হোম > সাহিত্য সাময়িকী > গল্প

ভরকেন্দ্র

মুহম্মদ মাহের নূর

মাঝে মাঝে রায়হানের নিজেকে একটা স্কেলার রাশি মনে হয়। সামান্য কিছু মান হয়তো আছে, কিন্তু কোনো দিক নেই। দিক না থাকার ব্যাপারটা একদম শুরু থেকেই।

জামা-জুতা, বই-খাতা, গোসল-খাওয়া—কোনোকিছু নিয়েই তার কখনো কোনো গোছানো মনোভাব ছিল না। বাসায় থাকলে পড়ে পড়ে ঘুমাত। বেলা বাড়লে মাঝেমধ্যে পড়াশোনার নাম করে স্কুলে গেলেও আদতে সারা দিন করত খেলাধুলা। প্রবল ফুটবল পিটিয়ে বন্ধুমহলে রোনালদো রায়হান হিসেবে প্রচুর বাহবা পেলেও স্বভাবতই রিপোর্ট কার্ডে পর্যাপ্ত নাম্বার সে কখনোই পায়নি।

বাবা-মা প্রচুর চেষ্টা করেছেন। বেতের বাড়িতে পায়ে দাগ বসে গেছে। কিন্তু নাম্বারের এই দৈন্যকে স্কুলকালে রায়হান পাত্তা দেয়নি। ভেবেছে লুতুপুতু টাইপ ক্লাসওয়ার্ক-হোমওয়ার্ক, লসাগু-গসাগু—এসব তেমন কোনো ব্যাপার নয়। কলেজে উঠে সামলে নেবে। সামলে নিতে সে পারেনি, বরং আরো পিছলে গেছে। পাশের কলেজের ইঁচড়ে পাকা এক মেয়ের পিছে ঘুরতে ঘুরতে সিগারেট ফুঁকে সে বছর দেড়েক চোখের নিমিষে ছাই করে ফেলল। তারপর ঘড়ির কাঁটা বেয়ে যখন ঘনিয়ে এলো পরীক্ষা, টেবিলে বই খুঁজে পেল না রায়হান।

শেষমেষ খাটের তলের নিম্নতম স্তর থেকে যখন ধুলোমাখা উচ্চমাধ্যমিকের বইগুলো বের করল রায়হান, ততক্ষণে ক্ষতি যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। দীর্ঘদিনের মরিচা পড়ায় পড়াশোনার অবস্থা শোচনীয়। এখন যতই সে তড়পাক, ভালো ফল তার হবে না। ভালো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়েও সে ঢুকতে পারবে না। হালকা জুহি চাওলার মতো দেখতে সেই মেয়ে চোখের সামনে থেকে হঠাৎ হারিয়ে কই গেল কে জানে। আর পেছন ফিরে রায়হান দেখল সেই বাহবামুখর বন্ধুকুলের পিনিক আড্ডাটাও আজ আর নেই, আজ আর নেই।

আছে অজগরের শিকার ধরা চাপের মতো কঠিন বাস্তব। সেই বাস্তবের চাপে নাম না জানা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো রকমে নাম কা ওয়াস্তে পড়াশোনা শেষ করে এখন সে নাম না বলার মতো একটা বায়িং হাউসে চাকরি করে। ম্লান আলোর একটা বদ্ধ ঘরে তার দিন কাটে ছোট্ট একটা কাচঘেরা খোপে। সেখানে ল্যাপটপের সামনে বসে কিছু ফাইল সে এদিক থেকে ওদিক সরায়, ই-মেইল এলে করে রিপ্লাই অল—এক কথায় এই তার কাজ। খুব বেশি হলে অন্যের পাঠানো এক্সেলে দুটা নতুন ফর্মুলা বসিয়ে নতুন নামে সেভ করে। মারাত্মক বোরিং কাজ।

কিন্তু বোরিং হলেও এই কাজ তার করতে হয়। নয়তো গ্যাস-কারেন্টের খরচসহ শনির আখড়ার এই দুই রুমের বাসাভাড়াও সে দিতে পারত না। সেই সঙ্গে সপ্তাহের বাজার, রাইডারের খরচ, রাকিবের স্কুলের বেতন—এসব তো আছেই। তবে শুধু একার চাকরিতে সংসার সে পুরোটা টানতে পারত, তা কিন্তু নয়; তানিয়া একটা ছোটখাটো ট্র্যাভেল এজেন্সিতে কাজ করে বলে দুজনে মিলে কোনো রকমে চলে যাচ্ছে। ‘চলে যাচ্ছে’ মানে এখনো আটকে যায়নি; তবে একটু এদিক-ওদিক হলেই আটকে যাবে।

