অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক চাপ সত্ত্বেও বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি এখনও অনেকাংশে স্থিতিশীল রয়েছে বলে জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার অপরিহার্য।
সোমবার বিকেলে রাজধানীর হোটেল আমারিতে অনুষ্ঠিত ‘ম্যাক্রোইকনমিক ইনসাইটস: নির্বাচিত সরকারের জন্য একটি অর্থনৈতিক সংস্কার এজেন্ডা’ শীর্ষক সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই) ও অস্ট্রেলিয়া সরকারের পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য বিভাগ (ডিএফএটি) যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
পিআরআই চেয়ারম্যান জাইদী সাত্তারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক কে এ এস মুরশিদ, বাংলাদেশে নিযুক্ত অস্ট্রেলিয়া হাইকমিশনের ডেপুটি হাইকমিশনার ক্লিনটন পবকে। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিআরআইর প্রধান অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান। প্যানেলিস্ট হিসেবে বক্তব্য রাখেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন, পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের (পিইবি) চেয়ারম্যান ও সিইও এম মাসরুর রিয়াজ।
ড. সালেহউদ্দিন বলেন, একসময় অর্থনীতি গভীর সংকটের মুখে পড়েছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলেও বিদ্যমান ঝুঁকিগুলো বাস্তব এবং এগুলো মোকাবিলায় সতর্কতা ও ধারাবাহিক নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন। মহামারি-পরবর্তী ধাক্কা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, জ্বালানির দামের অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক আর্থিক কড়াকড়ির মধ্যেও দেশ সামষ্টিক ভারসাম্য ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
মুদ্রাস্ফীতি, বৈদেশিক লেনদেনের চাপ ও আর্থিক খাতের সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এ ধরনের সংকট শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নয়, বহু দেশ একই বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তবে সংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানানো হচ্ছে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
রাজস্ব আহরণ প্রসঙ্গে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত তুলনামূলকভাবে খুবই কম, যা উন্নয়ন ও জনসেবায় অর্থায়নের সক্ষমতাকে সীমিত করে। এত নিম্ন রাজস্ব কাঠামো নিয়ে একটি আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনা করা কঠিন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে করব্যবস্থা সংস্কার, করভিত্তি সম্প্রসারণ এবং সম্মতি বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতকে অর্থনীতির অন্যতম দুর্বল অংশ হিসেবে চিহ্নিত করে ড. সালেহউদ্দিন বলেন, দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক সমস্যা, উচ্চ অনুৎপাদক ঋণ এবং জবাবদিহিতার ঘাটতি জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন করেছে। এসব জটিলতা নিরসনে সময়, শক্ত নজরদারি ও রাজনৈতিক সাহস প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিআরআইর প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান। তিনি বলেন, গত ১৮ মাসে বাংলাদেশ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় পরিসরেই কঠিন সময় অতিক্রম করেছে। অর্থনৈতিক দিক থেকে মূল চ্যালেঞ্জ ছিল স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং প্রবৃদ্ধির গতি পুনর্গঠন করা। স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে আমরা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও দেশীয় ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে প্রবৃদ্ধির গতি এখনও নাজুক রয়ে গেছে। এ কারণেই সামনে এগিয়ে যেতে হলে বিশেষ করে আর্থিক ও রাজস্ব খাতে শক্তিশালী অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকার প্রয়োজন, কারণ এসব খাত দীর্ঘদিন ধরেই চাপের মধ্যে রয়েছে এবং বিদ্যমান ভঙ্গুরতাগুলো মোকাবিলায় কার্যকর সংস্কার অপরিহার্য। তাই পরবর্তী নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারকে রাজস্ব ও আর্থিক খাতে প্রধান সংস্কারগুলোতে প্রথম দিন থেকেই সাহসী ভূমিকা নিতে হবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে সঠিক সংস্কার হলে ৭ থেকে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব।
ড. সাত্তার বাংলাদেশ–জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তিকে একটি ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেন এবং স্বল্প সময়ে এটি বাস্তবায়নের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে কৃতিত্ব দেন। তিনি বলেন, এটি একটি উদাহরণ, যেখানে জাপান বাংলাদেশের জন্য অনেক বেশি বাজার উন্মুক্ত করেছে—যা দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের নিদর্শন এবং বাংলাদেশের জন্য একটি গেম-চেঞ্জার।
তিনি আরও বলেন, এনবিআর অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বাধা সৃষ্টি করছে। রাজস্ব নীতি ও বাস্তবায়ন আলাদা করার সিদ্ধান্ত হলেও এর বাস্তব কাঠামো এখনও তৈরি হয়নি। বাংলাদেশের কর ব্যবস্থা পশ্চাৎমুখী। প্রত্যক্ষ কর জিডিপির ২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২০৩৫ সালের মধ্যে ৯ থেকে ১০ শতাংশে নিতে হবে।
আলোচনায় আরও বক্তব্য দেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম. মাশরুর রিয়াজসহ দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা। শেষপর্যায়ে বক্তারা অভিমত দেন, টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে রাজনৈতিক ঐকমত্য, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গির বিকল্প নেই।