনের চটচটে রোদ গ্রিলের ওপর এসে পড়েছে। রিশাদের মনে হচ্ছে, রোদটাও ঠিক সমানভাবে ছড়াচ্ছে না। ডানদিকের আলোটা কেমন যেন একটু বেশি হলুদ, বামদিকেরটা মলিন।
রিশাদ পেশায় স্থপতি। ঢাকায় তার তৈরি করা চারটে বহুতল ভবন আছে, যেগুলোর দিকে তাকালে মানুষের চোখ জুড়িয়ে যায়। কোথাও কোনো বাঁকা লাইন নেই, কোথাও কোনো বাড়তি কোণ নেই। অথচ রিশাদের নিজের ফ্ল্যাটটাই এখন তার জন্য একটা নরক হয়ে উঠছে।
ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে আছে তার ফুফাতো ভাই মকবুল। মকবুলের চেহারার মধ্যে একটা অদ্ভুত অসমতা আছে। তার একটা চোখ অন্যটার চেয়ে সামান্য নিচে, হাসলে বামদিকের গালটা বেশি ঝুলে পড়ে। রিশাদের এই মানুষটার দিকে তাকালেই বমি ভাব হয়, কিন্তু মকবুল পরম নিশ্চিন্তে পায়ের ওপর পা তুলে বসে আছে। তার হাতে একটা লেবু। সে নখ দিয়ে লেবুর খোসা ছাড়াচ্ছে। লেবুর তীব্র, টক গন্ধটা ঘরের বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছে। রিশাদের নাকের ছিদ্র সংকুচিত হয়ে এলো। গন্ধটাও যেন সুষম নয়, ডান নাকে বেশি ঢুকছে।
মকবুল বলল, ‘রিশাদ ভাই, ভাবির খবর কী? চিটাগাং থাইকা কবে ফিরব?’
রিশাদ মকবুলের চোখের দিকে না তাকিয়ে তার কলারের দিকে তাকাল। কলারের বামদিকের বোতামটা একটু আলগা। সে শান্ত গলায় বলল, ‘জেসমিন আর ফিরবে না।’
মকবুল লেবুর কোয়া মুখে পুরে দিয়ে বলল, ‘ফিরব না মানে কী? কাইজ্জা হইছে? আরে জামাই-বউয়ের মধ্যে একটু-আধটু আধো-আঁধি তো থাকেই। এই যেমন ধরেন, আমার বউডারে আমি সপ্তাহে দুদিন গালি দেই, তিন দিন মাথায় তুলি। ব্যালান্স!’
রিশাদ একটু হাসার চেষ্টা করল। মকবুলের মতো স্থূল বুদ্ধির মানুষ ‘ব্যালান্স’ শব্দটার কী বোঝে? জেসমিন চলে গেছে, কারণ সে রিশাদের এই নিখুঁততার সংসার সহ্য করতে পারেনি। একদিন রাতে জেসমিন ডাল রান্না করেছিল। ডালের বাটিটা টেবিলের ঠিক মাঝখানে ছিল না, তিন ইঞ্চি বামে সরে ছিল। রিশাদ পুরো বাটিটা তুলে মেঝেতে আছাড় মেরেছিল। জেসমিন কেঁদে বলেছিল, ‘তুমি মানুষ না, রিশাদ, তুমি একটা জ্যামিতি বক্স।’
মানুষ চলে গেলে ঘর ফাঁকা হয়, কিন্তু রিশাদের ঘরটা যেন আরো বেশি জ্যামিতিক হয়ে উঠেছে। কোনো মানুষের স্পর্শহীন এই ঘর এখন পুরোপুরি তার নিয়ন্ত্রণে।
২
রাত এগারোটা। চারপাশ নিঝুম। ঢাকার এই এলাকাটায় রাতের বেলা একটা থমথমে নীরবতা নেমে আসে। মাঝে মাঝে দূর থেকে ট্রেনের হুইসেল ভেসে আসে, যা বাতাসের স্তরগুলোকে অসমানভাবে কাঁপিয়ে দিয়ে যায়।
রিশাদ তার শোবার ঘরের বড় ড্রেসিং টেবিলটার সামনে দাঁড়াল। ঘর অন্ধকার, শুধু একটা জিরো ওয়াটের নীল বাল্ব জ্বলছে। রিশাদ কাপড়চোপড় সব খুলে ফেলল। আদিম, নগ্ন এক শরীর নিয়ে সে দাঁড়িয়ে আছে। সে তার থ্রি-ডি লেজার স্ক্যানারটা অন করল। এই যন্ত্রটা সে জার্মানি থেকে আনিয়েছে, যা যেকোনো বস্তুর নিখুঁত ত্রিমাত্রিক পরিমাপ দিতে পারে।
