দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টিপাত বাড়ার সাথেসাথে বজ্রপাতের ঘটনাও বৃদ্ধি পেয়েছে। গত দুইদিনে দেশের নয় জেলায় বজ্রপাতে অন্তত ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন। চলতি বছর টানা দুইদিনে এই দুর্যোগে প্রাণহানির এটাই সর্বাধিক রেকর্ড। গতকাল রোববার দেশে সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা ঘটে ১৪ জনের। এর মধ্যে আজ সোমবার নেত্রকোণা ও হবিগঞ্জ তিনজন করে, বগুড়া দুই এবং হাতিয়ায় একসহ মোট ৯ জন নিহত হন।
আমার দেশ প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে, গতকাল বোরবার সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে গাইবান্ধা জেলায়, যেখানে শিশুসহ পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়াও জামালপুর, সিরাজগঞ্জ দুইজন করে এবং নাটোর, পঞ্চগড়, বগুড়া ও শেরপুর জেলায় একজন করে নিহত হয়েছেন।
নতুন সতর্কবার্তায় জনমনে আতঙ্ক
কালবৈশাখী ঝড় ও বজ্রপাত নিয়ে আগামী দুইদিনের সতর্কবার্তা জারি করেছে আবহাওয়া দপ্তর। সেই সাথে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির পূর্বাভাসও দেওয়া হয়েছে। ফলে কালবৈশাখী ঝড়ের সঙ্গে বজ্রপাতের সতর্কবার্তায় জনমনে আতঙ্ক বাড়ছে। বজ্রপাতের আশঙ্কা দেখা দিলেই নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই বলে আমার দেশকে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক।
সোমবার আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হক স্বাক্ষরিত সতর্কবার্তায় বলা হয়, বেলা ১১টা থেকে পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের উপর দিয়ে বিদুৎ চমকানোসহ পশ্চিম-উত্তরপশ্চিম দিক থেকে ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৮০ কিলোমিটার বেগে কালবৈশাখী ঝড় বয়ে যেতে পারে। ভারী বৃষ্টিপাতের সতর্কবার্তায় বলা হয়, দেশের উত্তরাঞ্চল ও তৎসংলগ্ন এলাকায় গভীর সঞ্চালনশীল মেঘমালা তৈরি হতে পারে এবং তা অব্যাহত থাকতে পারে। এর প্রভাবে সোমবার সকাল ৯ টা থেকে পরবর্তী ৯৬ ঘণ্টায় রংপুর, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ হতে পারে। এর ফলে ওইসব এলাকার কোথাও কোথাও অস্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতা তৈরি হতে। এছাড়া ময়মনসিংহ ও সিলেট অঞ্চলের নৌবন্দরসমূহে দুই নম্বর সতর্ক সর্কেত জারি করেছে সংস্থাটি।
দেশের যেখানে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত
বাংলাদেশের সব অঞ্চলে বজ্রপাত হলেও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ও সিলেটে সবচেয়ে বেশি ঘটে। আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, পানি বা জলাশয়ের নিকটবর্তী অঞ্চলে বজ্রপাতের ঘটনা বেশি ঘটে। যা মধ্যে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকা এবং উত্তরাঞ্চল বিশেষত রংপুর অঞ্চল।
বজ্রপাত নিয়ে যা বললেন বিশেষজ্ঞরা
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিগত ফ্যাসিবাদ আমলে বজ্রপাত থেকে রক্ষায় প্রথমে নেওয়া হয়েছিল তালগাছ সৃজন প্রকল্প। ব্যবস্থাপনার তালগোলে প্রায় শতকোটি টাকা গায়েব হয়ে যায় ‘গায়েবি’ গাছে। পরিকল্পনা কমিশনের মতে, ‘তালগাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া। কোনো সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষাও হয়নি।’ এখন তালগাছ কর্মসূচি বাতিল করে শুরু হয়েছে বজ্রপাত প্রতিরোধক বা লাইটনিং অ্যারেস্টার স্থাপনের কাজ। এটি উচ্চমাত্রার বিদ্যুৎকে সহজে নিরাপদে মাটিতে পৌঁছানোর সুযোগ করে দেয়। ৩০ থেকে ৪০ ফুট লম্বা দণ্ডে ৩ থেকে ৪ ইঞ্চি জিআইপি পাইপ এবং তামার তার থাকে। বজ্রনিরোধক দণ্ডের ওপর বসানো লাইটনিং অ্যারেস্টার ডিভাইসের মূল কাজ, নির্ধারিত ব্যাসের মধ্যে বজ্রপাত হলে তা টেনে মাটিতে নামিয়ে আনা। এতে মিটারের মতো কাউন্টার রয়েছে, কয়টি বজ্রপাত হলো, তার হিসাব সেখানে থাকবে। যন্ত্রটিকে ২৪ ঘণ্টা সক্রিয় রাখতে হয়। যে ধরনের অ্যারেস্টার এখন ব্যবহৃত হচ্ছে, তাতে ১০০ মিটার ব্যাসের মধ্যে এটা কার্যকর হবে।
আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, গত বছরের ১ এপ্রিল থেকে বাংলাদেশে বজ্রপাতের অ্যালার্ট মেসেজ দেওয়া শুরু হয়েছে। এর আগে এ সক্ষমতা ছিল না।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পরিচালক (এমআইএম) নিতাই চন্দ্র দে সরকার বলেন, বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যু নিয়ে উদ্বেগ আছে। তাই এটা নিয়ে কাজ চলছে। তবে এখন পূর্বভাস ও সচেতনতার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে।
বিগত আওয়ামী লীগ আমলে ‘গায়েবি’ তালগাছ প্রকল্পের তালগোলে শতকোটি টাকা গায়েব হয়ে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, তালগাছ প্রকল্প একটি দীর্ঘ মেয়াদি প্রকল্প। ফলে বিশেষজ্ঞরা এটাকে অর্থের অপচয় বলছেন। অন্যান্য প্রকল্পের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওইসব প্রকল্প সম্পর্কে পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অনুবিভাগ ভালো বলতে পারবে।
বজ্রপাত থেকে বাঁচতে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে এপ্রিল-মে মাসে বজ্রপাতের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি থাকে। এসময়আকাশে ঘন কালো মেঘ দেখা দিলে দ্রুত পাকা দালানের নিচে আশ্রয় নিন। বজ্রপাতের সময় খোলা মাঠ, জলাশয় বা বড় গাছের নিচে থাকা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বৈদ্যুতিক খুঁটি ও ধাতব বস্তু থেকে দূরে থাকুন। বাড়ির ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখা নিরাপদ।