পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটিতে গ্রামে গিয়ে বিদ্যুৎ-বিভ্রাটের কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়েন অনেক মানুষ। কোনো কোনো এলাকা টানা ৮ থেকে ১০ ঘণ্টাও বিদ্যুৎহীন ছিল বলে জানিয়েছেন গ্রাহকেরা। গ্রাম পর্যায়ে ভোগান্তি ছিল সবচেয়ে বেশি। তবে রাজধানীসহ মহানগরগুলোতে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক ছিল। অন্যদিকে কালবৈশাখীর কারণে বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে পড়া এবং তার ও ট্রান্সমিটারের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় এই বিদ্যুৎ-বিভ্রাট বলে দাবি করেছেন বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা।
এদিকে, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সরকার নতুন নির্দেশনা জারি করেছে। এতে বলা হয়েছে, সব শপিংমল, মার্কেট ও দোকানপাট সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বন্ধ রাখতে হবে। পাশাপাশি, সব ধরনের বিলবোর্ডের আলোকসজ্জাও এই সময়ের মধ্যে বন্ধ করতে হবে। মেলা, বাণিজ্যমেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে শেষ করতে হবে।
ঈদের সময় বিদ্যুৎ-বিভ্রাটে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হন ভোলা, চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী, রংপুর, পটুয়াখালী, মুন্সীগঞ্জ, সাতক্ষীরা, যশোরসহ দেশের কয়েকটি জেলার গ্রাহকেরা। এসব জেলার বেশ কয়েকজন গ্রাহক জানিয়েছেন, ঈদের ছুটি শুরুর পর প্রথম দুই দিন বিদ্যুৎ পরিস্থিতি মোটামুটি ভালো ছিল। ঈদের আগের দিন ওই সব এলাকায় ব্যাপক বিদ্যুৎ-বিভ্রাট হয়। কোনো কোনো এলাকায় টানা ৮ থেকে ১০ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ ছিল না। কয়েকটি এলাকায় বিদ্যুতের দাবিতে স্থানীয় বিদ্যুৎ অফিসের সামনে বিক্ষোভ করেছেন স্থানীয় জনতা।
চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলার রাজারগাঁও গ্রামের সিদ্দিকুর রহমান জানিয়েছেন, ঈদের আগেরদিন তাদের এলাকায় টানা ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গ্রাহকরা জানিয়েছেন, তাদের এলাকায়ও ঈদের আগের দিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না।
গ্রাহকদের এসব অভিযোগের বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঈদের ছুটিতে অফিস আদালতের পাশাপাশি কলকারখানাও বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিদ্যুতের চাহিদা কম ছিল। চাহিদা অনুযায়ী বিতরণকারী কোম্পানিগুলোও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে পেরেছে। ছুটির মধ্যে গত ২৭ মে দেশের বিভিন্ন জায়গায় কালবৈশাখী হয়। এতে বিদ্যুতের খুঁটি পড়ে যাওয়ার পাশাপাশি কোথাও কোথাও সঞ্চালন লাইন ছিঁড়ে যায়। সঞ্চালন লাইনে ঝুঁকি থাকায় সাড়ে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের বেশি সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি ওই দিন।
ঈদের সময় বিদ্যুৎ বিভ্রাটের আগাম বার্তা বিদ্যুৎ বিভাগের কাছে ছিল উল্লেখ করে এ বিভাগের একজন কর্মকর্তা আমার দেশকে বলেন, ঈদের সময় ব্যাপক ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস ছিল। এতে বিদ্যুতের খুঁটি ও তারসহ সঞ্চালন লাইনের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে বলে আশঙ্কা ছিল। এ কারণেই বিদ্যুৎ বিভাগ কিছু সতর্কতামূলক ব্যবস্থাও নিয়েছিল। ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় সারা দেশে রক্ষণাবেক্ষণ টিমও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখার বিষয়টি মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
আশঙ্কার চেয়ে কোনো কোনো এলাকায় ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত বেশি ছিল বলেও জানিয়েছেন বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা। অনেক স্থানে বড় বড় গাছ উপড়ে বিদ্যুতের খুঁটির উপর পড়েছে বলেও তথ্য রয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কাছে। প্রতিষ্ঠানটির একজন কর্মকর্তা জানান, সারা দেশে ঘূর্ণিঝড়ে কতটি খুঁটি ভেঙেছে ও কী পরিমাণ সঞ্চালন লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা নিরূপণের কাজ চলছে। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে বলেও জানান ওই কর্মকর্তা।
এ বিষয়ে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম আমার দেশকে বলেন, ঈদের সময় এমনিতেই বিদ্যুতের চাহিদা থাকে সর্বনিম্ন। চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহের সব প্রস্তুতি ও সক্ষমতা সরকারের ছিল। ঘূর্ণিঝড়ের কারণে সাড়ে পাঁচ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি। অনেক স্থানে বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে পড়েছে। দুদিনের মাথায় সঞ্চালন লাইন প্রায় পুরোপুরি মেরামত হয়ে গেছে। এখন আমরা ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারছি।
সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত খোলা থাকবে মার্কেট-শপিংমল
দেশের সব শপিংমল, মার্কেট ও দোকান আবারও সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে সব ধরনের বিলবোর্ডের আলোকসজ্জা, মেলা, বাণিজ্যমেলা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও এ সময়ের মধ্যে শেষ করতে হবে।
গতকাল সোমবার রাতে বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদের কাছে পাঠানো এক সংক্রান্ত চিঠিতে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে শপিংমল, মার্কেট ও দোকান সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত খোলা রাখার সিদ্ধান্ত কার্যকর ছিল। তবে পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে ব্যবসা-বাণিজ্যের সুবিধার্থে সাময়িকভাবে সেই সময়সীমা রাত ১০টা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল। ঈদ উপলক্ষে দেওয়া বিশেষ সুবিধার মেয়াদ শেষ হওয়ায় ১ জুন থেকে আবারও আগের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে। ফলে রাত ১০টার পরিবর্তে সব শপিংমল, মার্কেট ও দোকানকে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে কার্যক্রম শেষ করতে হবে।
এ চিঠিতে আরো বলা হয়, বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয় নিশ্চিত করতে সব ধরনের বিলবোর্ডের বাতি সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বন্ধ করতে হবে। একই সময়সীমা দেশের বিভিন্ন স্থানে আয়োজিত মেলা, বাণিজ্যমেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।