নীল লেজার রশ্মিটা রিশাদের পায়ের নখ থেকে শুরু করে মাথা পর্যন্ত স্ক্যান করতে লাগল। ল্যাপটপের স্ক্রিনে তার শরীরের ডিজিটাল নকশা ফুটে উঠছে। রিশাদ চোখ সরু করে স্ক্রিনের সংখ্যার দিকে তাকাল।
হঠাৎ তার হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন একটা ধাক্কা খেল। ঘরের ভেতরের বাতাস যেন এক নিমেষে ভারী হয়ে গেল।
ল্যাপটপের লাল ফ্ল্যাশিং লাইটটা দেখাচ্ছে—তার ডান কানটি বাম কানের চেয়ে ঠিক ৩ দশমিক ৪ মিলিমিটার নিচের দিকে এবং আকারে সামান্য বড়। আরো ভয়ানক তথ্য হলো, তার বাম হাতের মধ্যমা আঙুলটি ডান হাতের মধ্যমার চেয়ে ২ দশমিক ১ মিলিমিটার ছোট।
রিশাদ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার কপালে ঠান্ডা ঘাম জমে উঠছে। এত বড় একটা প্রতারণা? সে সারা জীবন পৃথিবীর সবকিছুর মধ্যে প্রতিসাম্য খুঁজে বেড়াল, অথচ তার নিজের শরীরটাই একটা চরম কুৎসিত, অসমাপ্ত খাঁচা? তার ডান আর বাম পাশ এক নয়! সৃষ্টিকর্তা তাকে বানানোর সময় পরিমাপে ভুল করেছিলেন!
বাইরে তখন একটা রাতজাগা পাখি ডাকছে—কটু-কটু, কটু-কটু। শব্দটা রিশাদের কানের পর্দায় এসে বিঁধছে। তার মনে হলো, পাখিটাও তাকে উপহাস করছে। সে বাথরুমে গিয়ে দাঁড়াল। বেসিনের ওপর রাখা লাইটটা জ্বেলে দিল। তীব্র সাদা আলোয় তার নিজের চেহারাটা কেমন যেন অচেনা ঠেকল। আয়নার কাচটা সে গত সপ্তাহে ভেঙে ফেলেছে, কারণ কাচের পেছনে পারদের প্রলেপটা সব জায়গায় সমান ছিল না। এখন সে দেয়ালের টাইলসের চকচকে তলে নিজের ছায়া দেখছে।
‘ঠিক করতে হবে,’ রিশাদ ফিসফিস করে বলল। তার গলা দিয়ে যে শব্দটা বেরোল, তা মানুষের নয়, যেন কোনো মরচে ধরা কবজির আর্তনাদ। ‘সংশোধন প্রয়োজন।’
সে ড্রয়ার থেকে তার আর্কিটেকচারাল টুলবক্সটা বের করল। সেখানে আছে অত্যন্ত ধারালো সার্জিক্যাল স্ক্যালপেল, নিখুঁত পরিমাপের স্টিল রুলার এবং ক্লোরোফর্মের একটা ছোট শিশি। ক্লোরোফর্মটা সে এনেছিল ল্যাবরেটরির একটা কাজের জন্য। সে একটা চেয়ার টেনে বসল। দেয়ালের টিকটিকিটা স্থির হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
রিশাদ ক্লোরোফর্মের শিশিটা খুলল। মিষ্টি, তীব্র একটা গন্ধ ঘরের বাতাসকে অবশ করে দিল। সে কটন বার্ডে কিছুটা তরল নিয়ে তার ডান কানের লতিতে লাগাল। জায়গাটা অবশ হয়ে আসছে। স্টিল রুলার দিয়ে সে মেপে নিল, ঠিক ৩ দশমিক ৪ মিলিমিটার বাড়তি অংশ কোনটা। স্ক্যালপেলটা চামড়ার ওপর ছোঁয়াতেই একটা শীতল অনুভূতি হলো। তারপরই উষ্ণ, ঘন লাল রক্ত চুইয়ে পড়তে লাগল। রিশাদের কোনো কষ্ট হচ্ছে না। তার মনে হচ্ছে, সে একটা ত্রুটিপূর্ণ দেয়াল চেঁছে সোজা করছে। রক্তের লাল রঙটা নীল আলোর নিচে কেমন যেন কালচে দেখাচ্ছে।
রিশাদ এক টুকরো মাংস কেটে আলাদা করল। তারপর তুলা দিয়ে চেপে ধরল। তার ঠোঁটের কোণে একটা তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। আহ্, এখন ডান কানটা ঠিক বাম কানের সমান্তরালে এসেছে।
কিন্তু হাতটা? বাম হাতের মধ্যমা আঙুলটা ২ দশমিক ১ মিলিমিটার ছোট। ছোট জিনিসকে তো টেনে বড় করা যায় না। তাহলে?