আটকে যেন না যায়, সে ব্যাপারে রায়হান যতটুকু সম্ভব যত্নবান। আগের সেই চোয়াল শক্ত দুর্ধর্ষ বেপরোয়া ভাব তার মধ্যে আর অবশিষ্ট নেই। ঘনঘন সিগারেট ফোঁকাও বাদ দিয়েছে। এখন শান্তভাবে দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা-ভাবনা করার চেষ্টা করে সে। সঞ্চয়পত্র কেনার জন্য টাকা জমায়, অন্যদিকে আইএলটিএস দেবে কি না, সে ব্যাপারেও নেট ঘাঁটে। সাহস করে ব্যাংক লোন নিয়ে কয়েকজন সমমনা সহকর্মী মিলে বসুন্ধরায় তিন কাঠার একটা প্লট কিনবে কি না, এ ব্যাপারে এআই-এর সঙ্গে তুমুল তর্ক করে। এআই ইনিয়ে-বিনিয়ে নানা রঙঢঙের কথা বলে, কিন্তু বাস্তব সমাধান দিতে পারে না। বিরাট নিরাশা।

তবে অবস্থা যে একেবারেই ধ্বংসপ্রাপ্ত, তাও নয়। কিছুটা আশার আলো দেখতে পায়, এ রকম একটা জায়গা রায়হানের আছে। আশাতীতভাবে এই আলোর সন্ধান সে পেয়েছে রাকিবের পড়াশোনা দেখতে গিয়ে। সারা জীবন নিজের পড়াশোনায় অবহেলা করলেও ছেলের পড়াশোনার ব্যাপারে এখন সে মহা যত্নবান। সে কারণে সারা দিনের ব্যস্ততায় শরীর যতই ভেঙে আসুক, বাসায় ফিরে ছেলের ক্লাসওয়ার্ক-হোমওয়ার্কের পাতা উল্টে দেখে রায়হান প্রায় প্রতিদিন। দেখে আর অবাক হয়।

অবাক হওয়ার কারণ আছে। তানিয়া যে একটা নিরেট বেকুব, এটা রায়হান জানে শুরু থেকেই। শুধু ঢেউ খেলানো চুল আর লম্বা চেহারা দেখেই রায়হানের মতো বনেদি আদু ভাইকে যে বিয়ে করে, সেই মেয়ে আর যা-ই হোক চালাকের শিরোমণি নয়। সেই বোকা তানিয়া আর মাকালফল রায়হানের ছেলে চালাক-চতুর বা ব্রিলিয়ান্ট হওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। কিন্তু প্রকৃতি মাঝে মাঝে যুক্তি মেনে চলে না; বরং প্রকৃতির পথচলায় নতুন কোনো অদ্ভুত যুক্তির জন্ম হয়।

রাকিবের ব্যাপারটা অনেকটা সে রকম। মুক্তার মতো হাতের লেখা, হঠাৎ করে দেখলে মনে হয় ছাপা কাগজ। নির্ভুল বানানে লেখা সারিসারি সঠিক উত্তর। এত ছোট বাচ্চা এত পরিণত বাক্য কীভাবে লেখে মাথা চুলকে কূলকিনারা পায় না রায়হান। নিজের অন্ধকার অতীতের তুলনায় ছেলের আলোকিত রিপোর্ট কার্ডের চরম পার্থক্য তাকে পুলকিত করে। নাম্বারের ঘরে একশ আর একশ, আবার একশ। চোখে নেশা ধরে যায় রায়হানের। সে গাঢ় স্বরে জানতে চায়—‘বাবা, এই জন্মদিনে তুমি কী নেবা?’

