রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের পুরোনো বাণিজ্যমেলার মাঠে সচিবালয় স্থানান্তরের সরকারি সিদ্ধান্ত ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন জটিলতা। জমির মালিকানা নিজেদের দাবি করে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (শেকৃবি) প্রশাসন। কৃষি গবেষণার স্বার্থে জমি ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন শেকৃবির শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনে প্রস্তাবিত প্রকল্পের কাজ বাধার মুখে পড়ার পাশাপাশি শেরেবাংলা নগরের মূল মহাপরিকল্পনা নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে জমির মালিকানা ও ব্যবহারসংক্রান্ত বিষয় পর্যালোচনা করে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবছে মন্ত্রণালয়।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, পুরোনো বাণিজ্যমেলার মাঠের জমি দীর্ঘদিন ধরে গণপূর্তের নামে রেকর্ডভুক্ত। জমির খাজনা ও ভূমিসংক্রান্ত হালনাগাদ কার্যক্রমও মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিচালিত হচ্ছে। অন্যদিকে শেকৃবি প্রশাসনের দাবি, কৃষি গবেষণার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়কে বরাদ্দ দেওয়া জমির অংশ এটি। এ-সংক্রান্ত দলিলপত্রও তাদের কাছে আছে। ফলে জমির প্রকৃত মালিকানা ও ব্যবহারের অধিকার নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে।
গত ১৮ অক্টোবর মন্ত্রিসভার ২৫তম বৈঠকে আবদুল গনি রোডে অবস্থিত বর্তমান বাংলাদেশ সচিবালয় শেরেবাংলা নগরের পুরোনো বাণিজ্যমেলার মাঠে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ২০২৯ সালের মধ্যে নতুন স্থানে সচিবালয়ের কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্যমাত্রাও নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু সিদ্ধান্তের পরপরই মাঠটি কৃষি গবেষণার কাজে ব্যবহারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য, জমিটি তাদের মালিকানাধীন সরকারি সম্পত্তি। দীর্ঘদিন ধরে মন্ত্রণালয়ই এর দেখভাল করে আসছে। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি, বিভিন্ন সময়ে সরকারি স্থাপনা নির্মাণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি নেওয়া হলেও অবশিষ্ট জমির মালিকানা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনেই থাকার কথা।
শেকৃবির প্রক্টর অধ্যাপক আরফান আলী আমার দেশকে বলেন, ১৯২০ সালে ব্রিটিশ সরকারের উদ্যোগের পর ১৯৩৮ সালে শেরেবাংলা একে ফজলুল হক বেঙ্গল অ্যাগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেন। পরে কৃষি গবেষণার স্বার্থে প্রতিষ্ঠানটিকে প্রায় ২০০ একর জমি দেওয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, বিভিন্ন সময়ে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ, হৃদরোগ ও পঙ্গু হাসপাতাল, পরিকল্পনা কমিশন এবং গণপূর্ত ভবন নির্মাণের জন্য জমি নেওয়া হয়। অবশিষ্ট জমির একটি অংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ছিল।
অধ্যাপক আরফান আলীর দাবি, ১৯৮৮-৮৯ সালে এরশাদ সরকারের আমলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হল, ডেইরি ফার্ম ও মসজিদ সরিয়ে অস্থায়ীভাবে মেলার জন্য জমিটি নেওয়া হয়।
দীর্ঘদিন জমিটি ফেরত চাওয়ার উদ্যোগ না নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, গত ১৭ বছর আন্দোলন করার সুযোগ না থাকলেও চব্বিশের ৫ আগস্টের পর থেকে শিক্ষার্থীরা জমিটি ফেরত দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে। কৃষি গবেষণা সম্প্রসারণ ও পরিবেশ সংরক্ষণের স্বার্থে জমিটি বিশ্ববিদ্যালয়কে ফিরিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। জমির মূল মালিকানাসংক্রান্ত সব কাগজপত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে আছে বলেও দাবি করেন তিনি।
সড়ক অবরোধ, বিশ্ববিদ্যালয় শাটডাউন