রিশাদ ল্যাপটপের দিকে তাকাল। সমতা আনার একটাই উপায়—ডান হাতের মধ্যমা আঙুল থেকে ঠিক ২ দশমিক ১ মিলিমিটার কেটে ছোট করে ফেলা।
সে ডান হাতটা টেবিলের ওপর রাখল। বাতিটার আলো সরাসরি আঙুলের ওপর পড়ছে। স্ক্যালপেলটা বাম হাতে নিল। বাম হাতটা কাঁপছে। স্থপতির হাত কাঁপতে পারে না। রিশাদ চোখ বন্ধ করল। সে জেসমিনের কথা ভাবল। জেসমিন বলত, ‘রিশাদ, তোমার মনটা একটা কবরস্থান, যেখানে শুধু সোজা লাইন খুঁড়ে রাখা হয়েছে।’
রিশাদ চোখ খুলল। স্ক্যালপেলের ধারালো ফলাটা সে ডান হাতের আঙুলের ডগায় বসালো। চামড়া ভেদ করে ব্লেডটা যখন হাড়ের উপর গিয়ে ঠেকল, তখন একটা তীব্র, তীক্ষ্ণ যন্ত্রণা তার মস্তিষ্কে আছাড় খেল। সে দাঁতে দাঁত চাপল। কোনো চিৎকার নয়। চিৎকার করলে ঘরের ভেতরের বাতাসের কম্পন অসমান হয়ে যাবে।
রক্তে টেবিলটা ভেসে যাচ্ছে। রক্তের ধারাটা টেবিলের কোণ বেয়ে মেঝেতে পড়ছে—টপ, টপ, টপ। প্রতিটি ফোঁটা পড়ার মধ্যবর্তী সময়টা একেবারে সমান। রিশাদ মনে মনে গুনছে—এক সেকেন্ড, দুই সেকেন্ড, তিন সেকেন্ড।
৩
পরদিন সকালে মকবুল আবার এলো। তার হাতে একটা মাটির হাঁড়ি। গ্রামের বাড়ি থেকে খাঁটি মহিষের দই এসেছে। রিশাদ দই পছন্দ করে, তাই সে নিয়ে এসেছে।
দরজায় কড়া নাড়তেই মকবুল দেখল, দরজাটা খোলাই আছে। সে ডাকল, ‘রিশাদ ভাই? ও রিশাদ ভাই!’
ভেতর থেকে কোনো সাড়া নেই। ঘরটা কেমন যেন অতিরিক্ত অন্ধকার। আর একটা অদ্ভুত গন্ধ আসছে—লোহার মতো কাঁচা গন্ধ, যার সঙ্গে মিশে আছে লেবুর টক সুবাস আর ক্লোরোফর্মের তীব্রতা।
মকবুল ড্রয়িংরুম পার হয়ে শোবার ঘরে ঢুকল। ঘরের মেঝেতে লাল রঙের একটা নিখুঁত বৃত্ত আঁকা। রিশাদ মাঝখানে বসে আছে। তার সারা শরীর রক্তে ভেজা। তার ডান কানটার অর্ধেকটা নেই, সেখানে ব্যান্ডেজ করা। আর তার ডান হাতটা একটা প্লাস্টিকের স্কেলের উপর সোজা করে রাখা, সেখান থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় রক্ত পড়ছে।
রিশাদ মকবুলের দিকে তাকাল। তার চোখ দুটো যেন দুটো পাথরের টুকরো। সে ফিসফিস করে বলল, ‘মকবুল, দেখ। ল্যাপটপটা দেখ।’
মকবুল ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকাল। স্ক্রিনে থ্রি-ডি মডেলের নিচে সবুজ অক্ষরে লেখা উঠেছে : ১০০% সিমেট্রিক্যাল (Symmetrical)।
রিশাদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এতদিনে তার জীবনটা সম্পূর্ণ হলো। তার চারপাশের বাতাস, তার শরীরের রক্তকণিকা, তার ঘরের দেয়াল—সব এখন নিখুঁত, সব সমান। সে মকবুলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘মকবুল, তোমার বাম চোখটা একটু নিচে না? এসো, ওটা ঠিক করে দিই। আমার কাছে স্কেল আছে।’
মকবুল দইয়ের হাঁড়িটা মেঝেতে ফেলে চিৎকার দিয়ে পেছনের দিকে ছুটল। হাঁড়িটা ভেঙে দই আর সাদা মাটির টুকরোগুলো ছড়িয়ে পড়ল। রিশাদ তীব্র বিরক্তিতে চোখ বন্ধ করল। মকবুলটা সব নষ্ট করে দিল। দইয়ের টুকরোগুলো মেঝেতে একদম অসমানভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। ডানদিকে বেশি, বামদিকে কম।
রিশাদ আবার স্ক্যালপেলটা হাতে নিল। মেঝেটা পরিষ্কার করতে হবে। সবকিছুর একটা পরিমাপ আছে। দুনিয়াটা অগোছালো থাকতে পারে না।