হোম > জাতীয়

সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রস্তাব নিয়ে সংসদ উত্তপ্ত

সংসদ রিপোর্টার

সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা আহ্বান প্রশ্নে জাতীয় সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে তুমুল বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সংসদে বিরোধী দলের তোলা মুলতবি প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে দুই দলের সংসদ সদস্যরা নিজেদের পক্ষে যুক্তি-তর্ক তুলে ধরেছেন। সংবিধান ও আইনের আলোকে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ও গণভোটের পক্ষে-বিপক্ষে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছেন। গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে দুই ঘণ্টার বেশি সময় ধরে বিতর্ক হলেও কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। স্পিকার দুই দলের আলোচনাকে প্রাণবন্ত বলে উল্লেখ করেছেন।

জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের উত্থাপিত ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদের আহ্বান’ বিষয়ক মুলতবি প্রস্তাব নিয়ে গতকাল পূর্বনির্ধারিত এ আলোচনাটি অনুষ্ঠিত হয়। বিরোধীদলীয় নেতাসহ জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির ৮ জন সংসদ সদস্য আলোচনায় অংশ নেন। অপরদিকে সরকার পক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান ও শরিক দলের এমপি বিজেপির আন্দালিব রহমান পার্থ আলোচনায় অংশ নেন। এ সময় সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উপস্থিত ছিলেন। বিরোধীদলীয় এমপিদের বক্তব্যে কড়া জবাব দেওয়ায় আন্দালিব রহমান পার্থকে পিঠ চাপড়িয়ে বাহবাও দেন সংসদ নেতা।

রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনা স্থগিত রেখে গতকাল মুলতবি প্রস্তাবের আলোচনা হয়। বিকাল পৌনে পাঁচটায় শুরু হয়ে মাগরিবের নামাজের বিরতিসহ রাত পৌনে ৯টা পর্যন্ত আলোচনা চলে। এতে ১১ জন সংসদ সদস্য আলোচনায় অংশ নেন। এতে বিরোধী দলের বেশি সংখ্যক সদস্য অংশ নিলেও দুই দলকে প্রায় সমান সময় দেওয়া হয়। এর আগে বিরোধীদলীয় নেতা গত ২৯ নভেম্বর সংসদে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান সংক্রান্ত ৬২ বিধির মুলতবি প্রস্তাব তোলেন। স্পিকার ওই প্রস্তাব গ্রহণ করে ৩১ মার্চ দিনের শেষ কার্যসূচি হিসেবে আলোচনার সময় নির্ধারণ করেন।

আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জুলাই সংস্কার আদেশকে অন্তহীন প্রতারণার দলিল বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি দাবি করেন, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ কোনো বৈধ আইন নয়। রাষ্ট্রপতির এ আদেশ দেওয়ার এখতিয়ার নেই। তাই সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কোনো সুযোগ নেই।

অপরদিকে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান কারো নাম উল্লেখ না করে বলেন, রাষ্ট্রপতির এখতিয়ার নিয়ে কথা বলতে গেলে অতীতের সম্মানীয় ব্যক্তিদের অশ্রদ্ধা জানাতে হবে। আমরা সেটা করতে চাই না। এ আদেশকে অন্তহীন প্রতারণা বলা হলেও সরকারি দলের ইচ্ছাতে গণভোট ও সংসদ নির্বাচন একইদিনে হয়েছে। ওই সময় তারা এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারকে অভিনন্দনও জানিয়েছিলেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থান রাষ্ট্রপতিকে এ আদেশ জারির এখতিয়ার দিয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

আলোচনাকালে সরকারি দলের পক্ষ থেকে সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে একটি সর্বদলীয় বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। প্রস্তাবটি সংসদ নেতার পক্ষ থেকে বলেও উল্লেখ করা হয়। অপরদিকে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সংবিধান সংস্কার কমিশনের সভা আহ্বান বিষয়ে দুই দলের সমান সংখ্যক প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। দুই দলের পক্ষ থেকে পাল্টাপাল্টি কমিটি গঠনের প্রস্তাব এলেও স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি।

