চলতি সপ্তাহের শেষের দিকে দেশের উপর আরেকটি মৌসুমী বৃষ্টি বলয় আসছে, যা দেশজুড়ে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। এতে দেশের উপকূলীয় এলাকাসহ সারাদেশে ১৬ জুলাই থেকে সপ্তাহজুড়ে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। আসন্ন বৃষ্টিবলয়ে বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন দেশের আবহাওয়াবিদ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও।
আবহাওয়া দপ্তর কর্মকর্তারা জানান, মৌসুমি বায়ুর বর্ধিতাংশের অক্ষ পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তর প্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চল হয়ে আসাম পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। এর একটি বর্ধিতাংশ উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের উপর সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে মাঝারী অবস্থায় বিরাজমান আছে। এটি আরো শক্তিশালী হয়ে আগামী বৃহস্পতিবার থেকে টানা কয়েকদিন দেশের উপকূলীয় এলাকাসহ সারাদেশে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টি ঝরাতে পারে। এতে দেশের নদনদীর পানি বেড়ে বন্যা পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে বেসরকারি সংস্থা বাংলাদেশ ওয়েদার অবজারভেটরি টিম ১৭ থেকে ২৪ জুলাই আভাস পূর্বাভাসে জানিয়েছে, দেশের আবহাওয়ায় আগামী এক সপ্তাহে বৈচিত্র্যময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। সপ্তাহের শুরুতে দেশের আকাশ আংশিক মেঘলা ও পরে মেঘাচ্ছন্ন থাকতে পারে। খুলনা ও রাজশাহী বিভাগে সাময়িক মৃদু তাপপ্রবাহের পাশাপাশি দেশের অন্যান্য স্থানে ভ্যাপসা গরম অনুভূত হতে পারে।
এ সপ্তাহে দেশে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগে বেশি বৃষ্টি হতে পারে এবং উপকূলীয় এলাকায় ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের আশঙ্কা রয়েছে। একটি সক্রিয় মৌসুমী বৃষ্টি বলয় ও সিস্টেমের প্রভাবে সাগর কিছুটা উত্তাল থাকতে পারে এবং সপ্তাহের শেষ দিকে সতর্ক সংকেত জারির সম্ভাবনা রয়েছে।
টানা বৃষ্টির কারণে দেশের উজানে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে কোথাও কোথাও বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে। এছাড়া শেষ দিকে সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায় পাহাড়ধ্বসের ঝুঁকি রয়েছে এবং উত্তর অঞ্চলে মাঝারি বজ্রপাতের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে গতকাল দুপুরে আবহাওয়া ড. আবুল কালাম মল্লিক আমার দেশকে বলেন, বৃষ্টিপাতের প্রবণতা পূর্ব-দক্ষিণাঞ্চল থেকে কমে মধ্য-উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের দিকে যাচ্ছে। এরফলে সিলেট-চট্টগ্রামের দিকে বৃষ্টি কমে ঢাকা-ময়মনসিংহ, রাজশাহী রংপুর, খুলনা ও বরিশালের দিকে বৃষ্টি বেশি হচ্ছে। আগের কয়েকদিনের তুলনায় আগামী ২-৩দিন বৃষ্টিপাতের প্রবণতা কিছুটা কমলেও আগামী বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) থেকে টানা কয়েকদিন দেশের উপকূলীয় এলাকাসহ সারাদেশে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টি হতে পারে।
তবে আবহাওয়াবিদ ড. বজলুর রশিদ আমার দেশকে বলেন, সোমবার সকাল থেকে একটা দুপুর পর্যন্ত রাজধানীতে ৪০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া ২৪ ঘন্টায় কুমিল্লায় সর্বোচ্চ ১৩৭, বগুড়ায় ১০৮ ফরিদপুরে ৮৯ ও চ্টগ্রামে ৯৬ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছেভ তিনি জানান, দেশের মধ্য উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলসহ ঢাকায় আরও ২-১ দিন এমন বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। এরপর ২-৩ দিন বৃষ্টির মাত্রা কিছুটা কমলেও আবারো ১৮ কিংবা ১৯ জুলাইয়ের পর থেকে বৃষ্টিপাত পুনরায় বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এবারের বৃষ্টিপাতকে ‘অস্বাভাবিক’ হিসেবে উল্লেখ করে এই আবহাওয়াবিদ বলছেন, এল নিনোর প্রভাবে এবার স্বল্প সময়ে অধিক বৃষ্টিপাতের কারণে পরিস্থিতি নাজুক হচ্ছে। ফলে সামনে পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায় তা বলা মুশকিল। এ নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
