চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতনের প্রায় দেড় বছর পর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয় বিএনপি। প্রায় দুই দশক পর আবার ক্ষমতায় আসে দলটি। এরই মধ্যে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেওয়ার এক দিন পর মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে সরকারের তিনটি অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়। এগুলো হলো—দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা।
এরপর কেটে গেছে ১৮০ দিন। ছয় মাস পর এখন প্রশ্ন উঠছে, সরকারের নির্ধারিত ওই অগ্রাধিকারগুলো কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে।
কারণ, গত ছয় মাসে দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়েই মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
তবে সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো কয়েকটি উদ্যোগ ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
রাজনৈতিক সংস্কারের ক্ষেত্রেও সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের রায়কে গুরুত্ব না দেওয়ায় নতুন রাজনৈতিক সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা।
অন্যদিকে সরকারের দাবি, ছয় মাসের জন্য নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার প্রায় সবই অর্জিত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, নির্বাচনের আগে বিএনপি যে অঙ্গীকার করেছিল, সেগুলো বাস্তবায়িত হচ্ছে। গত ছয় মাসে সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার অধিকাংশই পূরণ হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
সরকার গঠনের পর সংসদ সদস্যদের ট্যাক্সমুক্ত গাড়ি না নেওয়া এবং রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমাতে প্রধানমন্ত্রীর নেওয়া কয়েকটি উদ্যোগও সাধারণ মানুষের প্রশংসা পেয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা বদলেছে
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা ছিল। বিভিন্ন অপরাধ এবং মব ভায়োলেন্স নিয়ে তখন থেকেই উদ্বেগ ছিল। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ছয় মাসেও পরিস্থিতির বড় ধরনের উন্নতি হয়নি বলে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে।
বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) নিয়মিত দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে। সংস্থাটির ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসের প্রতিবেদনে গণপিটুনি, রাজনৈতিক সংঘাত, সাংবাদিকদের ওপর হামলা এবং কারাগারে মৃত্যুর একাধিক ঘটনা উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ছয় মাসে ২২০ জন নারী ও শিশু নির্যাতন বা সহিংসতায় মারা গেছেন। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে নয়টি। কারাগারে বন্দি বা বিচারাধীন অবস্থায় মারা গেছেন ৫৫ জন। ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৩৬৫টি।
একই সময়ে মব সহিংসতায় মারা গেছেন ১২০ জন।
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটিও (এইচআরএসএস)। তাদের প্রতিবেদনে জানুয়ারি মাসের তথ্যও রয়েছে। ওই সময় ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় ছিল।
এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের প্রথম ছয় মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ছিল ৫২৯টি। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৩০টিতে।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ১ হাজার ৬২১ জন নারী সহিংসতার শিকার হয়েছেন। গত বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৪২। অর্থাৎ এক বছরে এ ধরনের ঘটনা ৫৬ শতাংশ বেড়েছে।
এ ছাড়া আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ক্ষমতাসীন ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে কয়েক দফা সংঘর্ষ হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে বিরোধী দল এনসিপি ও জামায়াতের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে।
অপরাধ বিশ্লেষকেরা বলছেন, নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসার পরও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, সরকারের মধ্যে শুরুতে যে উদ্বেগ ছিল, তা ধীরে ধীরে কমে আসেনি। গত ছয় মাসেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রত্যাশিত জায়গায় পৌঁছায়নি।
তার মতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সরকারের বিশেষ পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে। ফলে অপরাধ প্রবণতা কমছে না। খুন, চাঁদাবাজি, নারীর প্রতি সহিংসতা ও ধর্ষণের মতো ঘটনাও বাড়ছে।
অর্থনৈতিক সংস্কার কত দূর
বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের অর্থনীতি ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল। উচ্চ সরকারি ঋণ, দুর্বল ব্যাংকিং খাত এবং বিনিয়োগ সংকট শুরু থেকেই সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকেই দেশের অর্থনীতি নানা সমস্যার মধ্য দিয়ে গেছে। দীর্ঘ সময় ধরে মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কে ছিল। বিনিয়োগে স্থবিরতা, কর্মসংস্থান সৃষ্টির ধীরগতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং জনসেবার অবনতিতে মানুষের উদ্বেগ বাড়ে।
