সরকারি সেবা নিতে এসে সাধারণ মানুষ যেন ঘুস, হয়রানি ও অনিয়মের শিকার না হন—এ বিষয়ে সচিবদের সতর্ক থাকার নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ডিজিটাল হাজিরা চালুর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফেরানোর পাশাপাশি দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি এবং জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের প্রায় সাত মাস পর গতকাল মঙ্গলবার বিকালে সচিবালয়ে প্রথমবারের মতো সচিব সভা অনুষ্ঠিত হয়। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অধিকাংশ সচিব অংশ নেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সভায় সরকারের অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচির বাস্তবায়ন পর্যালোচনার পাশাপাশি প্রশাসনের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সরকারি দপ্তরে সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষ যাতে অযথা হয়রানির শিকার না হন এবং কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী যাতে ঘুস বা অনৈতিক সুবিধা দাবি করতে না পারেন, সে বিষয়ে সচিবদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
সভায় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয় এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়ও গুরুত্ব পায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সরকারের এক সচিব আমার দেশকে বলেন, ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকার আগেভাগেই সতর্ক রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব যাতে দেশের অর্থনীতি ও বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে না পারে, সে জন্য আমদানিনির্ভর জ্বালানির পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ওই সচিব বলেন, দেশে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার কীভাবে আরো বাড়ানো যায়, তা নিয়ে সভায় বিশেষ আলোচনা হয়েছে। সরকারি ভবন ও বিভিন্ন স্থাপনায় সৌর প্যানেল স্থাপন, বেসরকারি খাতকে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে উৎসাহিত করা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে সৌরশক্তির অংশ বাড়ানোর বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
প্রশাসনের শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ডিজিটাল হাজিরা ব্যবস্থার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর মাধ্যমে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মস্থলে উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ সহজ হবে এবং দায়িত্ব পালনে শৃঙ্খলা বাড়বে। একইসঙ্গে সরকারি সেবার মানোন্নয়ন এবং জনগণের ভোগান্তি কমানোর ক্ষেত্রেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সচিব সভায় ফ্যামিলি কার্ড ও খাল খনন কর্মসূচির বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিতের বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে। প্রকৃত উপকারভোগী নির্বাচন, সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার এবং প্রকল্পের কাজের মান নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ে নজরদারি বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে কোনো ধরনের অনিয়ম, পক্ষপাত বা দুর্নীতির মাধ্যমে যাতে প্রকৃত উপকারভোগীরা বঞ্চিত না হন, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে সতর্ক থাকার বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়।
খাল খনন কর্মসূচির ক্ষেত্রেও অর্থ ব্যয়ের যথাযথ ব্যবহার এবং কাজের মান নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সরকারি অর্থ ব্যয় করে প্রকল্প বাস্তবায়নের পর এর সুফল জনগণ পাচ্ছেন কি না, তা মাঠপর্যায়ে নজরদারির আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে সচিব সভায়।
এছাড়া সরকারি সম্পত্তি রক্ষা ও বেদখল সম্পত্তি উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনার বিষয়টিও সভায় উঠে আসে। সরকারি জমি, স্থাপনা বা অন্যান্য সম্পদ যাতে অবৈধভাবে দখল বা ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে সতর্ক থাকার কথা বলা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নতুন সরকারের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে সমন্বয় বাড়ানো এবং অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচি দ্রুত বাস্তবায়নে এ সচিব সভাকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। জনগণের সেবা সহজ করা, দুর্নীতি ও হয়রানি কমানো, প্রশাসনে জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় প্রশাসনকে প্রস্তুত রাখাই ছিল সভার অন্যতম মূল লক্ষ্য।