এ প্রসঙ্গে সোমবার সন্ধ্যায় পাউবোর বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান আমার দেশকে বলেন, বর্তমানে দেশের সিলেট সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোণা এই তিনটি জেলা বন্যায় আক্রান্ত। তবে আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘন্টার মধ্যে ময়মনসিংহ, শেরপুর, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, রংপুর ও লালমনিরহাট জেলা বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
তিনি আরো বলেন, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলে উন্নতি হলেও দেশের মধ্য ও উত্তর- পূর্বাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদী বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ভারী বৃষ্টিপাতের প্রভাবে তিস্তা অববাহিকায়ও বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তবে ৪৮ ঘন্টা পর উত্তর- পূর্বাঞ্চলেও পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
গতকাল বিকালে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের পূর্বাভাসে বলা হয়, সুনামগঞ্জের সুরমা নদীর ছাতক পয়েন্টে; একই জেলার কুশিয়ারা নদীর মারকুলি ও সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে; নেত্রকোণার সোমেশ্বরী নদী কলমাকান্দা পয়েন্টে বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘন্টায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা, শেরপুর ও ময়মনসিংহ; উত্তরাঞ্চলীয় নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদী বন্যা পরিস্থিতির উদ্ভব অথবা কিছুটা অবনতি হতে পারে।
অন্যদিকে আগামী ২৪ ঘণ্টায় বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার সাঙ্গু, মাতামুহুরী নদী সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলসমূহে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি অব্যাহত থাকতে পারে।
বন্যায় ৭ জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত ১০ লাখ, স্বাস্থ্যসেবা সচল রাখতে সরকারের সর্বোচ্চ প্রস্তুতি
দেশের বিভিন্ন এলাকায় টানা অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় সাতটি জেলায় ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত বন্যায় ৫১ জন নিহত এবং ৩৯ জন আহত হয়েছেন। বর্তমানে ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮টি পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে।
আক্রান্ত জেলাগুলোর মধ্যে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। দুর্গত মানুষের জন্য ১ হাজার ১৩১টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে, যেখানে ৪৪ হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় গত ৭ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোর জন্য ২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা এবং ৩ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন চাল নগদ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবীদের সমন্বয়ে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
এদিকে বন্যাকবলিত এলাকায় চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ফেনী, কুমিল্লাসহ ঝুঁকিপূর্ণ ১১টি জেলায় বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চালু করা হয়েছে এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল করে মাঠে থাকা নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রতিটি জেলার সার্বিক পরিস্থিতি তদারকির জন্য একজন করে জ্যেষ্ঠ চিকিৎসককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হাসপাতালে পর্যাপ্ত ওষুধ ও স্যালাইন প্রস্তুত রয়েছে। পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধে ওআরএস ও পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করা হচ্ছে। জেলা পর্যায়ে ২১ হাজার ভায়াল অ্যান্টিভেনম সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং দ্রুত আরও ২৫ হাজার ভায়াল যুক্ত হবে। ইতিমধ্যে সাপে কাটা ৯৫ জন রোগী চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন। জরুরি পরামর্শের জন্য জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা কল সেন্টার ১৬২৬৩ সার্বক্ষণিক সচল রয়েছে।