অডিও রেকর্ডের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ক্যান্টনমেন্ট থানার প্রত্যাহার ওসি রাকিবুল হাসানকে বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজতে নেওয়া হয়। এ ঘটনায় ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটির সদস্যরা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, গঠিত কমিটি তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকেছে। কমিটিতে ডিবির একজন এবং ডিএমপি সদরদপ্তরের দুজন কর্মকর্তা রয়েছেন।
পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে মন্তব্য, পুলিশের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন এবং সেনাবাহিনীকে ক্যান্টনমেন্টে থাকার পরামর্শসহ নানা ধরনের বক্তব্যসংবলিত একটি অডিও রেকর্ড ঘিরে তোলপাড় চলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া রেকর্ডিংয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি রাকিবুল ইসলামের কণ্ঠ রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এ বিতর্কের মধ্যেই বৃহস্পতিবার তাকে থানা থেকে প্রত্যাহার করে ডিএমপি সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। ওসির ওই বিতর্কিত অডিওতে শেখ হাসিনাকে চলতি মাসেই দেশে ফেরা, পুলিশের অক্ষমতা এবং তাদের বদলি-পদায়ন নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করতে শোনা যায়।
অডিওতে যা বলেছিলেন
অডিওর প্রচারিত অংশে ওসি রাকিবুল ইসলামকে শেখ হাসিনার ব্যাপারে বলতে শোনা যায়-‘শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে আসতেছে। কিচ্ছু হবে না, কিচ্ছু হবে না, আপনারা তো চিন্তাও করতে পারতেছেন না, রাস্তার পুলিশ কত দুর্বল, ভয়ানক দুর্বল।… শেখ হাসিনার আসা উচিত। ডিসেম্বর আসা দেরি, এই মাসে আসা উচিত ছিল।… চলে আসলে এই পুলিশ কিচ্ছু করতে পারবে না।’ এরপর সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে বক্তব্যে শোনা যায়- ‘সেনাবাহিনীতে কথা বলতে হবে…তোমরা (সেনাবাহিনী) নিউট্রাল থাকো… রাস্তা আমি দেখতেছি।
রেকর্ডিংয়ের আরেক অংশে সেনাপ্রধানের হজে যাওয়ার প্রসঙ্গ টেনে বলতে শোনা যায়, ‘হজ করতে গেছে সেনাপ্রধান, প্রধানমন্ত্রীরও যাওয়া উচিত ছিল।’ এরপর সশব্দে হাসির আওয়াজ শোনা যায়। শেখ হাসিনার দেশে ফেরা প্রসঙ্গে তাকে আবারও বলতে শোনা যায়- ‘তোমরা ক্যাটনমেন্টে থাকো। পুলিশ কিচ্ছু করতে পারবে না।… রাস্তার পুলিশ কিচ্ছু না… কিচ্ছু না পুলিশ।
সিনিয়র অফিসারদের উদ্দেশে বলতে শোনা যায়, ‘সিনিয়র অফিসাররা সব বিএনপি করতেছে, আমরা তো আর বিএনপি করতেছি না…। এই করার জন্য তো আমরা ডিপার্টমেন্টে আসি নাই, তোমরা (সিনিয়র অফিসাররা) খাবা-দাবা (অশ্লীল বাক্য) ...নিয়ে থাকবা আর আমরা এসে রাস্তার…। পুলিশের কেউ কাজ করে না, খালি খালি ভালো সাজতেছ…ওসিরা বাসায় গিয়ে ঘুমায় আসতেছে…কেউ কোনো কাজ করতেছে না।’
বর্তমান আইজিপি আলী হোসেন ফকিরের প্রসঙ্গ টেনে ওসিকে বলতে বলতে শোনা যায়,...কি খেলাধুলা চলতেছে সমানে ওসি পোস্টিং নিয়ে, আইজি (আইজিপি আলী হোসেন ফকির) ড্রাইভার পোস্টিং করতেছে... ওসি পোস্টিং করতেছে। মানে এগুলো সহ্য করার মতো না।…তার কাছে টাকা দিচ্ছে, সকাল বেলা পোস্টিং করতেছে…। আপনার তো লজ্জা থাকা উচিত…(আওয়ামী আমলে আইজিপির) চাকরি ছিল না... চাকরি চলে গেছে... চাকরি থেকে খেদায় দিছে। তো ভালোভাবে চাকরি করে সম্মান কামান। যে পদে আছি (আইজিপিকে উদ্দেশ করে)…এ পদে মাসখানেক থাকতে পারলে তো ২০০ কোটি টাকা এমনি হয়ে যাবে। পুলিশ কল্যাণ ট্রাস্টের যে টাকা আছে, সারা বাংলাদেশ ১৯৭১ সাল থেকে আজকের দিন পর্যন্ত।... প্রত্যেকটা পুলিশ সদস্যের চাঁদা কাটে...। সেই টাকা পুরো অ্যাকাউন্টে পড়ে রয়েছে...। ব্যাংক রইছে, এইখানে রইছে সেই সব ইন্টারেস্টের টাকা। চাইলের টাকা, ডাইলের টাকা, তেলের টাকা, জুতার টাকা,.. জাইঙ্গার টাকা, কম্বলের টাকা, পোশাকের টাকা…।
আবার রেকার আছে… লীগের কমিশনার যারা ছিল, ওসি পোস্টিং এ টাকা…যত ওসি…টাকা দিয়ে পোস্টিং দিছে…। বেনজীর (আওয়ামী লীগের ডিএমপি কমিশনার) ছিল…তাদের ওসিদের এমপি পোস্টিং দিছে…তারপরে তাদের (ওসিদের) কাছ থেকে নিছে… এইভাবে করছে…।
ওই ওসি আরো বলেন, ডিএমপি ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী ক্যাপিটাল সিটি, এখানকার ওসিরা টাকা দেবে কেন, এখানকার ওসিরা এমনিই যাবে…তোমাদের কাজ করে। তোমরা টাকা দিবা… আমি ভাটার একটা কাজ করে দিছি এক স্যারের…স্যারকে এক কোটি টাকা দিছি। স্যার আমার সাথে সম্পর্ক রাখছে…। মাঝে মধ্যে আস্তে বলার কারণে কিছু কিছু কথা বোঝা যায়নি।
এর আগে গুলশানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের মিছিলের ঘটনায় গুলশান বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার এম তানভীর আহমেদ এবং গুলশান মডেল থানার ওসি দাউদ হোসেনকে দায়িত্ব থেকে সরানো হয়। গত বুধবার ডিএমপি কমিশনারের সই করা আদেশে তানভীর আহমেদকে সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। দাউদ হোসেনকেও একই দিন সদর দপ্তর ও প্রশাসন বিভাগের কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছিল।