প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে ফেসবুকের একটি পোস্ট শেয়ারের অভিযোগে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গত বৃহস্পতিবার রাতে গ্রেপ্তারের পর গত শুক্রবার তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
অজ্ঞাতনামা এক নারীর পাশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ছবি বসিয়ে সেটি ‘তারেক রহমান ব্লগ’ নামে একটি আইডি থেকে ফেসবুকে পোস্ট করা হয়েছিল। আজিজুল হকের অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্টটি শেয়ার করা হয়। পরে আজিজুল হককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
আজিজুল হক (৩৫) নামের ওই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের আগে বিএনপির পক্ষ থেকে উত্তেজনা তৈরি করা হয়েছিল বলে স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি ডয়চে ভেলেকে জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রেসসচিব সালেহ শিবলী ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘... কিন্তু একজন ব্যক্তি, তিনি প্রধানমন্ত্রী হন বা একজন সাধারণ নাগরিক, তার সঙ্গে একজন অর্ধনগ্ন নারীর ছবি জুড়ে দিয়ে ফেসবুকে পোস্ট করা মত প্রকাশ হতে পারে না।’
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেছেন, ‘বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তো অনেক সহনশীল, তাহলে এখানে কেন আগেভাগে পদক্ষেপ? কী এমন অপরাধ যে মধ্যরাতে ধরে তাকে জেলে ঢুকাতে হবে?’
পোস্ট শেয়ারের অভিযোগ
অজ্ঞাতনামা এক নারীর পাশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ছবি বসিয়ে সেটি ‘তারেক রহমান ব্লগ’ নামে একটি আইডি থেকে ফেসবুকে পোস্ট করা হয়েছিল। বৃহস্পতিবার আজিজুল হকের অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্টটি শেয়ার করা হয়। এরপরই মুক্তাগাছায় বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। এক পর্যায়ে রাত দেড়টার দিকে উপজেলার ঝনকা বাজার থেকে আজিজুল হককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তারের পরদিন শুক্রবার মুক্তাগাছা থানায় সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ও সন্ত্রাস দমন আইনে একটি মামলা করেন কাশিমপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক মো. ফজলু। এই মামলায় একমাত্র আসামি করা হয়েছে আজিজুল হককেই।
মুক্তাগাছা থানা-পুলিশ শুক্রবার বিকেলে ৫৪ ধারায় আজিজুল হককে গ্রেপ্তার দেখিয়ে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করে। সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ইকবাল হোসেন তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। আজিজুল হক মুক্তাগাছা উপজেলার কাশিমপুর ইউনিয়নের ঝনকা বড়টেঙ্গর গ্রামের মো. ইব্রাহিমের ছেলে।
আজিজুল জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে ডয়চে ভেলেকে জানিয়েছেন মুক্তাগাছা উপজেলা জামায়াতের আমির শামসুল হক। তিনি বলেন, ‘আজিজুলের কোনো পদ নেই, তিনি নির্বাচনের সময় আমাদের সঙ্গে কাজ করেছেন। আমাদের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তিনি নিয়মিত অংশ নিতেন।’
মামলা হওয়ার আগেই গ্রেপ্তার
মুক্তাগাছা থানার ওসি মো. লুৎফর রহমান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘একজন মানুষ যেহেতু অপরাধ করেছেন, সেটা আমরা নিশ্চিত হওয়ার পর মামলার জন্য অপেক্ষা করার প্রয়োজন হয় না। আমরা তখনই তাকে ধরতে পারি। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে অপপ্রচার চালিয়েছেন। যেহেতু তখন পর্যন্ত মামলা হয়নি তাই আমরা তাকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়েছি। পরদিন মামলা হওয়ার পর ওই মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।’
এই ঘটনায় কি বিএনপির পক্ষ থেকে কোনো চাপ দেওয়া হয়েছে? বা কোনো ধরনের মব সৃষ্টির আশঙ্কা ছিল? জানতে চাইলে ওসি লুৎফর রহমান বলেন, ‘আমাদের কেউ চাপ দেয়নি। বিষয়টি আমরা জানার পরই তাকে গ্রেপ্তার করেছি।’