জমি হস্তান্তরের দাবিতে গত ২৭ অক্টোবর থেকে আন্দোলন করছেন শেকৃবির শিক্ষার্থীরা। ওই দিন পুরোনো বাণিজ্যমেলার মাঠে সচিবালয় নির্মাণের উদ্দেশ্যে মাটি পরীক্ষার কাজ চলার সময় যন্ত্রপাতি ও গাড়ি জব্দ করে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিয়ে যান তারা। পরদিন মাঠে মেলা বন্ধের আল্টিমেটাম দেন আন্দোলনকারীরা। এর মধ্যে মাঠের বিভিন্ন স্থাপনায় ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে।
২৯ অক্টোবর দাবির পক্ষে সড়ক অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। ওই দিনই মাঠে জাতীয় যুব মেলাসহ সব ধরনের মেলা স্থগিতের ঘোষণা দেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক।
তবে মাঠের স্থাপনা অপসারণ না করা এবং আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের প্রতিবাদে ২ নভেম্বর আরো কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করেন তারা। ওই দিন মাঠটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ঘোষণাও দেন আন্দোলনকারীরা।
এরপর গত মঙ্গলবার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মতবিনিময় সভায় সব পর্যায়ের পরীক্ষা বর্জন এবং বেলা ১১টার পর ক্লাসে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি প্রাঙ্গণে সব ব্যাচের শিক্ষার্থীরা একত্র হয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় শাটডাউনের ঘোষণা দেন।
বুধবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের পতাকা স্ট্যান্ড থেকে মিছিল নিয়ে বের হয়ে চীন মৈত্রী সিগন্যালে অবস্থান নেন সহস্রাধিক শিক্ষার্থী। এতে ওই এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হয়। একই সঙ্গে শেরেবাংলা নগরে গণপূর্ত কমপ্লেক্সের সামনে কুশপুত্তলিকা দাহের কর্মসূচিও ঘোষণা করেন তারা। শিক্ষার্থীদের কর্মসূচির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
সচিবালয়ের জন্য মূল পরিকল্পনা সংরক্ষণের সুপারিশ স্থাপত্য অধিদপ্তরের
এদিকে, শেরেবাংলা নগরের প্রশাসনিক এলাকার মূল মহাপরিকল্পনা অক্ষুণ্ণ রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে স্থাপত্য অধিদপ্তর। সংস্থাটির এক প্রতিবেদনে জাতীয় সংসদ ভবনসহ পুরো প্রশাসনিক এলাকার পরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার নিশ্চিতের সুপারিশ করা হয়েছে। এজন্য শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়কে গাজীপুরের সালনায় বরাদ্দ করা জমিতে স্থানান্তরের প্রস্তাবও রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতীয় সংসদ ভবন ও শেরেবাংলা নগরের প্রশাসনিক এলাকা স্থপতি লুই আই কানের প্রণীত মহাপরিকল্পনার অংশ। এই এলাকার ভূমি ব্যবহার ও কাঠামোগত বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন আনা হলে সংসদ ভবনের আন্তর্জাতিক ঐতিহ্যগত স্বীকৃতি অর্জনের প্রচেষ্টা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ইতোমধ্যে জাতীয় সংসদ ভবনকে ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের সম্ভাব্য তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য আবেদন করা হয়েছে।
স্থাপত্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, তৎকালীন পূর্ত বিভাগের হিসাব ও রাজধানীর স্থপতিদের মতামতের ভিত্তিতে তৎকালীন এবং ভবিষ্যৎ প্রয়োজন মেটাতে প্রায় ১,০০০ একর জমির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১৯৬৪ সালে সংসদ ভবন নির্মাণের জন্য ৪০৮ একর জমি অধিগ্রহণের পর প্রশাসনিক এলাকার জন্য আরো ৫০০ একর জমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সংসদ ভবনের উত্তর পাশে চিলড্রেন উদ্যানের উত্তরে জাতীয় সচিবালয়সহ প্রশাসনিক ব্লক নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিলেন লুই আই কান। তবে স্বাধীনতা-পরবর্তী অর্থনৈতিক ও সামগ্রিক পরিস্থিতির কারণে ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি। ১৯৮২ সালে সংসদ ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হলেও প্রস্তাবিত সচিবালয় নির্মাণের উদ্যোগ আর এগোয়নি।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, সচিবালয়ের জন্য নির্ধারিত জমির বিপরীতে শেরেবাংলা নগরের পরিকল্পনা কমিশনসংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়কে গাজীপুরের সালনায় স্থানান্তরের শর্তে জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত স্থানান্তরের উদ্যোগ নেয়নি। প্রশাসনিক এলাকার মূল পরিকল্পনার সঙ্গে বিশেষায়িত কৃষি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বর্তমান অবস্থান সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেও মনে করছে স্থাপত্য অধিদপ্তর।