প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, আমরা কোনো দল নয়, জনগণের অভিপ্রায়ে এখানে উপস্থিত হয়েছি। আজকের এই প্রস্তাব উত্থাপন করেছি। আন্দালিভ রহমান পার্থ ফায়ার করেছেন। কিন্তু তার কিছু ফায়ার ব্যাক ফ্যায়ার করেছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য খণ্ডন করে জামায়াতের আমির বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ৭৩ সালের পরে কোনো অর্ডার আইন নয়। কিন্তু এর পরেও বহু অর্ডার আইনে রূপ নিয়েছে। এ বিষয়ে নিয়ে কথা বলে সেই সম্মানিত ব্যক্তিদের প্রতি অশ্রদ্ধা জানাতে চাই না। কাউকে আক্রমণ করে কথা বলতে চাই না। সংবিধান ও আইন মানুষের জন্য। আইন কিংবা সংবিধানের জন্য জনগণ নয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য খণ্ডন করে তিনি আরো বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই আদেশকে অন্তহীন প্রতারণা বলেছেন। বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার ও রাষ্ট্রপতি মিলে এটা করেছেন। এটা তো হয়েছে নভেম্বর মাসের ১৩ তারিখে। আর ভোট হয়েছে ২৬-এর ১২ ফেব্রুয়ারি। তাদের দাবির কারণে সংসদ ও গণভোট একই দিনে হওয়ায় সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তার মানে গণভোট তাদেরও দাবি ছিলো। গণভোটে কী কী বিষয় অন্তর্ভুক্ত হবে, তা কিন্তু আগেই নির্বাচন কমিশন ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছে। এই সব কিছু দেখে শুনে আমিও বলেছি, প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন, গণভোটে হ্যাঁ বলুন। তাহলে দোষটা কোথায়? আর আমাদের মধ্যে বিভক্তি কোথায়? আমরা তো এক হয়ে করেছি।

গণভোট ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা আহ্বান প্রশ্নে বিরোধী দলের অবস্থানের কথা তুলে ধরে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, আমরা আমাদের জায়গায় আছি। জায়গা পরিবর্তন করিনি। জনগণের কাছে বিষয়টি ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। বেশিরভাগ জনগণ এটি সমর্থন করেছে। এখন মানার প্রশ্ন। এটাকে অসাংবিধানিক বলি, তাহলে অতীতের অনেক গণভোট নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। আমরা সেদিকে যাব না। সংবিধান বহির্ভূত অনেক কাজই তো হয়েছে। দেশ ও জনগণের প্রয়োজনে আমরা কেউ আপত্তি করিনি। আজ এই শপথটা নিয়ে সংকট তৈরি করা না হলে আলোচনার দরকারটাই ছিল না।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, সংস্কার পরিষদের নির্বাচনের জন্য কোনো ব্যালট ছিল না। গণভোটের ব্যালটই হচ্ছে সেই ব্যালট। এখানের অনেকেই সংস্কার কমিশনে ছিলেন। তারাই এটা তৈরি করেছেন। আজকে তারা নিজেদের তৈরি করা জিনিসের বিরোধিতা করতে পারেন না।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রস্তাবের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আজকের এই আলোচনাটা হচ্ছে সংস্কারের ওপর, সংস্কার পরিষদের ওপর, এর সভা আহ্বানের ওপর। তিনি যদি প্রস্তাব দিতেন, সংস্কার নিয়ে যে আলোচনা হলো, এটাকে একটি বিশেষ জায়গায় পৌঁছানোর জন্য আমরা বিশেষ কমিটি গঠন করি। তাহলে সেটা বিবেচনার বিষয় হতে পারে। আমরা এটাকে ইতিবাচকভাবে দেখতে পারি। কারণ আমরা সংকট তৈরির জন্য আসেনি। দেশের মানুষের সংকট নিরসনের জন্য এখানে এসেছি।

জনগণ গণভোটকে গ্রহণ করে নিয়েছে দাবি করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, আমরাও গ্রহণ করার মাধ্যমে জনগণকে সম্মান করলে এই সংসদ সম্মানিত হবে। আমরা একলাইনে, সরকারি দল আরেক লাইনে চলতেই থাকলাম- এর মাধ্যমে সমাধান কীভাবে হবে?

