বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের রেকর্ড ভবন নির্মাণ প্রকল্পে অনুমোদন ছাড়া কাজ আটটি প্যাকেজে ভাগ করে দরপত্র আহ্বান এবং কাজের বাস্তব অস্তিত্ব না থাকা সত্ত্বেও বিল পরিশোধের মাধ্যমে প্রায় ৬ কোটি ৩২ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
বুধবার ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৪ কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা, কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ ও সরেজমিন তদন্তের পর এ তথ্য পায় দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিম। দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) মো. তানজির আহমেদ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
দুদক জানায়, ‘বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের জন্য রেকর্ড ভবন নির্মাণ (১ম সংশোধিত)’ প্রকল্পের মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ২,৭৯৫ কোটি ৮৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা। প্রকল্পটির মূলধন অংশের ‘অনাবাসিক ভবন’ খাতে সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিট/সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট কমিটি (সিসিজিপি) অনুমোদিত একমাত্র ডব্লিউ-১ প্যাকেজের কার্যাদেশ ২০২৩ সালের ১৬ নভেম্বর ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডকে (এনডিইএল) দেওয়া হয়। এর মূল্য ছিল ১,৫৫৭ কোটি ৪ লাখ টাকা। ডিপিপি, আরডিপিপি কিংবা হেড অব দ্য প্রকিউরিং এনটিটি (হোপ)-এর অনুমোদন ছাড়াই একই খাতের কাজ আরও আটটি পৃথক প্যাকেজে ভাগ করে ই-জিপির মাধ্যমে দরপত্র আহ্বান করা হয়। এসব প্যাকেজের কার্যাদেশ দেওয়া হয় কামরুল এন্টারপ্রাইজ, মিম্পা এন্টারপ্রাইজ, আরএস এন্টারপ্রাইজ, গ্রাম বাংলা, গোমতি এন্টারপ্রাইজ, রশা ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, কর্ণফুলী কনস্ট্রাকশন ও শোধেষ ডেভেলপমেন্ট নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে। এই আট প্যাকেজের বিপরীতে মোট ৬ কোটি ৩১ লাখ ৩৮ হাজার টাকা বিল পরিশোধ করা হয়। তবে দুদকের প্রতিবেদনে অর্থের পরিমাণ বেতন বিলের প্রতিবেদনে ৬ কোটি ৩১ লাখ ৯৭ হাজার টাকা হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে।
দুদকের সরেজমিন তদন্ত ও নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, আট প্যাকেজের মধ্যে নির্মাণকাজ উদ্বোধন উপলক্ষে অতিথি আপ্যায়নের জন্য ভেন্যু সংস্কার, ব্র্যান্ডিং ও ক্যাটারিং; ভাঙা গাইড ওয়াল, মাস্টার ড্রেন, র্যাম্প, হাই-টেনশন কেবল লাইন অপসারণ; অ্যাপ্রোচ রোড নির্মাণ এবং অস্থায়ী ড্রেন ও সিআই শিট বেড়া নির্মাণ—এই চার প্রকল্পের কাজের কোনো ভৌত অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এসব কাজের জন্য সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিপত্র বা মেজারমেন্ট বুকও পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, ঢাকা-এ জাজেস স্পোর্টস কমপ্লেক্সের পাশে নতুন বেকারি নির্মাণ; বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, ঢাকা-এ জাজেস স্পোর্টস কমপ্লেক্সের পাশে নতুন ক্যান্টিন নির্মাণ; সুপ্রিম কোর্ট রেকর্ড ভবনের তিনটি বেসমেন্ট ফ্লোর নির্মাণের জন্য অস্থায়ী ট্রিপল ওয়ার্ক স্থাপন এবং বালু ভরাট, বৃষ্টির পানি অপসারণ, ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার—এই চারটি প্যাকেজে কাজের অস্তিত্ব পাওয়া গেলেও সেগুলো প্রকৃতপক্ষে মূল ঠিকাদার এনডিইএলই সম্পাদন করেছে বলে দুদকের কাছে দেওয়া নির্বাহী প্রকৌশলীর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এনডিইএলের সঙ্গে সম্পাদিত মূল চুক্তি ও মেজারমেন্ট বুক পর্যালোচনা করেও এর সত্যতা পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে দুদক।
দুদক জানায়, আটটি প্যাকেজের মধ্যে অ্যাপ্রোচ রোড নির্মাণ প্যাকেজটির মূল্য ছিল ১ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। অর্থ বিভাগের ২০১৫ সালের ১৬ জানুয়ারির ক্ষমতা অর্পণসংক্রান্ত আদেশ অনুযায়ী ১ কোটি থেকে ৩ কোটি টাকা মূল্যমানের দর অনুমোদনের ক্ষমতা তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর। কিন্তু এ প্যাকেজের দর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর যথাযথ অনুমোদন ছাড়াই অনুমোদিত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়েছে। দুদক আরও জানায়, মূল ডব্লিউ-১ প্যাকেজের সিভিল কাজ অনুমোদিত ডিপিপি, আরডিপিপি বা হোপ-এর বিধি লঙ্ঘন করে আটটি প্যাকেজে বিভক্ত করা হয়। পরে ই-জিপির মাধ্যমে এসব কাজের দরপত্র আহ্বান করে বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে বিল পরিশোধ করা হয়। এর মধ্যে অন্তত চারটি প্যাকেজে কাজের বাস্তব অস্তিত্ব না থাকায় সরকারি অর্থের ক্ষতি ও আত্মসাতের অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এ ঘটনায় মূলত তৎকালীন ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৪-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাইফুজ্জামানকে দায়ী করা হয়েছে।