লুই ক্যানের নান্দনিক স্থাপত্য নকশায় পরাবৃত্তাকার ছাদের নিচে আলো ঝলমল অধিবেশন কক্ষ। অষ্টভূজাকৃতির ড্রামে প্রতিফলিত সে কক্ষে সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে এক মাহেন্দ্রক্ষণ। প্রবেশ করছেন একের পর এক জনপ্রতিনিধি। ২৯৭ জনের প্রায় সবাই নির্ধারিত সময়ে নিজ নিজ আসনে। অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় নবাগত ২২৫ মুখ।
ঘড়ির কাঁটায় বেলা ১১টা বেজে গেছে। আরো কয়েক মিনিট অপেক্ষা। এ অপেক্ষা আইনগত বাধ্যবাধকতার। সভাপ্রধান হিসেবে স্পিকারের আসনে কেউ আসেননি, সেটা প্রমাণের জন্য। পাঁচ মিনিট অপেক্ষার পর সংসদ সচিব দাঁড়ালেন পোডিয়ামে। আগের সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতির কথা জানান দিলেন। অধিবেশন শুরুর ঘোষণা দিয়ে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের জন্য আহ্বান জানালেন কারিকে। তেলাওয়াত শেষে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আহ্বান জানালেন অধিবেশনের সভাপতি নির্ধারণ করতে। এভাবেই বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে নতুন পাতা খুলল। অবিস্মরণীয় নবযাত্রা শুরু হলো জনপ্রতিনিধিত্বশীল গণতান্ত্রিক জাতীয় সংসদের। স্পিকারের ফাঁকা আসন নিয়ে অনন্য সব বৈশিষ্ট্যে যাত্রা শুরু করেছে বহুল প্রত্যাশিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ।
এক বছর আট মাস পর সংসদকক্ষে এমন প্রাণচাঞ্চল্য। তবে দৃশ্যপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। একপাশে নতুন আর তারুণ্যের প্রাধান্য। অন্যপাশে ধর্মীয় লেবাসধারীদের আধিক্য। ইতিহাস সেরা সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সত্যিকারের জনপ্রতিনিধিদের সম্মিলন। ট্রেজারি বেঞ্চের প্রধান তরুণ নেতা তারেক রহমান। যিনি দীর্ঘ ১৭ বছর ছিলেন নির্বাসিত, দেশের মাটিতেই পা রাখতে পারেননি। বক্তব্য প্রচারও ছিল নিষিদ্ধ। তিনি আজ চালকের আসনে। বিরোধীদলীয় কর্ণধারও নতুন মুখ। সংসদকক্ষে পা ফেলেছেন জীবনে প্রথম। ছিলেন ‘নিষিদ্ধ দলের’ নেতা।
নানা ছলচাতুরী আর অপকৌশলে ছয়টি জাতীয় সংসদে যে দলটি নেতৃত্ব দিয়েছে, সে আওয়ামী লীগবিহীন সংসদ এটি। তিনটিতে নির্বাচন বর্জন আর চারটি সংসদে নেতৃত্বদানকারী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি পঞ্চমবারের মতো নেতৃত্বের আসনে। ১২টি সংসদের নেতা ও বিরোধী নেতা- কেউই নেই এ সংসদে। টানা ৩৫ বছর পর সংসদ নেতার আসন নারীর পরিবর্তে পুরুষ। একটি প্রশ্নবিদ্ধ স্বল্পস্থায়ী সংসদ বাদ দিলে বিরোধীদলীয় নেতার আসনটিও ছিল নারীর দখলে। এবার সেখানে বসেছেন ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল জামায়াত। চব্বিশের ৫ আগস্টের আগে যে দলটি ছিল নিষিদ্ধ ও সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য। এ সংসদে আরো কিছু মুখ এসেছেন, যাদের সংসদে বসার কথা ভাবাই যায়নি বছর দুই আগে। চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী ছাত্রনেতা তারা। নতুন দল গড়ার এক বছরের মাথায় বাজিমাত করে সংসদে তৃতীয় শক্তি হিসেবে জায়গা করে নিয়েছেন।
দ্বাদশ সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে নিরুদ্দেশ। ডেপুটি স্পিকার গ্রেপ্তার হয়ে জেলে। এমতাবস্থায় নতুন সংসদে সভাপতিত্ব কে করবেনÑতা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা ও কৌতূহল ছিল সীমাহীন। এ সংকট উত্তরণে সামনে আসে মহান স্বাধীনতা অর্জনের অব্যবহিত পর ১৯৭২ সালের সংসদের দৃষ্টান্ত। সেখানে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে কীভাবে অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচন করা হয়েছিল তা উল্লেখ করেন সংসদ নেতা। তারপরই প্রস্তাব ও সমর্থনের মাধ্যমে সরকারি দল বিএনপির প্রবীণ নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে সভাপতি মনোনীত করে অধিবেশন শুরু করা হয়। পরে নিয়মানুযায়ী স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত হন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও প্রতিমন্ত্রী কায়সার কামাল। দুজনই দলীয় ও মন্ত্রিত্বের পদ ত্যাগ করেন। সরকারি দলের মনোনয়নে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হলেও বিরোধী দল সমর্থন ও অভিনন্দন জানায়। অবশ্য কণ্ঠ ভোটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ কোনোটাই উচ্চারণ করেননি বিরোধী জোটের সংসদ সদস্যরা।
সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে সাদা শার্টের ওপর ধূসর রঙের ব্লেজার পরে সংসদ নেতা তারেক রহমান অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করলে উপস্থিত সংসদ সদস্যরা তাকে টেবিল চাপড়িয়ে অভিবাদন জানায়। হাস্যোজ্জ্বল তারেক রহমান এসে চারপাশে তাকিয়ে নিজের আসনে বসেন। এ সময় ভিভিআইপি গ্যালারিতে প্রথমসারিতে বসা ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী জুবাইদা রহমান, শ্বাশুড়ি সৈয়দা ইকবাল মান্দ বানু, মেয়ে জাইমা রহমান ও ছোট ভাই আরাফাত হোসেনের কোকোর স্ত্রী শামিলা রহমান। তাদের ডান পাশে প্রথমসারিতে ছিলেন সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল।
১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পাঁচটি আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সংসদে পা রেখেছিলেন বিএনপির চেয়ারপারসন মরহুম খালেদা জিয়া। জিয়াউর রহমানের পরিবারের দ্বিতীয় প্রজন্মের সরকারপ্রধান হিসেবে সংসদে পা রাখলেন তারেক রহমান। তিনি ঢাকা-১৭ আসনের প্রতিনিধিত্ব করছেন।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ৭৭ সদস্যের বিরোধী দলকে নেতৃত্ব দেন। ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে জামায়াত জোটের সদস্যরা একসঙ্গে সংসদকক্ষে প্রবেশ করেন ১০টা ৫২ মিনিটে।
নবযাত্রায় স্পিকার, সংসদ নেতা ও বিরোধীদলীয় নেতাসহ সরকার ও বিরোধী দলের নেতাদের কণ্ঠে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়েছে কার্যকর সংসদ হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয়। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে জোর দেওয়া হয়েছে স্পিকারের নিরপেক্ষতা ও ন্যায্য সুযোগ দেওয়ার ওপর। স্পিকারও আশ্বস্ত করেন দলনিরপেক্ষ ভূমিকার।
সূচনা বক্তব্যে ফ্যাসিবাদের নির্মমতার শিকার অসংখ্য মানুষের কান্না আর হাজারো প্রাণের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে দেশে আবারও কাঙ্ক্ষিত সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়েছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিরোধী দলকে আশ্বস্ত করে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা বলেন, ‘জাতীয় সংসদে দলের প্রতিনিধিত্ব করলেও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমি সমগ্র দেশের প্রতিনিধিত্ব করছি। দলমত, ধর্মবর্ণ, নির্বিশেষে দেশের জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছি।’
নিরপেক্ষতার জন্য বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেন বলে জানিয়ে স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, জনগণ সংসদের কার্যক্রম দেখতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। সরকার ও বিরোধী দল উভয়পক্ষ জাতীয় স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করবে বলে আশা করেন তিনি।
স্পিকারের নিরপেক্ষতা প্রত্যাশা করে সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, একটি দল থেকে নির্বাচিত হয়ে এলেও স্পিকার হওয়ার পর দলীয় পদ ত্যাগ করেন। তাই আমরা আশা করি, আপনার কাছে সরকারি দল ও বিরোধী দল আলাদা কিছু হবে না। আপনার কাছ থেকে আমরা ইনসাফ বা ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করি। জুলাই বিপ্লবের মূল স্লোগান ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’-এর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, রাষ্ট্রের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের মধ্যে সংসদ সবচেয়ে প্রধান। সংসদ যখন সঠিকভাবে চলবে, বাকি দুটি অঙ্গও (নির্বাহী ও বিচার বিভাগ) সঠিকভাবে কাজ করবে।