স্পিকারকে উদ্দেশ্য করে শফিকুর রহমান বলেন, আমরা সমাধান চাই। ন্যায্যতার ভিত্তিতে চাই। যে বিষয়ের ওপর আলোচনা হয়েছে তার ওপর আপনি উত্তম মনে করলে একটি কমিটি গঠন করতে পারেন। তবে সেখানে আমাদের আহ্বান থাকবে দুইদিক থেকে সমান সংখ্যক সদস্য থাকবে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে কমিটি হলে, তাহলে এখানে যেমন বিতর্ক হচ্ছে সেখানেও তাই হবে। কোনো ফল আসবে না। আমরা আমাদের অভিপ্রায় তুলে ধরেছি। এখন সিদ্ধান্ত আপনার।

এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ- এটা বৈধ আইন নয়। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৯৭৩ সালের ৭ এপ্রিলের আগ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি এমন আদেশ জারি করতে পারতেন। ১৯৭৩ সালে প্রথম সংসদ গঠিত হওয়ার পর থেকে রাষ্ট্রপতির এই এখতিয়ার আর নেই। এই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ না অধ্যাদেশ, না আইন। এটি অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তহীন প্রতারণার দলিল। জোর করে কোন আইন গেলাতে পারেন না।

তিনি প্রশ্ন রাখেন, রাষ্ট্রপতি কিভাবে কোন বিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকবেন? যদি সংবিধান সংস্কার হয়ে যেত, সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথের ফরম থাকতো, কে শপথ পড়াবেন, নির্ধারিত হতো তারপর এই শপথের প্রশ্ন আসতে পারতো।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিএনপি সংস্কার চায় না, জুলাই সনদ মানে না এমন বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে। জুলাই সনদ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, তার প্রতিটি অক্ষর বিএনপি ধারণ করে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমি রাষ্ট্রপতির কাছে জানতে চেয়েছিলাম, তিনি এমন আদেশ জারি করতে পারেন কি না। জবাবে রাষ্ট্রপতি বলেছিলেন, আমি তো পারি না। আমাকে পারানো হচ্ছে। রাজহংসকে জোরপূর্বক স্বর্ণের ডিম পাড়তে বাধ্য করার মতো ঘটনা। এখন সেটা অবৈধ ডিম্ব হয়েছে।

বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী ১৮০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন বলেন, এটা যদি হয় সংসদের, জনগণের সুপ্রিমেসি কোথায়? পরবর্তী সংসদের এখতিয়ার খর্ব করতে পারে, সংসদকে বাধ্য করতে পারে এমন কোনো নজির পৃথিবীতে নেই।

তিনি বলেন, প্রশ্ন এসেছে ৭০ শতাংশ ভোটের কী হবে? এটার ফয়সালা হবে। এ ৭০ শতাংশ ভোট আসলে দেওয়ার দরকার ছিল জুলাই সনদের ওপর সমর্থন আছে কি না, সে বিষয়ের ওপর। তিনি বলেন, গণভোটের প্রশ্নে নোট অব ডিসেন্টের অংশ কোথায়? চারটা প্রশ্নের উত্তর একটা কেন দেওয়া হলো? এটাকে জাতীয় প্রতারণার দলিল হিসেবে আখ্যা দেন তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রপতির কোনো আদেশ সংসদের সার্বভৌমত্ব খর্ব করতে পারে না। সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংবিধানের বিধান পরিবর্তন হয় এমন কোনো অধ্যাদেশও রাষ্ট্রপতি জারি করতে পারেন না। জুলাই বাস্তবায়ন আদেশ অবৈধ, এখতিয়ার বহির্ভূত।

সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ পড়ানোর মাধ্যমে সিইসি শপথ ভঙ্গ করেছেন বলেও মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি বলেন, তারা জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অঙ্গীকারাবদ্ধ। জনগণ বিএনপির ইশতেহার সমর্থন করে ৫১ শতাংশ ম্যান্ডেট দিয়েছে। বিএনপি সরকারি দল বিরোধী দল সবাইকে সঙ্গে নিয়ে আলোচনার মধ্যমে সংবিধানের গণতান্ত্রিক সংশোধনী আনতে চায়।

এ সময় সংসদ নেতার পক্ষ থেকে একটি প্রস্তাব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব দল ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের সমন্বয়ে একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করার এবং সবাই মিলে আলোচনা করে সমঝোতার ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন বিল উত্থাপন করার প্রস্তাব দেন।

আলোচনায় অংশ নিয়ে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, এ অধ্যাদেশটি সংবিধানের সঙ্গে প্রতারণা। সংবিধানে যে ক্ষমতা দেওয়া নেই, সেটি প্রয়োগ করা হয়েছে। সংসদ সার্বভৌম। কোনো আইন দিয়ে বাধ্য করা যায় না। সংবিধানে আদেশ দেওয়ার কোনো ক্ষমতা নেই। যে ক্ষমতাবলে এনসিপির বর্তমান আহ্বায়ক উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নিয়েছেন, ওই ক্ষমতাবলে আমি অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেছি।

তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাবকে সমর্থন করেন। বিরোধী দলের ‘৫০-৫০’ সদস্য দাবির সমালোচনা করে তিনি বলেন, ২১৯ জন এমপির প্রতিনিধিরা ৫০ শতাংশ আর ৭৭ জনের প্রতিনিধিরা ৫০ শতাংশ পাবেন—এটা বৈষম্য। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রস্তাব অনুযায়ী একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হোক, যেখানে আমরা চুলচেরা বিশ্লেষণ করে জুলাই সনদের পথ ধরে এমন একটি সংশোধনী আনব, যা ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে থাকবে বলে জানান আইনমন্ত্রী।

জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, বিগত ১৭ বছর উন্নয়নের কথা বলে আমাদের নির্বাচনের কথা ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এখন নখের কালি (ভোটের অমোচনীয় কালী) শুকাতে না শুকাতেই উন্নয়নের কথা বলে জুলাই সনদকে ভুলিয়ে দিয়েছি। আমাদের সন্তানেরা কী একটা ফ্যামিলি কার্ডের জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়েছিল? আমরা যেন সংস্কারের কথাটা মাথায় নিতে পারছি না। সংস্কারের পরিবর্তে আমরা এখন সংশোধনের দিকে যাচ্ছি।

তিনি বলেন, ৫১ শতাংশ ফ্যামিলি কার্ডের পক্ষে ভোট দিয়েছেন আর ৭০ শতাংশ জুলাই সনদের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। আমরা সবার আগে বাংলাদেশ তো লক্ষ্য করছি না। সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদ প্রশাসক নিয়োগে কি আমরা সরকারি দলের বাইরে একটা যোগ্য লোককেও খুঁজে পেলাম না?

জামায়াতের এই এমপি বলেন, সরকারি দল থেকে বলা হয় আমাদের (সংবিধান সংস্কার পরিষদের) শপথ নাকি অবৈধ হয়েছে। এটা যদি অবৈধ হয়, তাহলে শপথের জন্য যারা কাগজ উপস্থাপন করেছে তাদেরকে আগে আইনের আওতায় আনা উচিত।

আলোচনায় এনসিপির সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, আমরা কোন প্রেক্ষাপটের মধ্য দিয়ে আজকের এই সংসদে এসেছি? ৫ আগস্ট থেকে নিয়ে ৮ আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশে কোনো সরকার ছিল না। সেই সময়টাতে বাংলাদেশের সংবিধান কতটুকু কার্যকর ছিল? সেই ব্যাপারে কি আমরা খোঁজখবর রেখেছি?