রাকিব লজ্জার হাসি হাসে। তার খুবই শখ সে একটা সাইকেল কিনবে। ফ্রেমের রঙ হবে লাল, সেইসঙ্গে টায়ার কিছুটা মোটা, যেন বাইকের মতো একটা আবহ আসে। গিয়ারওয়ালা হলে ভালো হয়, তবে গিয়ার ছাড়া হলেও চলবে। নিজের এই শখের কথা সে মাকে কয়েকবার বলেছে। এখন মুখ ফুটে বাবাকেও বলে। পরদিনই দুজনে ঝক্কর বাসে করে বংশাল যায় সাইকেল কেনার জন্য। যথেষ্ট বুদ্ধি থাকলেও রাকিবের জানার কথা নয়, তার বাবা গত সাত মাস টাকা জমিয়ে তারপর আজ সাইকেল কিনতে যাচ্ছে। কিছু কথা না জানাই ভালো।

তবে নতুন কিছু জানার ব্যাপারে রাকিবের কৌতূহল অসীম। সাইকেল নামের এই অদ্ভুত জিনিসটা তাকে নাড়া দেয়। দুই চাকার ওপর বসানো দোদুল্যমান একটা যন্ত্র, নিজে থেকে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। সেটা চালানোর চেষ্টা করলেও একই ব্যাপার—সোজা করে রাখা যায় না, হেলে পড়ে; কিন্তু কিছুদিন চেষ্টা করলে দিব্যি চালানো যায়। গতি দিয়ে অস্থির একটা জিনিসকে স্থির করা যায়—খুবই অদ্ভুত ব্যাপার। বাসার পিছে সরু গলিতে হ্যান্ডেল ধরিয়ে চালানো শেখানোর সময় বাবাও ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করতে পারল না—কেন এমন হয়। যে জিনিস স্থির অবস্থায়তেই ভারসাম্য রাখতে পারে না, সে কীভাবে চলন্ত অবস্থায় সোজা থাকে? গভীর চিন্তার বিষয়।

বিষয়টা বুঝতে মায়ের মোবাইলে গিয়ে ইউটিউবে ঢোকে রাকিব, বেশ কিছু ভিডিও দেখে মোটামুটি একটা ধারণা পায়। নতুন কিছু শিখতে তার খুবই ভালো লাগে, তবে জ্ঞানের আসল মজা বিতরণে। সে কারণে রাতে খাবার টেবিলে বসে বাবাকে নানাভাবে সে বোঝানোর চেষ্টা করে সারা দিন সে কী কী শিখল। ভরকেন্দ্র কাকে বলে, ভরকেন্দ্র চাকার লাইনে আনতে পারলে কেন সাইকেল হেলে পড়ে না, গতি দিয়ে কীভাবে অল্প এদিক-ওদিক করেই সাইকেলের ভরকেন্দ্র চাকার লাইনে আনা যায় প্রভৃতি মহাজ্ঞানের নানারকম বয়ান। বাবা খালি হাসে, মাঝে মাঝে অবাক হওয়ার ভান করে। কিছু না বুঝেই বলে, ‘বুঝতে পেরেছি; কিন্তু তুমি একা সাইকেল নিয়ে রাস্তায় নামবা না, ঠিক আছে?’ রাকিব হ্যাঁ-বোধক মাথা নাড়ে।

বায়িং হাউসের বদ্ধ ঘরের ম্লান আলোয় ছোট্ট একটা কাচঘেরা খোপে বসে ল্যাপটপের পর্দায় এদিকের ফাইল ওদিকে পাঠায় রায়হান; আর মোবাইলের পর্দায় ঘাঁটে ফেসবুকের জঞ্জাল। আচ্ছা, সেই জুহি চাওলার প্রোফাইলটা এখন পাওয়া যাবে কি; পাওয়া গেলেও সেখানে নক করা কি উচিত হবে—এমন একটা এলোমেলো ভাবনার মাঝে হঠাৎ ট্রাফিক-বিষয়ক একটা গ্রুপের পোস্টে চোখ আটকে যায় রায়হানের। গলার কাছে আটকে যায় শক্ত কিছু। শনির আখড়া বাসস্ট্যান্ড-সংলগ্ন রাস্তায় দ্রুতগতির পিকআপের নিচে সাইকেলসহ ১৩ বছরের শিশু। সাইকেলের রঙ লাল। বাচ্চাটার শরীর কাপড় দিয়ে ঢাকা, একটা পা বের হয়ে আছে।

সব বাচ্চাদের পা দেখতে মোটামুটি একই রকম হয়। কিন্তু তাই বলে রায়হান যা ভাবছে তা নিশ্চয়ই সত্য নয়। অবশ্য রায়হান ভাবছে, এই কথাটা ঠিক নয়। ভাবনাটা রায়হানকে ভাবাচ্ছে। কারণ কোনো একটা উপলক্ষে আজকে রাকিবের স্কুল ছুটি। হাতের ঠান্ডা তালুতে মোবাইল নিয়ে ছবিগুলো নানাভাবে জুম করে দেখল রায়হান। বোঝা যাচ্ছে না ঠিকমতো। স্পষ্ট ছবি কেউ দেয়নি—সবই ব্লার করা।