বৃহস্পতিবারের অধিবেশনের অন্যতম ব্যতিক্রমী দিক হচ্ছে, রাষ্ট্রপতির ভাষণ বর্জন করে ওয়াকআউট করে বিরোধী জোট। প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির রুটিন ভাষণের সময় হট্টগোল এবং এভাবে প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন ও স্লোগান দিয়ে অধিবেশন ত্যাগ করা ঘটনা অভূতপূর্ব। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে ভাষণ দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানান স্পিকার হাফিজ উদ্দিন। এ সময় বিরোধী দল জামায়াতের সংসদ সদস্যরা দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানান। তাদের হাতে প্ল্যাকার্ড দেখা যায়। প্ল্যাকার্ডে ‘জুলাই নিয়ে গাদ্দারি চলবে না’, ‘জুলাইয়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা বন্ধ কর’সহ বিভিন্ন স্লোগান লেখা রয়েছে। এনসিপির হাসনাত আবদুল্লাহসহ কয়েকজন এ সময় স্লোগান দেন। স্পিকার সবাইকে শান্ত থাকতে আহ্বান জানান।
রাষ্ট্রপতির সংসদে প্রবেশের সময় থেকেই হইচই করতে থাকেন বিরোধী দল জামায়াত ও এনসিপির সংসদ সদস্যরা। এর মধ্যেই বক্তব্য শুরু করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। তার বক্তব্য চলাকালে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির সংসদ সদস্যদের টেবিল চাপড়াতে দেখা যায়। বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা একপর্যায়ে ওয়াকআউট করেন।
পতিত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পছন্দে নির্বাচিত এবং তার পায়ের ধুলো নিতে না পারায় আক্ষেপ করা রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন আওয়ামী লীগকে ‘ফ্যাসিস্ট’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের অসামান্য ত্যাগের মাধ্যমে বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়ে গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছে। যে জুলাই অভ্যুত্থানের মুখে হাসিনা শাসনের পতন ঘটেছে, তার প্রশংসা করে রাষ্ট্রপতি বলেন, হাজারো শহীদের রক্তের ওপর দিয়ে তাঁবেদার ও ফ্যাসিবাদমুক্ত নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের সূচনা হয়। নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনের এটাও একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। সরকার ও বিরোধী দল দুপক্ষের পছন্দের বাইরের একজন রাষ্ট্রপতি ভাষণ দিয়েছেন এবং সে ভাষণের ওপর সংসদের আলোচনা হবে।
ঢাকার কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিকরা সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনে যোগ দেন। তারা ভিআইপি গ্যালারিতে বসে অধিবেশন উপভোগ করেন। ঢাকায় নিযুক্ত অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার সুসান রাইল সংসদ অধিবেশনে যোগ দেন। তিনি এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, জাতীয় সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনের মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অর্জন করায় বাংলাদেশের জনগণকে অভিনন্দন। অস্ট্রেলিয়া এ অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং প্রক্রিয়ার প্রতি তার সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে।
গণঅভ্যুত্থানের পর সংস্কারের যে জনআকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবায়নের ঐতিহাসিক দায়িত্ব পড়েছে এ সংসদের ওপর। বিশেষ করে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিষ্পত্তি হবে এখানে। রাজনৈতিক দলগুলো বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার প্রণীত জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছে। এ সনদ সংসদে পাস করানোর বড় দায় রয়েছে প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর। বিশেষ করে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ ইস্যুতে প্রথম অধিবেশনেই উত্তপ্ত হতে পারে জাতীয় সংসদ। তবে এ উত্তাপ গভীর সংকটে রূপ নেয় কি নাÑতা দেখার জন্য সবার দৃষ্টি এখন সংসদ অধিবেশনের দিকে। নির্বাচনের পর সরকারি দলের নির্বাচিতরা শুধু সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন। তবে বিরোধী দলের সদস্যরা নিয়েছেন দুটি শপথ। একটি সংসদ সদস্য হিসেবে, অন্যটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা বলছেন, একই দেশে দুই নিয়ম চলতে পারে না।