জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে ন্যস্ত করতে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারের প্রণীত আইন বাতিল চায় নির্বাচন কমিশন। এ-সংক্রান্ত জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন আইন-২০২৩ বাতিল চেয়ে রাষ্ট্রপতি, প্রধান উপদেষ্টা ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাকে চিঠি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি। চলতি সপ্তাহের যে কোনোদিন এই চিঠি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হবে। গতকাল রোববার আগারগাঁও নির্বাচন ভবনে অনুষ্ঠিত কমিশন সভায় এ বিষয়ে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হযেছে।
এদিকে নির্বাচন কমিশন কর্মকর্তারেদর পদ-পদবি ও মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য পৃথক সার্ভিস গঠনের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে কমিশন সভায়।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে সভা শেষে নির্বাচন কমিশনার ব্রি. জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, জাতীয় পরিচয়পত্র সেবা ইসির অধীনেই থাকা উচিত। আমাদের মনে হয়েছে জাতীয় পরিচয়পত্র সেবা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে নেওয়া সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এনআইডি ডাটাবেজ কমিশন করেছে। যে কারণে এনআইডি কার্যক্রম কোনোভাবেই অন্য দপ্তরে নেওয়া যৌক্তিক হবে না এবং আমরা এ বিষয়ে পত্রালাপের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
সভার সূত্রমতে, ভোটার তালিকা ও জাতীয় পরিচয়পত্র আলাদা ব্যাখ্যা দিয়ে বিগত সরকার এটাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নেওয়ার সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছিল। সংসদে জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন আইন-২০২৩ পাস করে। এতে পুরোনো ২০১০ সালের আইন রহিত হয়ে যায়।
সভায় একজন কমিশনার প্রসঙ্গটি তুলে বলেন, এটাকে ভিন্ন খাতে ব্যবহার করার জন্য পৃথককরণ করতে চেয়েছিল। ভোটার পরিচয়পত্রের উপজাত হিসেবে এনআইডি হলেও দুটির সম্পর্ক পরিপূরক। তাই এটি বাতিল করা জরুরি। সভায় সর্বসম্মত মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একইসঙ্গে বিগত কমিশনগুলোর এ-সংক্রান্ত কী সিদ্ধান্ত বা পত্রালাপ ছিল, সেগুলোও সভায় পর্যালোচনা করা হয়।
বিগত সরকার রুলস অব বিজনেস, ১৯৯৬-এর সংশোধন করে সুরক্ষা সেবা বিভাগের দায়িত্বের মধ্যে এনআইডি কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করে। মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মতামত গ্রহণের বাধ্যবাধকতা থাকলেও প্রক্রিয়ার কোনো পর্যায়েই ইসির মতামত গ্রহণ করা হয়নি। উল্লেখ্য, এনআইডি কার্যক্রম স্থানান্তরে দ্বিমত জানিয়ে ২০২১ সালের ৭ জুন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে চিঠি দিয়ে ইসি তার অবস্থান সুস্পষ্ট করে।
বিগত সরকারের আমলে জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন আইন, ২০১০ বাতিল করে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন আইন, ২০২৩ প্রণয়ন করা হয়। গেজেট নোর্টিফিকেশনের মাধ্যমে ওই আইনটির কার্যকারিতার তারিখ নির্ধারণ না হওয়ায় ইসির অধীনেই বর্তমানে এনআইডি কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
সংবিধানের ১১৯(১) অনুচ্ছেদ অনুসারে ‘রাষ্ট্রপতি পদের ও সংসদের নির্বাচনের জন্য ভোটার তালিকা প্রস্তুতকরণের তত্ত্বাবধান, নির্দেশ ও নিয়ন্ত্রণ এবং অনুরূপ নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব ইসির ওপর ন্যস্ত থাকিবে।’ ইসিকে রোল মডেল হিসাবে জ্যামাইকা, ত্রিনিদাদ এবং টোবাগো, সেন্ট লুসিয়া ও সেন্ট ভিনসেন্ট এবং গ্রানাডা দ্বীপপুঞ্জ প্রভৃতি দেশের নির্বাচন কমিশন সফলভাবে এনআইডি কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য গত বছরের ১০ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনিকে চিঠি দেন। এই চিঠির আলোকে কমিশন এনআইডি স্থানান্তর আইন বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কমিশন সূত্র আরও জানিয়েছে, সম্প্রতি বদলি হয়ে স্বরাষ্ট্র সচিব হয়েছেন নাসিমুল গনি। তিনি পূর্বের চিঠির সূত্র ধরে আরেকটি চিঠি তার মন্ত্রণালয়ে দিতে কমিশনকে জানান বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে।
কমিশন কর্মকর্তারা জানান, শেখ হাসিনার তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় ও শিল্প উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান এই জাতীয় পরিচয়পত্র কার্যক্রম বাণিজ্যিকীকরণের ভিন্ন উদ্দেশ্যে জোরপূর্বক স্থানান্তরের সব কার্যক্রম সম্পন্ন করেছিলেন।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর এনআইডি ইসির অধীনে রাখার পথ উন্মুক্ত হয়। গতকাল রোববার কমিশন সভার সিদ্ধান্তে ইসিতে স্বস্তি ফিরেছে। কজন কর্মকর্তা বলেন, এটা আমাদের আমানত ছিল; আজ তা ফিরে পেলাম।
সভায় ইসি কর্মকর্তাদের জন্য সার্ভিস কমিশন করার বিষয়ে আলোচনা হয়। ক্যাডার ও নন-ক্যাডার এ বাহানা দেখিয়ে ইসি কর্মকর্তাদের ক্যাডার সার্ভিসের কেউ হেয় না করতে পারে- এ-সংক্রান্ত একটি প্রেজেন্টেশন কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে কমিশনকে দেখানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
সম্পাদনা : আহমদ মতিউর রহমান