টানা ৭দিনের তাপদাহে তীব্র গরম আর লোডশেডিংয়ে সারাদেশের মানুষ ও প্রাণীকুলের প্রাণ যখন ওষ্ঠাগত ঠিক তখন হঠাৎ বৃষ্টি এনে দিয়েছে পরম স্বস্তি। আজ বিকালে রাজধানীসহ দেশের ছয় বিভাগে বৃষ্টি হয়েছে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে রংপুরে। রাজধানী ঢাকাতেও একেবারে কম হয়নি, বিকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ৩২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এতে তাপমাত্রা কমে সর্বত্রই স্বস্তির সুবাতাস বইলেও দেশের বিভিন্ন স্থানে বজ্রপাতে ১৪জন নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন ।
আবহাওয়া দপ্তরের স্টেশন পর্যবেক্ষণ তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, দেশের ৫১ টি পর্যবেক্ষণ স্টেশনের মধ্যে ২১টি সেটশন এলাকায় আজ সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয় রংপুরে ১৪৬ মিলিমিটার। এছাড়া নীলফামারীর সৈয়দপুরে ৭৮, পঞ্চগড়ের তেতুলিয়ায় ৫৫, দিনাজপুরে ৫২, মানিকগঞ্জের আরিচায় ৪৬, নারায়ণগঞ্জে ৪০ এবং কুড়িগ্রামের রাজারহাটে ৩৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। আর দেশের আট বিভাগের মধ্যে চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগে একফোটাও বৃষ্টি হয়নি। খুলনা বিভাগের চুয়াডাঙ্গায় ১৪ এবং সিলেট বিভাগের সিলেটে ৪ মিলিমিটার ছাড়া আর কোথাও বৃষ্টি হয়নি। আজ শহর ও গ্রাম-উভয় এলাকায় বৃষ্টির সঙ্গে ঠান্ডা বাতাস মানুষকে সাময়িক স্বস্তি দিয়েছে।
স্বল্প সময়ে পরিমাণে বেশি বৃষ্টির প্রভাবে গত সোমবার থেকে বয়ে যাওয়া তাপপ্রবাহের পরিধি একবারে কমে শুধু রাঙামাটি, বান্দরবন ও লক্ষ্মীপুরের ওপর দিয়ে তাপপ্রবাহ বয়ে যায়। আগামীকাল সোমবার তা প্রশমিত হতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
আজ রোববার সকাল থেকেই ধীরে ধীরে জমাটবাঁধা মেঘ বিকাল ৪টার দিকে কালোমেঘে আকাশে ছেয়ে যায় । কিছুক্ষণের মধ্যেই মেঘের ভয়ানক গর্জন আর বিদ্যুতের চমকানি আর দমকা হাওয়ার সঙ্গে ঝুমবৃষ্টি মুহুর্তেই পরিবেশ ঠান্ডা করে দেয় ।
আজ সন্ধ্যায় এ এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত আকাশ কালোমেঘ, ঝিরিঝিরি বৃষ্টি আর থেমে থেমে মেঘের গর্জন শোনা যাচ্ছিল। আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, এমন বৃষ্টি ও দমকা হাওয়া আরও হতে পারে এবং তা মে মাসের ৩ তারিখ পর্যন্ত চলতে পারে।
এদিকে আজ সন্ধ্যা ছয়টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘন্টার পূর্বাভাসে বলা হয়, আগামীকাল সোমবার রংপুর, ঢাকা, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে অতি ভবর্ষণ হতে পারে। এতে সোমবার সারাদেশে দিনের তাপমাত্রা সামান্য কমতে পারে এবং রাতের তাপমাত্রা ২ ডিগ্রী সেলসিয়াস পর্যন্ত কমতে পারে।
এছাড়া আজ সোমবার সন্ধ্যা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘন্টায় ঢাকা, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারী ধরনের ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ হতে পারে।
বৃষ্টির প্রভাবে আগের তুলনায় সারাদেশে তাপমাত্রাও কমে এসেছে; আজ সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় রাঙ্গামাটিতে ৩৭ ডিগ্রী সেলসিয়াস। এদিন রাজধানীর তাপমাত্রা ছিল ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ৩২ মিলিমিটার ঝুমবৃষ্টির পর সন্ধ্যা ৬টার দিকে তা ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস হয় বলে জানান আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ তরিফুল নেওয়াজ কবীর। এ আবহাওয়াবিদ আরো জানান, ঢাকার আকাশের মেঘ মাওয়া ও জাজিরার দিকে চলে গিয়ে সেখানে প্রবল বৃষ্টি হচ্ছে। ফলে রাতে বৃষ্টির আর বেশি সম্ভাবনা নেই। তবে আগামীকাল বিকেলে বৃষ্টি ঝরতে পারে রাজধানীতে। আগামী মাসের ৩ তারিখ পর্যন্ত এভাবে থেমে থেমে বৃষ্টি হতে পারে। ফলে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে দেশজুড়ে তাপপ্রবাহের কোনো আশঙ্কা নেই।