তবে স্থানীয় একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে ডয়চে ভেলের কথা হয়েছে। তারা জানিয়েছেন, বিএনপির পক্ষ থেকে সরাসরি চাপ দেওয়া না হলেও উত্তেজনা তৈরি করা হয়েছিল। ফলে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত তাকে গ্রেপ্তার করেছে।
আসলেই কি ঘটেছিল
আজিজুল হক আসলেই পোস্টটি শেয়ার করেছেন কি না জানতে চাইলে তার চাচাতো ভাই কাশিমপুর ইউনিয়ন জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক ফয়জুর রহমান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘গ্রেপ্তারের আগে আজিজুলের সঙ্গে এ ব্যাপারে আমার কথা হয়েছে। তিনি আমাকে বলেছেন, ওই দিন তার কাছ থেকে ফোনে কথা বলার নাম করে একজন ফোনটি কিছু সময়ের জন্য নিয়েছিল। আজিজুল লেখাপড়া জানে না, অত বেশি ফেসবুকও চালাতে পারে না। এর মধ্যে এই ঘটনা ঘটেছে। আজিজুল নিজে ওই পোস্ট শেয়ার করেননি বলে আমাকে বলেছেন।’
তবে মামলার বাদী মো. ফজলু ডয়চে ভেলেকে বলেছেন, ‘শুধু এই পোস্ট নয়, এর আগে আজিজুল এই ধরনের বহু পোস্ট শেয়ার করেছে। আমি একজন সচেতন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে মামলা করেছি।’
দলীয় সিদ্ধান্তে এই মামলা করেছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করেই মামলা করেছি। মামলার পর বিএনপি বা সরকারের কেউ আমার সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো যোগাযোগ করেনি।’
মুক্তাগাছা উপজেলা জামায়াতের আমির শামসুল হক বলেন, ‘আজিজুল নিজে এই পোস্ট শেয়ার দেয়নি বলে আমাদের বলেছে।’ ওইদিন রাতেই জামায়াতের নেতাকর্মীরা থানা ঘেরাও করেছিল কেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘জামায়াতের নেতাকর্মীরা থানা ঘেরাও করেনি, বরং গ্রেপ্তারের বিষয়ে জানতে তারা থানায় গিয়েছিল।’
প্রতিক্রিয়া
মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আমরা এই ধরনের ঘটনায় বহু মানুষকে গ্রেপ্তার হতে দেখেছি। তখন আমরা এর প্রতিবাদও করেছি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নিজেই তো নিজের ব্যাঙ্গাত্মক কার্টুন শেয়ার করে কার্টুনিস্টদের কার্টুন আঁকার আহবান জানিয়েছেন। অনেক কিছুতেই আমরা তাকে সহনশীল আচরণ করতে দেখছি। তাহলে এক্ষেত্রে কেন এত দ্রুত তাকে গ্রেপ্তার করতে হলো? আর যে অপরাধ করেছে, তাকে জেলেই পাঠাতে হবে কেন? বিষয়টি সরকারের খতিয়ে দেখা উচিত? অতিউৎসাহী হয়ে কেউ এই ধরনের কাজ করে থাকলে এখনই তাদের থামাতে হবে। না হলে আমরা আবার সেই পুরনো অবস্থায় ফিরে যাব।’
এই বিষয় বিএনপির সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘সবকিছু দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখা ঠিক না। এখন সরকার হয়েছে। সরকারের নির্দিষ্ট দায়িত্বে ব্যক্তিরা আছেন। এগুলো তারা দেখবেন। দলের এখানে দেখার কিছু নেই।’
আর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রেসসচিব ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘বর্তমান সরকার মত প্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে। সরকারের কোনো কাজে যে কেউ সমালোচনা করতে পারেন। এতে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু মত প্রকাশ কি সীমাহীন? যা ইচ্ছে তাই করা যায় কি না? এখন কেউ যদি সরকারের সমালোচনা করে ব্যাঙ্গাত্মক কার্টুন করেন, রিপোর্ট করেন, সেটা তিনি করতেই পারেন। এটা সারা বিশ্বেই হয়। কিন্তু একজন ব্যক্তি, তিনি প্রধানমন্ত্রী হন বা একজন সাধারণ নাগরিক, তার সঙ্গে একজন অর্ধনগ্ন নারীর ছবি জুড়ে দিয়ে ফেসবুকে পোস্ট করা তো মত প্রকাশ হতে পারে না। যিনি এটা করেছেন তিনি যদি রাজনৈতিক কর্মী হন তাহলে অন্যভাবে ভাববার সুযোগ আছে। কারণ সেটা শুধু মত প্রকাশ মনে হয় না। ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় যে ঘটনাটি ঘটেছে সেটার ব্যাপারে সরকারের রাজনৈতিক কোনো সিদ্ধান্ত নেই। সেখানে প্রশাসন তার নিজের মতো করে আইনের প্রয়োগ করেছে। আইন তো নিজস্ব গতিতে চলবে।’ সূত্র: ডয়চে ভেলে