সরকারের অডিট আপত্তি থাকা সত্ত্বেও বিটিআরসি (বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন) কিছু কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। কমিশনের বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির (ডিপিসি) সভা ইতোমধ্যে ৩-৪ বার সম্পন্ন করা হয়েছে, যা বিরল ঘটনা।
এতে অবশ্য কমিশনের অনিয়ম বৈধ করা সম্ভব হয়নি। কারণ, বর্ণিত কমিটিতে অর্থ মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের প্রতিনিধিসহ কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান এবং প্রশাসন বিভাগের মহাপরিচালক বিধিবহির্ভূত এ পদোন্নতি না দেওয়ার বিষয়ে একমত পোষণ করেন। ওই পদোন্নতি কমিটির সভায় তারা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, এই অডিট আপত্তি যেহেতু ওইসব কর্মকর্তাদের নিয়োগ এবং আর্থিক বিষয়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত, সেহেতু এ বিবেচনায় ওই কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়ার সুযোগ নেই।
বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির কার্যবিবরণী কমিশনের ৩০৪তম সভায় উপস্থাপিত হলে পদোন্নতির ক্ষেত্রে নিয়োগ সম্পর্কিত অডিট আপত্তির সংশ্লিষ্টতা নিরূপণ সাপেক্ষে পদোন্নতি বিবেচনা করা হবে মর্মে সিদ্ধান্ত হয়। এক্ষেত্রে উপ-পরিচালক থেকে পরিচালক পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে কমিশন
বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির সুপারিশকে অগ্রাহ্য করে বর্ণিত বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের সুনির্দিষ্ট মতামত পরবর্তী কমিশন সভায় উপস্থাপনের জন্য লিগ্যাল অ্যান্ড লাইসেন্সিং বিভাগকে নির্দেশনা দিয়েছে। এতে কমিশনের দুরভিসন্ধি স্পষ্ট হয়েছে। কারণ, সরকারি চাকরিবিধি ও মানবসম্পদ সংশ্লিষ্ট সরকারের তিনটি মন্ত্রণালয়সহ কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান এবং কমিশনের মানবসম্পদ বিভাগের মহাপরিচালক উক্ত পদোন্নতি প্রদান করা বিধিবহির্ভূত হবে না মর্মে তাদের সুনির্দিষ্ট মতামত দেওয়া সত্ত্বেও কমিশন উপ-পরিচালক থেকে পরিচালক পদে পদোন্নতি দিতে যেন মরিয়া হয়ে উঠেছে।
এ বিষয়ে জানতে বিটিআরসির চেয়ারম্যান মো. এমদাদ উল বারীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি।
জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান কমিশনের চেয়ারম্যানসহ কমিশনারদের সরে যেতে হবেÑ এমন আশঙ্কায় বিধিবহির্ভূত ও অনিয়মতান্ত্রিক পদোন্নতি দিতে এত তড়িঘড়ি করা হচ্ছে।
বিটিআরসির মানবসম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা শাখা থেকে জারি করা অফিস আদেশে জানানো হয়েছে, উপ-পরিচালক সনজিব কুমার সিংহকে এনফোর্সমেন্ট অ্যান্ড ইন্সপেকশন ডিরেক্টরেট থেকে রংপুর স্পেকট্রাম মনিটরিং স্টেশনে এবং উপ-পরিচালক এসএম আফজাল রেজাকে স্পেকট্রাম বিভাগ থেকে সিলেট মনিটরিং স্টেশনে সংযুক্ত করা হয়েছে।
আদেশে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অনতিবিলম্বে বর্তমান কর্মস্থল থেকে অবমুক্ত হবেন। অন্যথায়, ২ এপ্রিল অপরাহ্নে তাদের ‘স্ট্যান্ড রিলিজ’ হিসেবে গণ্য করা হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বিটিআরসির অতীতের কিছু অবৈধ বিতর্কিত নিয়োগ ও প্রশাসনিক অনিয়মের বিরুদ্ধে এই দুই কর্মকর্তাসহ আরো চারজন সম্প্রতি উচ্চ আদালতে রিট করেন। রিট দায়েরের অল্প সময়ের মধ্যেই বদলির আদেশ জারি হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। অনেকেই এটিকে প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখছেন। যেসব কর্মকর্তা নিজের পদোন্নতি ও বঞ্চনার শিকারের বিষয়টি জানিয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছেন, তারাই কমিশনের চক্ষুশূল হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বিটিআরসির একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার মতো একটি বৈধ প্রক্রিয়ার পর এমন দ্রুত বদলি প্রশাসনের ভেতরে একটি ভীতি বা অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি করতে পারে। তাদের মতে, এতে ভবিষ্যতে অনিয়মের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে কর্মকর্তারা নিরুৎসাহিত হতে পারেন।
জানা গেছে, আরো একটি বিষয় আলোচনায় এসেছে তা হচ্ছে, দেশের বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত স্পেকট্রাম মনিটরিং স্টেশনগুলোর বৈধতা নিয়ে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, রংপুর, বগুড়া, রাজশাহী, সিলেট ও চট্টগ্রামে অবস্থিত এসব স্টেশন সরকারিভাবে অনুমোদিত নয়। দীর্ঘদিন ধরে এগুলো পরিচালিত হচ্ছে। যার ফলে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় বাড়ছে। কারণ এসব মনিটরিং স্টেশন কার্যত কোনো কিছু করতে অক্ষম এবং এটি থেকে কমিশনের অর্জন শূন্য। এতে শুধু এ ধরনের ভাড়া করা স্থানে আনসার, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য বিষয়ে সরকারের ব্যাপক ব্যয় হচ্ছে; যা অনভিপ্রেত এবং বাংলাদেশের মতো স্বল্প উন্নত দেশে এ ধরনের অপচয় বিধিবহির্ভূত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
টেলিযোগাযোগ খাতে সরকারের এমন অপচয় নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এছাড়া কিছু কিছু অফিসের অবস্থা বিপদসংকুল ও বেহাল। গত বছর বগুড়ায় শাহজাহান আলি নামে বিটিআরসির এক উপসহকারী পরিচালকের মাথায় ছাদের আস্তরণ ভেঙে পড়লে তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকায় আনা হয়।