ফিরে দেখা
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে লাগাতার আন্দোলনের অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের ৯ জুলাই বড় কোনো কর্মসূচি ছিল না। তবে ছাত্র ধর্মঘট, ক্লাস বর্জনের পাশাপাশি কোটার বিরুদ্ধে অনলাইন ও অফলাইনে গণসংযোগ করেন শিক্ষার্থীরা।
পাশাপাশি ১০ জুলাই সকাল-সন্ধ্যা সর্বাত্মক ‘ব্লকেড’ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। দেশের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও রেলপথ এ অবরোধ কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত থাকবে জানিয়ে দেশের বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠানের নিকটবর্তী সড়ক অবরোধের আহ্বান জানানো হয়।
ওই দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, এ আন্দোলন শিক্ষার্থীরা নিজেরা তৈরি করেনি। হাইকোর্টের রায় ও সরকারের নিশ্চুপ ভূমিকার প্রেক্ষাপটে এ আন্দোলন। এ আন্দোলনের ফলে জনগণের যে ভোগান্তি হচ্ছে, এর দায় সরকারকে নিতে হবে। কারণ, আমরা এতদিন ধরে আন্দোলন করলেও সরকার বা নির্বাহী বিভাগ থেকে কোনো আলোচনার ডাক বা আশ্বাস পাইনি। আমরা এমন একটি চূড়ান্ত সমাধান চাচ্ছি, যাতে ভবিষ্যতে কোটা নিয়ে কোনো ধরনের জটিলতা তৈরি না হয়। সেজন্য আমরা অনগ্রসর গোষ্ঠীর কথা বিবেচনায় রেখে সংসদে আইন পাস করার মাধ্যমে কোটার যৌক্তিক সংস্কার দাবি করছি।
আরেক সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, আমরা যে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছি, এটা কোটা বাতিলের নয়; বরং বাস্তবতার সঙ্গে সমন্বয় করে যৌক্তিক সংস্কারের আন্দোলন। বিভিন্ন গণমাধ্যমে আমাদের দাবিকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। এ আন্দোলন মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী নয়। আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের রিওয়ার্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলিনি; তাদের নাতিপুতি, পোষ্য কোটার বিরোধিতা করছি। আমাদের আন্দোলন গণআন্দোলনে পরিণত হয়েছে। কৃষক, শ্রমিক, প্রবাসী রেমিট্যান্সযোদ্ধাÑসবাই এ আন্দোলনে সমর্থন জানিয়েছেন। আমরা নীতিনির্ধারক, বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, গণমাধ্যমÑসবার সঙ্গে সমন্বয় করে সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
তিনি আরো বলেন, দুজন শিক্ষার্থী হাইকোর্টে আপিল করেছেন। যারা আপিল করেছেন, তারা আমাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। আমাদের মূল দাবিটা মূলত নির্বাহী বিভাগের কাছে। আমরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গেও সমন্বয় করেছি। আমাদের মাঠপর্যায়ে জরিপ ও সর্বসম্মতিক্রমে ৫ শতাংশ কোটা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধীÑএ তিনটি শ্রেণি কোটার আওতাভুক্ত হবে।
এর আগে কোটা সংস্কারের দাবিতে দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারের সামনে ১০ মিনিট মৌন সমাবেশ করেন শিক্ষার্থীরা।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) শিক্ষার্থীরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে দাবি না মানা পর্যন্ত লাগাতার অবরোধের হুঁশিয়ারি দেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) প্যারিস রোডে অবস্থান নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভা করেন সেখানকার শিক্ষার্থীরা। রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থীরা কলেজের সামনের সড়ক অবরোধ করে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। এ কর্মসূচি শেষে শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন সড়কে শোডাউন করেন।
কোটা সংস্কার আন্দোলনের অংশ হিসেবে গণসংযোগ করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) শিক্ষার্থীরা। হবিগঞ্জে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করেন শিক্ষার্থীরা। ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনালের সামনে অবরোধ করেন বিএম কলেজের শিক্ষার্থীরা। একই মহাসড়কের বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) গেটের সামনে অবরোধ করেন সেখানকার শিক্ষার্থীরা। এছাড়া কোটা বাতিলের দাবিতে রাঙামাটিসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা।
এদিকে, কোটা পুনর্বহালসংক্রান্ত হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীর করা আবেদন আপিল বিভাগে শুনানির জন্য ১০ জুলাই নির্ধারণ করা হয়। আবেদনটি করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আল সাদী ভূঁইয়া ও উর্দু বিভাগের শিক্ষার্থী আহনাফ সাঈদ খান।
কোটা নিয়ে বিচারাধীন মামলায় পক্ষভুক্ত হতে চাওয়া শিক্ষার্থীরা সঠিক পথে হাঁটছেন বলে মন্তব্য করেন তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। তিনি বলেন, যেহেতু তারা আদালতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, আমি এটাকে সাধুবাদ জানাই। আশা করব, তারা আন্দোলন প্রত্যাহার করবেন। ঘটনা ঘটছে আদালতে। রাজপথে আন্দোলন করে এটার নিরসন হবে না। এটা করলে একটা পর্যায়ে হয়তো আদালত অবমাননাও হয়ে যেতে পারে।
এছাড়া ৯ জুলাই গুলিস্তানে আওয়ামী লীগের প্রধান কার্যালয়ে যৌথসভায় কোটা আন্দোলন সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন বলে জানান পতিত দলটির সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।