অন্তর্বর্তী সরকারও অর্থনৈতিক খাতের উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছিল।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক অর্থনীতিবিদ ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে উত্তরণের জন্য ছয় মাস খুব বেশি সময় নয়। তবে একেবারে কম সময়ও নয়।
তিনি বলেন, সরকার প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের দিকে এগিয়েছে। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হয়েছে। আগের একীভূত করা পাঁচটি ব্যাংক কার্যকরের চেষ্টাও ইতিবাচক দিক।
তবে দ্রব্যমূল্য পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি।
সামাজিক নিরাপত্তা খাতে নেওয়া কিছু পদক্ষেপ সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নিয়োগ নিয়ে সমালোচনা হয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদেরা।
ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমকে সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন তারা।
তবে বিনিয়োগ ও নতুন কর্মসংস্থান তৈরির ক্ষেত্রে এখনো ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, অনেক শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও ঘাটতি ছিল। বন্ধ কারখানা চালু করতে সরকার একটি তহবিল তৈরি করেছে। অপচয় না হলে এর ফল পাওয়া যাবে। কারখানাগুলো চালু হলে কর্মসংস্থানও তৈরি হবে।
গত চার বছর ধরে দেশে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। এর ফলে দ্রব্যমূল্যও বেড়েছে। নিম্ন ও সাধারণ আয়ের মানুষের মধ্যে এ নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে।
ফাহমিদা খাতুনের মতে, মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয়ের চাপ এখনো রয়েছে। আর্থিক নীতি ও বাজার ব্যবস্থাপনার সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া মূল্যস্ফীতি কমানো কঠিন।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিয়ে ভোগান্তি
সরকারের ছয় মাসে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির কারণ হওয়া বিষয়গুলোর একটি ছিল বিদ্যুৎ খাত। লোডশেডিং এবং অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল নিয়ে সরকার সমালোচনার মুখে পড়ে।
গত কয়েক মাসে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং তীব্র হয়েছে। মধ্যরাতের পর দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে গৃহস্থালির কাজের পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এর মধ্যে চলতি মাসের শুরুতে বিভিন্ন এলাকায় অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগ ওঠে। বিশেষ করে জুন মাসের ব্যবহারের বিপরীতে পাওয়া বিল নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অনেক গ্রাহক। তাদের অভিযোগ, স্বাভাবিকের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি বিল এসেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বলেন, বিদ্যুতের দাম কী প্রক্রিয়ায় বাড়ানো হয়েছে, তা বোঝা যায়নি। অনেক গ্রাহক সকালে উঠে দেখেছেন, তাদের বিল দ্বিগুণ হয়ে গেছে। ছয় মাসে অন্তত এই খাতকে স্থিতিশীল রাখা যেত বলে মনে করেন তিনি।
তবে সরকারের জন্য জ্বালানি খাতের সংকটও বড় সমস্যা হয়ে দেখা দেয়। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ইরান, আমেরিকা ও ইসরাইলের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট তীব্র হয়।
এরপর গত মাসের শেষ দিকে হঠাৎ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস সংকট তৈরি হয়। গ্যাস সরবরাহের ঘাটতিতে অনেক এলাকার পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে ওঠে।
এ পরিস্থিতিতে আগস্টের শুরুতে প্রথমবারের মতো সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে কর্মসূচি পালন করে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। বিরোধী দল সচিবালয় ঘেরাওয়ের মতো কর্মসূচিও পালন করে।
অর্থনীতিবিদ ফাহমিদা খাতুন বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ ছাড়া জীবন ও অর্থনীতি অচল। পরবর্তী ধাপে সরকারকে এ দুটি খাতে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে হবে। তা না হলে জীবন ও অর্থনীতির ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়বে।
বিএনপিও জ্বালানি সংকটের কথা স্বীকার করছে। তবে দলটি এটিকে সরকারের ত্রুটি হিসেবে দেখছে না।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, আন্তর্জাতিক সংকট এবং একটি টার্মিনাল নষ্ট হওয়ার কারণে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। তবে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে যাবে এবং এ জন্য কাজ চলছে।
কূটনীতিতে অর্জন কতটা
অর্থনীতি, রাজনীতি ও সুশাসন নিয়ে সরকারের নানা ঘাটতি থাকলেও কূটনীতির ক্ষেত্রে বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন কয়েকজন বিশ্লেষক।
এর অন্যতম কারণ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের নির্বাচিত হওয়া। ২ জুন নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি সভাপতি নির্বাচিত হন।
সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ূন কবির বলেন, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়া বর্তমান সরকারের বড় কূটনৈতিক সাফল্য।
নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর ২১ থেকে ২৬ জুন মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেন তারেক রহমান। এটি ছিল তার প্রথম বিদেশ সফর। প্রথমে তিনি মালয়েশিয়া যান। পরে সেখান থেকে চীনে যান।