আখতার হোসেন বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের একটা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল রাষ্ট্র কাঠামোটাকে সংস্কার করা। রাষ্ট্র কাঠামোকে বারংবার একটা ফ্যাসিবাদীর যাঁতাকলে পিষ্ট করা হয়েছিল। সেই লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়টাতে ঐক্যমত্য কমিশন গঠিত হয়।

ঐকমত্য কমিশনের আলোচনার কথা তুলে ধরে এনসিপির সদস্য সচিব বলেন, এখন যারা সরকারি দলের বেঞ্চে বসে আছেন, তারা ঐক্যমত্য কমিশনে উপস্থিত হয়েছিলেন। ঐক্যমত্য কমিশনে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ব্যাপারে সকলের মধ্যে আলোচনা হয়েছিল। সেই আলোচনার প্রসঙ্গ তারা সংসদে এসে কিভাবে ভুলে গেলেন, সেটা আমি তাদের কাছে জানতে চাই।

তিনি বলেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রী রংপুরে আবু সাঈদের জন্মভূমিতে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন দয়া করে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ দিন। দয়া করে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ দেওয়ার কথা বলে তারা এখন এসে গণভোটের রায় মানতে কেন চান না সেই প্রশ্নটা আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে করতে চাই। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশের পক্ষে জনগণ রায় দিয়েছে। জনগণের রায়কে অসাংবিধানিক বলা ধৃষ্টতাপূর্ণ, সংসদকে কলঙ্কিত করা। গণভোট অধ্যাদেশ সংসদে অনুমোদন করা হোক না হোক গণভোটকে অবৈধ করার কোনো সুযোগ নেই।

বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান ভোলা-১ আসনের সংসদ সদস্য আন্দালিভ রহমান বলেন, আমাদের জুলাইয়ের বিরুদ্ধে নিয়ে যাওয়ার একটা পায়তারা দেখতে পাচ্ছি। আপনারা কোন প্রক্রিয়ায় করতে চাচ্ছেন? আমাদের নোট অব ডিসেন্ট (আপত্তি) আগে থেকেই দেওয়া। আপনারা সে সময় বিপ্লবী সরকার করেননি কেন? সাধারণ সরকারে গেলেন কেন? অন্তর্বর্তীকালীন বিপ্লবী সরকার করতেন। ছিড়ে ফেলে দিতেন সংবিধানকে। নতুন করে সংবিধান বানাতেন।

সংবিধান সংস্কার পরিষদের কোথা হতে আসছে এমন প্রশ্ন তুলে আন্দালিভ রহমান বলেন, সচরাচর যেভাবে সংবিধান পরিবর্তন হয়, আমরা সেভাবে করব। আপনারা বসেন, সেগুলো নিয়ে কথা বলি। গণভোটে ৭০ শতাংশ হ্যাঁ ভোট পড়লেও, সংবিধান পরিবর্তনের জন্য ৫১ শতাংশ তাদের (বিএনপি জোট) দিয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে শ্রদ্ধা করেন জানিয়ে তিনি বলেন, সংবিধানকে ছুড়ে ফেলব কেন? সংবিধান কি মনে করিয়ে দেয় একাত্তরের পরাজয়ের দলিল। আমি সংবিধান কেন ছুড়ে ফেলে দেব? এই সংবিধান দিলে গাত্রদাহ কেন হবে?

এনসিপির হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, সংবিধানকে যারা ছুড়ে ফেলতে চান তাদেরকে স্বাধীনতাবিরোধী ট্যাগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়াকে অপমান করা হয়েছে কী না ভেবে দেখতে হবে।

আন্দালিভ রহমানের বক্তব্যের জবাবে তিনি বলেন, এই সংবিধানের কিছু অংশ তারা মেনেছেন, কিছু অংশ মানেননি। মানে যে অংশটা তাদের পক্ষে গেছে ওটাই মেনেছেন। যেটা বিপক্ষে গেছে তা মানেননি। তারা কখনো সাংবিধানিক, কখনো অসাংবিধানিক। এই সংবিধান মানতে গেলে অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। ছাত্রজনতার রায়ের মধ্য দিয়ে বেগম জিয়াকে কাোগার থেকে বের করা হয়েছিল।