স্বস্তির মধ্যে অস্বস্তি
আজ বিকালে রাজধানীতে হঠাৎ বৃষ্টি হলে জনমনে স্বস্তির মধ্যেও কিছুটা অস্বস্তি দেখা গেছে। অফিস ছুটির পর অনেককে রাস্তার পাশে, মার্কেটে কিংবা মেট্রোরেল স্টেশনের নীচে দীর্ঘ সময় আটকে থাকতে দেখা যায়। ঝুমবৃষ্টির কারণে রাস্তায় গাড়ী কমে যায়, সে সময়ে রিকাশাও না পেয়ে অনেককে বৃষ্টির মধ্যেই হেঁটে বাসায় ফিরতে দেখা গেছে। অল্পসময়ে বেশি বৃষ্টি হওয়ায় রাজধানীর অনেক এলাকায় রাস্তায় পানিজমে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হলে জনদুর্ভোগ লক্ষ্য করা গেছে। এছাড়া আজ দেশের বিভিন্ন স্থানে বজ্রপাতে ১৪জন নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হওয়ায় স্বস্তির বৃষ্টি অস্বস্তিতে পরিণত হয় অনেকের জন্য।
গত ২০ এপ্রিল থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া তাপপ্রবাহ আজ অনেকটাই প্রশমিত হয়েছে। গত বুধবার চলতি মৌসুমের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল রাজশাহীতে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস; পরদিন বৃহস্পতিবার তা কিছুটা কমে যশোরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং শুক্রবার আরো কমে রাজশাহীতে সর্বোচ্চ ৩৭ দশমিক ৮ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। তবে কিছুটা বেড়ে শনিবার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল রাজশাহীতে ৩৮ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং রাজধানীতে ছিল ৩৬ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আগের দিন শুক্রবার রাজধানীতে তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৩৬ দশমিক ২ ডিগ্রী সেলসিয়াস। অবশ্য গত বৃহস্পতিবার রাজধানীতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করো হয় ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস; যা আগেরদিন বুধবার ছিল ৩৬ দশমিক ৫ ডিগ্রি। আর এটাই চলতি মৌসুমে রাজধানী ঢাকার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা।
এদিকে গত বুধবার ২৭ জেলায়, গত বৃহস্পতিবার ২০ জেলায়, শুক্রবার ২১ জেলায় এবং শনিবার ২০ জেলায় তাপপ্রবাহ বয়ে গেলেও আজ রোববার মাত্র তিনজেলায় বয়ে গেছে। আগামীকাল সারাদেশেই তাপপ্রবাহ প্রশমিত হতে পারে।
এ প্রসঙ্গে আবহাওয়াবিদ একেএম নাজমুল হক বলেন, এবার তাপপ্রবাহ বয়ে গেলেও বিগত ২০২৩ ও ২০২৪ সালের মতো এবার টানা তাপপ্রবাহের কোনো সম্ভাবনা নেই। কেননা, এবার তাপপ্রবাহের সাথে সাথে মাঝেমধ্যে বৃষ্টি থাকবে। ২০২৪ সালে টানা ২৬ দিন এবং ২০২৩ সালে ২২ দিন দেশে তাপপ্রবাহ ছিল।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৭ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত থাকলে তাকে মৃদু তাপপ্রবাহ বলা হয়। তাপমাত্রা ৩৮ থেকে ৩৯ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে তা মাঝারি এবং তাপমাত্রা ৪০ থেকে ৪১ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে তীব্র তাপপ্রবাহ ধরা হয়। তাপমাত্রা ৪২-এর বেশি হলে তা অতি তীব্র তাপপ্রবাহ বলে গণ্য হয়।
এমপি