সফরকালে চীনের সঙ্গে ১৭টি সমঝোতা স্মারক সই হয়। দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানসহ বিভিন্ন বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
বিশ্লেষকেরা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু হওয়া, বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত অর্থনৈতিক করিডর এবং চীনের সঙ্গে পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষায় ‘টু প্লাস টু’ সমঝোতাকে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে দেখছেন।
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন কবিরের মতে, প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফরও সফলতা হিসেবে দেখা যায়। চীনের প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে অর্থনৈতিক করিডরের প্রস্তাব এবং তিস্তা প্রকল্পে চীনের ফিজিবিলিটি স্টাডিতে অংশ নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
তার মতে, চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এগুলো সাফল্য।
তবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এখনো জটিলতা রয়েছে।
হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দুই দেশের পক্ষ থেকেই সম্পর্ক উন্নয়নের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল।
এর মধ্যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়। সেপ্টেম্বরে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্যও আলাদা আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।
তবে রোববার বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ভারত সফরের জন্য তারা অনুকূল পরিবেশের অপেক্ষায় রয়েছে।
ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম এক ব্রিফিংয়ে বলেন, দুই দেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে যোগাযোগ রাখছে। তবে ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত হাসিনার প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলনের পর সফরের পরিবেশ নষ্ট হয়েছে। বাংলাদেশের অবস্থান এ বিষয়ে পরিষ্কার বলেও জানান তিনি।
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন কবির মনে করেন, আলোচনার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর সম্পন্ন হলে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে তা সহায়ক হতে পারে।
রাজনীতি, সংস্কার ও সুশাসনে প্রশ্ন
গণঅভ্যুত্থানের পর হাসিনা সরকারের সময় রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ, একতরফা নির্বাচন এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কারের দাবি জোরালো হয়।
সংস্কারের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার কয়েকটি কমিশন গঠন করে। তাদের সুপারিশ নিয়ে ঐকমত্য কমিশনও গঠন করা হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে এসব সুপারিশ নিয়ে জুলাই সনদ তৈরি করা হয়। পরে এর ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়।
তবে বিএনপি নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর ওই গণভোটের আদেশকে অবৈধ আখ্যা দিয়ে সংস্কার পরিষদের শপথ গ্রহণ না করায় বিরোধী দলের সঙ্গে শুরুতেই টানাপোড়েন তৈরি হয়।
এ ছাড়া স্বাধীন বিচার বিভাগ, গুম কমিশন গঠন ও দুর্নীতি দমনের মতো কয়েকটি বিষয়ে ছয় মাস পার হতে চললেও দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় আইন অনুমোদন, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ, মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশের কার্যকারিতা এবং পুলিশ সংস্কারে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতিও হতাশা তৈরি করেছে বলে তাদের মতো।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বলেন, বিএনপির কাছে মানুষের প্রত্যাশা ছিল দলটি পরিবর্তন ও সংস্কারে গুরুত্ব দেবে। কিন্তু নির্বাচনের পর ছয় মাসে সুশাসন প্রতিষ্ঠা বা রাজনৈতিক সংস্কারের ক্ষেত্রে মানুষ ইতিবাচক পরিবর্তন দেখতে পায়নি।
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ও সংস্কারের প্রশ্নে বিএনপির অবস্থান নিয়ে বিরোধী দলগুলোর মধ্যেও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে ছয় মাস না পেরোতেই মাঠের আন্দোলনে নামার ঘোষণা দিয়েছে জামায়াত-এনসিপি জোট।
ছয় মাসের হিসাব
বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে কিছু ক্ষেত্রে উদ্যোগ ও সাফল্য থাকলেও মানুষের প্রত্যাশার জায়গায় বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ব্যয় কমানোর কিছু উদ্যোগ এবং কূটনৈতিক ক্ষেত্রে কয়েকটি অর্জন সরকারের ইতিবাচক দিক হিসেবে সামনে এসেছে।
অন্যদিকে দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট এবং রাজনৈতিক সংস্কারের প্রশ্নে সরকারের সামনে এখনো বড় পরীক্ষা রয়েছে।
সরকারের দাবি, নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে চলছে এবং ছয় মাসের লক্ষ্যমাত্রার অধিকাংশই অর্জিত হয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মূল্যায়নে, সরকারের জন্য পরবর্তী সময়ের বড় চ্যালেঞ্জ হবে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের চাপ কমানো, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং সংস্কার ও সুশাসনের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করা।
এএম