এছাড়া সচিবালয় নির্মাণের উদ্যোগ বাস্তবায়ন না হওয়ায় একপর্যায়ে জমিটি সবুজ পার্ক ও খেলাধুলার মাঠ হিসেবে সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। সে অনুযায়ী নকশাও প্রণয়ন করে স্থাপত্য অধিদপ্তর। তবে ভবিষ্যতে প্রশাসনিক অবকাঠামোর সম্প্রসারণের প্রয়োজন বিবেচনায় জমিটি সচিবালয়ের সম্প্রসারিত অংশ হিসেবে সংরক্ষণের সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।
জমি মন্ত্রণালয়ের নামে রেকর্ডভুক্ত : গণপূর্ত সচিব
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব ওবায়দুর রহমান এ বিষয়ে আমার দেশকে বলেন, পুরোনো বাণিজ্যমেলার মাঠের জমি বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়। মাঠ ও বিভিন্ন স্থাপনা মিলিয়ে মোট ১৫৭ একর জমি মন্ত্রণালয়ের নামে রেকর্ডভুক্ত।
তিনি বলেন, এটি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত, মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত। সেখানে সচিবালয় স্থানান্তর করা হবে। এর অন্য কোনো বিকল্প নেই। এ বিষয়ে গণপূর্ত থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে বলেও জানান তিনি।
সচিব বলেন, আগে এই মাঠে বাণিজ্যমেলা হয়েছে, এখনো বিভিন্ন মেলা হচ্ছে। কোনো সমস্যা হয়নি। এখন হঠাৎ করে কারা ইন্ধন দিচ্ছে। এ বিষয়ে এসবির রিপোর্টের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, কিছু লোক পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করছে। গত ১৭ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ে গড়ে ওঠা ফ্যাকাল্টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এসব ঘটনায় ইন্ধন দিচ্ছেন।
শেকৃবির গবেষণার মাঠের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে গণপূর্ত সচিব বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে গবেষণার জন্য মাঠ থাকলেও সেগুলোর উল্লেখযোগ্য ফল পাওয়া যাচ্ছে না। বরং ধান চাষের জমি নষ্ট করে হোস্টেল ও বিভিন্ন ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় চাইলে সরকার অন্য জায়গায় হোস্টেল নির্মাণের জন্য জমি দিতে পারে।
নতুন সচিবালয়ে ১৪টি ১২ তলা ভবনের পরিকল্পনা
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে আবদুল গনি রোডে ১৭.৫৭ একর জমির ওপর বাংলাদেশ সচিবালয়ের ১৩টি ভবন রয়েছে। এর মধ্যে আটটি ভবন স্বাধীনতার আগে নির্মিত। পুরোনো ১, ২, ৩ ও ৮ নম্বর ভবন ১৯৩৭ থেকে ১৯৩৯ সালের মধ্যে এবং ৫ নম্বর ভবনটি ১৯৪৭ সালে নির্মিত হয়। এসব ভবন ভূমিকম্প সহনশীল করে নির্মাণ করা হয়নি। ঢাকা ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কার্যক্রম পরিচালনায় এসব ভবন ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছে সরকার। পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য পর্যাপ্ত জায়গার অভাবেও স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে একনেক সভার সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে পুরোনো বাণিজ্যমেলার মাঠে নতুন সচিবালয় স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এজন্য স্থাপত্য অধিদপ্তর একটি ধারণাগত স্থাপত্য নকশা প্রণয়ন করেছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রায় ৩১.৫৮ একর জমিতে মোট ৩৩.১৬ লাখ বর্গফুট আয়তনের অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। এতে তিনটি বেজমেন্টসহ ১৪টি ১২ তলা ভবন থাকবে। ৩,৮০০টি গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রাখা হবে, যার মধ্যে ২০০টি ভূউপরিস্থ পার্কিং। এছাড়া মসজিদ, ৩৫০ জন ধারণক্ষমতার দুটি বহুমুখী হল, ক্যাফেটেরিয়া ও ডাকঘরসহ অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্প এলাকার প্রায় ৩০ শতাংশ জায়গা সবুজায়ন ও জলাধারের জন্য রাখা হবে।