দেশের সব সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড এবং তহশিলদারকে সার্বক্ষণিক নজরদারির আওতায় আনতে যাচ্ছে ভূমি মন্ত্রণালয়। এসব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অফিসে নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে এবং সেবা নিতে আসা নাগরিকদের ভোগান্তি কমাতে যুগান্তকারী এ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে মন্ত্রণালয়। এ লক্ষ্যে চালু করা হচ্ছে জিপিএস ট্র্যাকিং ও জিও ফেন্সিং প্রযুক্তিনির্ভর অ্যাপ ‘দৃষ্টি’। ভূমি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্র আমার দেশকে এ তথ্য নিশ্চিত করে।
সূত্র জানায়, ‘দৃষ্টি’Ñজিও ফেন্সিং অ্যাটেনডেন্স সিস্টেম অ্যাপ্লিকেশনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হতে পারে আজ বৃহস্পতিবার। এ উপলক্ষে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে বেলা ১১টার দিকে একটি সভা আহ্বান করা হয়েছে। সভায় ভূমিমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সিনিয়র সচিবসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, প্রাথমিকভাবে পাইলট প্রকল্প হিসেবে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও বগুড়াÑএ ছয় জেলায় অ্যাপটির কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। এসব জেলার ৬১০টি কার্যালয়ের মোট ৯১৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে প্রাথমিকভাবে এর আওতায় আনা হয়েছে। পাইলট প্রকল্পের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে সারা দেশে এ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, ‘দৃষ্টি’ অ্যাপের মাধ্যমে ভূমি কর্মকর্তাদের অফিসে উপস্থিতি ও অবস্থান রিয়েল টাইমে পর্যবেক্ষণ করা যাবে। জিপিএস ট্র্যাকিং ও জিও ফেন্সিং প্রযুক্তির মাধ্যমে নির্ধারিত কর্মস্থলের সীমানায় কোনো কর্মকর্তা প্রবেশ করলে কেন্দ্রীয় ড্যাশবোর্ডে তার উপস্থিতির সংকেত পাওয়া যাবে।
অফিস চলাকালে নির্ধারিত এলাকার বাইরে যেতে হলে অ্যাপেই বের হওয়ার কারণ উল্লেখ করতে হবে। অনুমতি ছাড়া অফিস ত্যাগ এবং নির্ধারিত সময়ের পর অফিসে প্রবেশের বিষয়েও নজরদারি থাকবে।
মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সিনিয়র সচিবসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের ভূমি কর্মকর্তাদের অবস্থান ও উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন বলে জানা গেছে।
শুধু উপস্থিতি নয়, ভূমিসেবা প্রদানের সময়সীমাও এ ব্যবস্থার আওতায় আসবে। নামজারিসহ (মিউটেশন) ভূমিসংক্রান্ত নির্ধারিত কার্যক্রম নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা হবে। কোনো কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ না হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে বিলম্বের কারণ জানাতে হবে।
এছাড়া কোনো নামজারি করা সম্ভব না হলে বা তা বাতিল করতে হলে এর সুনির্দিষ্ট কারণ নথিতে লিপিবদ্ধ রাখতে হবে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন অনুবিভাগ) এমদাদুল হক চৌধুরী আমার দেশকে বলেন, ভূমি অফিসগুলোকে জিপিএসের আওতায় আনা হচ্ছে। কোনো কর্মকর্তা নির্ধারিত কর্মস্থলের সীমানায় প্রবেশ করলেই অ্যাপের মাধ্যমে তার অবস্থানের সংকেত পাওয়া যাবে।
তিনি বলেন, অফিস সময়ে নির্ধারিত এলাকার বাইরে যেতে হলে কারণ উল্লেখ করে বের হতে হবে। বিনা অনুমতিতে অফিস ত্যাগ করা যাবে না এবং বিলম্বে অফিসে প্রবেশের সুযোগও থাকবে না।
ভূমিসেবা নিতে এসে সাধারণ মানুষকে দীর্ঘদিন ধরে যেসব জটিলতা ও ভোগান্তির মুখোমুখি হতে হয়, তা নিরসনের লক্ষ্যেই এ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন আমার দেশকে বলেন, ভূমি প্রশাসনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অভিযোগগুলোর একটি ছিল কর্মকর্তারা যথাসময়ে অফিসে উপস্থিত থাকেন না কিংবা অফিসে পাওয়া যায় না। ডিজিটাল এ ব্যবস্থার মাধ্যমে কর্মকর্তাদের অফিসে উপস্থিতি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
তিনি জানান, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ‘দৃষ্টি’ অ্যাপের বিস্তারিত তথ্য ও কার্যকারিতা গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরা হবে।
মাঠপর্যায়ের ভূমি অফিসগুলোতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনিয়মিত উপস্থিতি, দেরিতে অফিসে আসা এবং নির্ধারিত সময়ের আগে অফিস ত্যাগের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এর ফলে নামজারি, খতিয়ান সংশোধন ও ভূমি উন্নয়ন করসহ বিভিন্ন সেবা নিতে গিয়ে নাগরিকদের দিনের পর দিন ভূমি অফিসে ঘুরতে হয়।
বিশেষ করে কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতির কারণে নামজারির মতো জরুরি ফাইল আটকে থাকার অভিযোগ রয়েছে। এতে সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তির পাশাপাশি মধ্যস্বত্বভোগী বা দালাল চক্রের সুযোগ তৈরি হওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের নতুন এ ডিজিটাল নজরদারি ব্যবস্থা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে মাঠপর্যায়ের ভূমি অফিসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি, কাজের সময়সীমা এবং সেবা প্রদানের প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।