ছবি দেখা বাদ দিয়ে তানিয়াকে কল করল রায়হান। ফোন বাজছে, বেজে বেজে থেমে গেল। কপাল থেকে একটা ঘামের ফোঁটা টপ করে পড়ল মোবাইলের ওপর। সেটা মুছে আস্তে করে চেয়ার থেকে উঠে পড়ল রায়হান। তানিয়া ফোন ধরেনি, মানে এখন ধরবেও না। সাইলেন্ট করে রেখেছে। দিনের বেলায়ও ফোন সাইলেন্ট করে রাখার এই বিকট বদভ্যাস তানিয়ার আছে। অনেক বলার পরেও মনে হয় না শোধরাবে। এখন শোধরানোর চেষ্টা করে সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয় না। হাতে কোনো সময়ই নেই। এখনই বাসায় যেতে হবে।

নাকি আগে বাড়িওয়ালাকে ফোন করে জেনে নেবে বাসার কী অবস্থা? অফিসের কামরা থেকে বেরিয়ে করিডোরে দাঁড়িয়ে বাড়িওয়ালা মহসিন সাহেবকে ফোন করল রায়হান। মহসিন সাহেব ফ্যামিলি নিয়ে সাজেক ঘুরতে গেছেন। ফোনে মহা হট্টগোলের আওয়াজ আসছে, ভিড়ের মধ্যে তিনি রায়হানের কথা ঠিকমতো বুঝতে পারছেন না। মহা সমস্যা। কাউকেই ডেকে পাওয়া যাচ্ছে না। কাকে ডাকলে পাশে পাওয়া যাবে এই ভয়াবহ দিনে?

নিচের ঠোঁট কামড়ে কিছু একটা ভাবল রায়হান। তারপর গেল অফিসের করিডরের সঙ্গে লাগোয়া প্রেয়ার রুমে। শেষ কবে নামাজ পড়েছে মনে পড়ছে না। অজুও নেই। কিন্তু রায়হানের মাথা কাজ করছে না। সে ওই অবস্থাতেই একটা সিজদা করল। আল্লাহ, আমি একটা জঘন্য আবর্জনা, কিন্তু আমার ছেলেটা অতি ভদ্র, ভালো, নিষ্পাপ। আমার ছেলের যেন কিছু না হয়।

অফিস থেকে রাইড শেয়ার মোটরবাইকে বাসায় যেতে সময় লাগে আধ ঘণ্টার মতো। এই আধ ঘণ্টা সারা জীবনের মতো বড় মনে হচ্ছে। এত বড় সময় কীভাবে কাটবে রায়হানের জানা নেই; জানা নেই গন্তব্যে পৌঁছার পরে কী দেখবে; জানা নেই ডাকে সাড়া পাবে কি না। কিছুই জানা নেই; কারণ সময়ের আগে জানার কোনো উপায় নেই। তাহলে এই কঠিন সময়টা সে পার করবে কীভাবে?

ঘিঞ্জি ভিড়ের ফাঁকফোকরে বাউলি কেটে বাইক চালাচ্ছে রাইডার। পিছে স্থানুর মতো বসে রায়হান একাগ্রচিত্তে চেয়ে আছে সামনে। সে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে সে ডাকে সাড়া পাবে। জীবনের আকাঙ্ক্ষা আর আশঙ্কার দুই চাকার মাঝের ভরকেন্দ্র এই একটাই। সেটা হলো বিশ্বাস। সেই বিশ্বাসে ভর করে রায়হান ছুটে চলেছে। এছাড়া এখন তার হাতে করার মতো আর কিছুই নেই।

এছাড়া কখনোই কি করার মতো কিছু মানুষের হাতে আছে? রায়হানের জানা নেই।

মহাজীবনের শেষে ফররুখ

১০০% সিমেট্রিক্যাল

কেউ থাকতে বলল না

আসা, অতঃপর যাওয়া

জীবনের বৃত্তের বাইরে

আরো একটি রাষ্ট্রীয় খুন

জুলাই গীতিকা

দুই টুকরা চাঁদ

বনলতা লেন

পুরোনো শকুন