বিদায়ী বার্তায় প্রণয় ভার্মা
বাংলাদেশে ভারতের বিদায়ী হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা রোববার একটি বিদায়ী বার্তা তিনি দিয়েছেন। বিদায়ী বার্তায় তিনি বলেন: বাংলাদেশ ছেড়ে বেলজিয়াম ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসেবে আমার পরবর্তী দায়িত্বে যোগদানের প্রাক্কালে আমার মনে অনেকগুলি ভাবনার সমাগম ঘটেছে।
আমরা প্রায় চার বছর ধরে ঢাকায় অবস্থান করেছি— যা প্রচলিত তিন বছর মেয়াদকালের চেয়ে দীর্ঘ। এই সময়কালে আমরা একাধিক পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করেছি, যার প্রত্যেকটি একে অপরের থেকে পৃথক। প্রতিটিরই রয়েছে নতুন একদল করে অংশীজন, যাদের ভারতের সাথে সম্পর্কের বিষয়ে রয়েছে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি। কখনও কখনও এটি ছিল বন্ধুর। কিন্তু পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, এটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও ফলপ্রসূ একটি অভিজ্ঞতাও ছিল। আমি ও আমার স্ত্রী মনু এখান থেকে অনেক অবিস্মরণীয় স্মৃতি সঙ্গে নিয়ে যাব। অনেক মানুষ অসাধারণভাবে আমাদের জীবনকে স্পর্শ করেছেন, গড়ে তুলেছেন এমন বন্ধুত্বের বন্ধন, যা কূটনীতিবিদ হিসেবে এই দেশের সাথে সংযোগের পরিসর অতিক্রম করে অনেক বেশি স্থায়ী হবে।
বাংলাদেশে কাজ করতে গিয়ে আমি উপলব্ধি করেছি যে আমাদের সম্পর্কগুলো কতটা বিশেষ ও অনন্য। এক স্তরে, আমরা অভিন্ন ভূগোল, ইতিহাস, ভাষা ও ঐতিহ্যের মাধ্যমে সংযুক্ত। অন্য দিকে, আমাদের মধ্যে এমন এক সাংস্কৃতিক ঘনিষ্ঠতা ও সহমর্মিতা রয়েছে, যা অন্য যেকোনো দুটি সমাজের মধ্যে বিরল। আরও গভীর পর্যায়ে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আমাদের সম্মিলিত আত্মত্যাগের মাধ্যমে আমরা আবেগের বন্ধনে আবদ্ধ।
আমাদের সম্পর্কটি তাৎপর্যপূর্ণ পারস্পরিক নির্ভরশীলতা ও আন্তঃসংযোগের। একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ যেমন ভারতের জন্য কাম্য, তেমনই একটি সমৃদ্ধ ভারতও বাংলাদেশের জন্য কাম্য। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, আমাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও আবেগগত সংযোগের এই বাস্তবতা এবং পারস্পরিক নির্ভরশীলতা ও পারস্পরিক কল্যাণের এই যুক্তিই আমাদের সম্পর্কটিকে অব্যাহতভাবে পথনির্দেশনা প্রদান করবে এবং সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
বাংলাদেশের জন্মের পর বিগত ৫৫ বছরে ভারত ও বাংলাদেশ উভয়ই অনেকটা পথ পাড়ি দিয়েছে। আমরা উভয়ই আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও বেশি সক্ষম, আত্মবিশ্বাসী, সংযুক্ত এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী সমাজে পরিণত হয়েছি। আমরা উভয়েই আমাদের অভিন্ন এই অঞ্চলের শান্তি, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন। জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত স্থায়িত্বের মতো অভিন্ন প্রতিবন্ধকতাসমূহ মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে আমাদের দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই অঞ্চলের দুটি বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে, আমাদের উভয়কেই এই অঞ্চলে আরও ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের লক্ষ্যে মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে হবে।
আজ আমরা আমাদের অতীতের তুলনায় অনেকাংশেই আলাদা হওয়ার কারণে আমি আরও বিশ্বাস করি যে, আমাদের সম্পৃক্ততার জন্য ভবিষ্যৎ-কেন্দ্রিক নতুন একটি কর্মসূচি প্রয়োজন। এমন একটি কর্মসূচি যা আমাদের নতুন সক্ষমতাসমূহ, নতুন লক্ষ্যসমূহ ও নতুন জাতীয় উন্নয়ন অগ্রাধিকারসমূহের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এমন একটি কর্মসূচি যা আমাদের সুদৃঢ় সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সংযোগের মাধ্যমে পরিচালিত। এবং এমন একটি কর্মসূচি যা পারস্পরিক আগ্রহ, পারস্পরিক কল্যাণ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ওপর ভিত্তি করে গঠিত।
দ্রুত বিকাশমান দুটি দেশ হিসেবে আমাদের ভৌগোলিক নৈকট্য আমাদের উভয়ের জন্যই একটি সম্পদ, কোনো দায় নয়। এই নৈকট্যকে উভয়ের জন্য নতুন সুযোগে রূপান্তরিত করার লক্ষে আমাদের অবশ্যই নিরন্তর প্রয়াস চালিয়ে যেতে হবে। আমি আশাবাদী যে, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সকল শুভানুধ্যায়ী এই অভিন্ন স্বপ্নকে গড়ে তোলা ও এটার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একত্রিত হবেন। দুই দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি আরও বেশি আশাবাদী হয়ে বাংলাদেশ ত্যাগ করছি।
চার বছর অনেক দীর্ঘ সময় হলেও এই দেশ ও তার মানুষের প্রতি আমাদের যে স্নেহার্দ্রতা ও আবেগীয় টান গড়ে উঠেছে, তার জন্য এই সময়কাল অপ্রতুল। নানা উত্থান-পতন সত্ত্বেও, কেবলমাত্র এখানে গড়ে ওঠা অসাধারণ বন্ধুত্ব এবং সমগ্র দেশের মানুষের কাছ থেকে পাওয়া উষ্ণতা ও স্নেহের কারণে বাংলাদেশে আমাদের কাটানো এই সময়টি আমার ও আমার স্ত্রীর কাছে সবচেয়ে প্রিয় পর্যায় হিসেবে স্মৃতিতে অমলিন হয়ে থাকবে।
বাংলাদেশের প্রায় সকল স্তরের এমন বহু সদয় ও সুহৃদ বন্ধু, যাঁরা আমাদের হৃদয়কে গভীরভাবে স্পর্শ করেছেন, তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার প্রত্যাশা করছি। আমরা আশা করি, আমাদের পথ আবার কখনও, কোনো এক সময়, কোনো এক স্থানে মিলিত হবে! সেই পর্যন্ত, আমি শুধু এটাই বলতে চাই—আবার দেখা হবে।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাৎ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন ভারতের বিদায়ী হাই কমিশার প্রণয় ভার্মা। রোববার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে এই সাক্ষাৎ হয়েছে বলে জানিয়েছেন তার অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন। এ সময়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
সম্প্রতি প্রণয় ভার্মাকে বেলজিয়াম ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছে দিল্লি। তিনি ব্রাসেলসে ভারতের রাষ্ট্রদূত সৌরভ কুমারের স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন। বাংলাদেশে ভারতের নতুন হাই কমিশনার হিসেবে দেশটির সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, ব্যারাকপুরের সাবেক এমপি, বিজেপি নেতা দীনেশ ত্রিবেদীর নাম ঘোষণা করেছে দিল্লি।