গোলটেবিল বৈঠকে বিশিষ্ট নাগরিকদের মত
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরস্পরবিরোধী ভিত্তিহীন বয়ান, প্রোপাগান্ডা সমাজে অনৈক্য তৈরি করছে বলে মনে করেছেন বিশিষ্ট নাগরিকরা। জাতিকে বিভাজিত করার এ ধরনের প্রবণতা রোধে জাতীয় ঐক্যের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারা। পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপের করেছেন। একই সঙ্গে একটি স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠনের দাবি জানান দেশের বিশিষ্টজনরা।
সোমবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এসব বিষয় তুলে ধরেন। সিটিজেনস ফোরাম বাংলাদেশ (সিএফবি) আয়োজিত ‘ফলস ন্যারেটিভস, প্রোপাগান্ডা অ্যান্ড ডিসইউনিটি : থ্রেটস টু স্ট্যাবিলিটি, ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যান্ড ইউনিটি’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানে বক্তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমজুড়ে কীভাবে উদ্বেগজনক হার ও গতিতে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে পড়ছে- তা তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সিএফবির চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরী। তিনি বলেন, ফলস ন্যারেটিভ বন্ধ করতে আইন নয়, বরং ট্রু ন্যারেটিভ প্রয়োজন। আইন করে সব সমস্যার সমাধান হয় না। আইন করলে বলা হবে—আপনি ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছেন। ফলস ন্যারেটিভের কখনও জয় হবে না। এটি কখনো টিকে থাকতে পারবে না। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা কত ফলস ন্যারেটিভ তৈরি করেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারেনি।
গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশ গড়ার একটা সুন্দর সুযোগ এসেছে উল্লেখ করে ড. চৌধুরী বলেন, এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়তে হবে। তিনি বলেন, যদি আমরা জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়তে পারি এবং নৈতিক শিক্ষায় তাদের শিক্ষিত করতে পারি তাহলে একজন শিক্ষার্থী দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হবে। আর এমন সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠলে সে কোনোদিন প্রোপাগান্ডা করবে না।
বাংলাদেশের একটি স্থায়ী শিক্ষানীতি প্রণয়ন করতে হবে উল্লেখ করে এই শিক্ষাবিদ বলেন, এজন্য একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করতে হবে। একটা উন্নতমানের শিক্ষানীতি থাকলে শিক্ষাক্ষেত্রে আজকে যে বিশৃঙ্খলা, শিক্ষার যে ক্রমাবনতি- এগুলো রোধ করা সম্ভব হবে।
বৈঠকে জ্বালানি সংকট বিষয়ে আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘বর্তমান সংকট সরকারের তৈরি না, যুদ্ধের কারণে এই সংকট। এটার জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্প দায়ী, যুদ্ধে যারা অংশ নিয়েছে তারা দায়ী। তবে সরকারের উচিত জনগণকে সত্য জানানো। এটার বিষয়ে জনগণকে অবহিত করানো সরকারের দায়িত্ব। আমি যদি তথ্য গোপন করি তাহলে সংকট হবে।’
অনুষ্ঠানে মডারেটর ছিলেন মুসলিম ওয়ার্ল্ড রিসার্চ সেন্টার মালয়েশিয়ার প্রেসিডেন্ট ড. ইশারফ হোসাইন। আমাদের শিক্ষায় স্ট্র্যাটেজিক অ্যাপ্রোচের ঘাটতি রয়েছে উল্লেখ করে তিনি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় জাতীয় নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা এবং ভূরাজনীতির মতো ডাইনামিক স্ট্র্যাটেজিগুলো নতুনভাবে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান।
সম্প্রতি ক্যাম্পাসগুলোতে অস্থিরতা স্বাগত বক্তব্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, সমন্বিত ভুয়া তথ্য প্রচারণার কারণে ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলো অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ভুয়া তথ্যের বিস্তার বন্ধ না হলে দেশ আবারও অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে। শুধু প্রোপাগান্ডাই এসব ক্যাম্পাসকে অস্থির করে তুলেছে বলেনও এ সময় মন্তব্য করেন তিনি।
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক মো. আশরাফুল হুদা বলেন, ফলস ইনফরমেশন যেটা আমাদের জাতীয় নিরাপত্তাকে থ্রেট করছে, সেটা থেকে আমাদের বের হয়ে আসা দরকার। ইন্টেলিজেন্স ফেইলের কারণেও এসব ঘটছে। তারা যদি একটু সতর্ক হন, তাহলে বিষয়টি সমাধানে আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
অনুষ্ঠানে সমাপনী বক্তব্য দেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. কামরুল আহসান। এ সময় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন স্বাধীনতা পুরস্কার পাওয়া শিক্ষক অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়ুয়া, সাবেক রাষ্ট্রদূত নাসিম ফেরদৌস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক তাজমেরি এস ইসলাম, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক জজ ইকতেদার আহমেদ, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মাহমুদ হোসেন, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) ডেন্টাল অনুষদের নতুন ডিন ডা. সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্থ, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. নাজমুস সাকিব, জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম সদস্যসচিব আলাউদ্দিন মোহাম্মদ, ফরিদুল হক প্রমুখ।