গাং পার হলে মাঝি কোন দুলাভাই- এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, গত ১৭ বছর আপনাদের ধানক্ষেতে ঘুমাতে হয়েছে। মহাসচিব কান্না করে বলেছেন, তাদের নেতাকর্মীরা ঢাকায় এসে রিকশা চালিয়ে জীবন নির্বাহ করেছে। লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মী রক্ত দিয়েছেন। ফ্যাসিবাদবিরোধী প্রতিটি দলের রক্ত শ্রম ও ঘামের মধ্য দিয়ে হাসিনার পতন হয়েছে। গণরায় কখনো কেতাবের কাছে মাথা নত করে না। এটা ভ্যাটিক্যান সিটি নয় যে, গসপিয়াল অনুযায়ী পরিচালিত হবে। ৬৮ শতাংশ ভোটার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছেন এই সংবিধানের মৌলিক কোন জায়গায় পরিবর্তন আনতে হবে।

ঢাকা-১২ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সাইফুল আলম খান তার বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর নাম ধরে যে কথা বলেছেন, তা এক্সপাঞ্জ করার দাবি তোলেন।

জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান বলেন, সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির এ আদেশ আইন। এটি জারির এখতিয়ার রাষ্ট্রপতির আছে। গণঅভ্যুত্থান এ এখতিয়ার দিয়েছে। কোনো আইন অবৈধ কি না সেটা বলার এখতিয়ার আছে হাইকোর্টের। অন্য কেউ কোনো আইনকে অবৈধ বলতে পারে না। তিনি বলেন, সরকারকে বলতে হবে জুলাইকে তারা বিপ্লব হিসেবে স্বীকার করে কি না। সংস্কার না সংশোধন এ প্রশ্নে বলেন, জুলাই সনদে যেসব প্রস্তাব আছে সেগুলো সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা যাবে না। এজন্য দরকার হবে সংবিধান সংস্কার পরিষদ।

জুলাই সনদ না আইন না অধ্যাদেশ—এ বিষয়ে নাজিবুর বলেন, এ আদেশের বৈধতা নিয়ে আদালতে রিট আমলে নিয়ে রুল হয়েছে। এটা আইন না হলে চ্যালেঞ্জ করে রিট হওয়ার কথা নয়। তিনি বলেন, জনগণের আবেগ হলো সংবিধানের বাবা।

সিরাজগঞ্জ-৪ আসনের রফিকুল ইসলাম খান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার সংবিধানে নেই। এটা জনগণের আকাঙ্ক্ষায় গঠিত হয়েছিল। এর অর্থ অনেক কিছু সংবিধান ছাড়াই চলেছে। এর আগে যত গণভোট হয়েছে তার কোনোটিই সংবিধানে ছিলো না। সংবিধান সংস্কারের রায় থেকে বিরত থাকাকে সমীচীন মনে করি না। সংবিধান কুরআনের বাণী নয়। জনগণের জন্য সংবিধান। সংবিধানের জন্য জনগণ নয়।

বাংলাদেশের ৬ জাহাজকে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার অনুমতি ইরানের

লালমনিরহাটে বিমানবন্দর চালুর পরিকল্পনা

ভারত সফরে যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, যেসব বিষয়ে আলোচনা

মার্চে ৪৭ নারী হত্যা, ধর্ষণ ৫৭: মহিলা পরিষদ

গণভোটে হ্যাঁ ভোট দিতে জনগণকে বাধ্য করা হয়েছে: পার্থ

বৃষ্টির বিরতিতে সারাদেশে ভ্যাপসা গরম বাড়বে

সিইসি শপথ ভঙ্গ করেছেন: সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

শহীদ মীর মুগ্ধের বাবার খোঁজখবর নিলেন প্রধানমন্ত্রী

সমাজে পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব নারীর সৃষ্টিশীল শক্তিকে বাধাগ্রস্ত করছে: তথ্যমন্ত্রী

২ লাখ ৬০ হাজার টন জ্বালানি তেল কিনবে সরকার