ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত গণভবন একসময় ছিল ক্ষমতার দম্ভ ও শাসনের কেন্দ্রবিন্দু। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর ছাত্র-জনতার রক্তে কেনা সেই রাজকীয় বাড়িটিকে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ করার ঘোষণা দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার।
জনগণের আশা ছিল, দ্রুতই বিপ্লবের সেই উত্তাল দিনগুলোর জীবন্ত দলিল সবার জন্য উন্মুক্ত হবে। কিন্তু সেই আশা পূরণ হয়নি, আজও সাধারণ মানুষের জন্য খোলেনি এ জাদুঘরের মূল ফটক। এ দীর্ঘসূত্রতা আর সরকারি কাজে ঢিমেতালের কারণে বিপ্লবের সেই টাটকা আবেগ কি তবে ফিকে হতে শুরু করেছে? আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নাকি রাজনৈতিক অনীহা—ঠিক কী কারণে থমকে আছে এ জাদুঘরের উদ্বোধন? এ প্রশ্ন আর উৎকণ্ঠাকে কেন্দ্র করেই এখন ডানা মেলছে গভীর শঙ্কা।
অধ্যাদেশ থেকে বিলে রূপান্তর
জাদুঘরটি পরিচালনার আইনি ভিত্তি নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তী সরকার ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করেছিল। ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর নীতিগত অনুমোদনের পর রাষ্ট্রপতি ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর এটি অধ্যাদেশ হিসেবে জারি করেন। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে সংশোধনীসহ ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিল, ২০২৬’ পাস করা হয়, যা এ প্রকল্পটিকে একটি স্থায়ী আইনি কাঠামো প্রদান করেছে। এ নতুন বিলে জাদুঘরটিকে কেবল একটি ভবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এর পরিধি আরো বিস্তৃত করা হয়েছে।
বিলের নতুন বিধান অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন স্থানে বিগত সরকারের আমলে গড়ে তোলা গোপন বন্দিশালা বা ‘আয়নাঘর’ এবং যেসব স্থানে জুলাই বিপ্লবের সময় নৃশংস নির্যাতন চালানো হয়েছে, সেগুলোকে এ মূল জাদুঘরের ‘শাখা জাদুঘর’ হিসেবে সংরক্ষণ করা যাবে। এছাড়া, এ জাদুঘরকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ করতে ইউনেস্কোসহ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
২০২৫ সালের ১৫ জুলাই এক সরকারি সভায় ৪০ কোটি টাকারও বেশি বাজেটে এ প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের বিপ্লবের স্মৃতি স্মরণে ২০২৫ সালের আগস্টেই এটি উদ্বোধনের লক্ষ্য ছিল। কিন্তু সেই সময় পার হয়ে এখন ২০২৬ সাল চললেও দর্শনার্থীদের জন্য দ্বার উন্মুক্ত হয়নি।
মাঠের যোদ্ধাদের ক্ষোভ ও অভিযোগ
জাদুঘরটি উদ্বোধনে বিলম্ব হওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ শহীদ পরিবারের সদস্য ও আন্দোলনে আহত যোদ্ধারা। জুলাইয়ে গুলিবিদ্ধ যোদ্ধা মো. নাইমুল ইসলাম খান অনিক আক্ষেপ করে বলেন, ‘এটি অন্তর্বর্তী সরকার থাকাকালীনই উদ্বোধন করা উচিত ছিল, এটাই আমাদের প্রত্যাশা ছিল। আমরা এখনো নতুন সরকারের ওপর আস্থা রাখছি, তবে অতিদ্রুত যেন এর উদ্বোধন হয়।’
বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে আমলাতান্ত্রিক ধীরগতিকে দায়ী করছেন অনেকে। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক যুগ্ম সদস্যসচিব এবং গণবিপ্লবী উদ্যোগের নেতা আরিফ সোহেল মনে করেন, মানুষের মধ্যে জুলাই বিপ্লব নিয়ে আগ্রহের কোনো কমতি নেই। তিনি বলেন, ‘জাদুঘর উদ্বোধন না হওয়াটা মূলত কর্তৃপক্ষের অনাগ্রহের ফলাফল। আমার মনে হয় কর্তাব্যক্তিদের মধ্যে অনেকেই সরাসরি জুলাইয়ের মাঠের লড়াইয়ে ছিলেন না। এটি তাদের এ অবস্থানের অন্যতম কারণ হতে পারে; তারা মানুষের আবেগ বা এ ইতিহাসের সঙ্গে সংযোগ বোধ করতে পারছেন না।’
শহীদ শাইখ আসহাবুল ইয়ামিনের বাবা ও সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা মো. মহিউদ্দিন পরিস্থিতির জন্য রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যর্থতাকে দায়ী করে বলেন, ‘আমার মনে হয়, বর্তমান এ পরিস্থিতির জন্য জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী ছাত্রদের অনভিজ্ঞতা এবং ড. ইউনূস সরকারের নিষ্ক্রিয়তা ও বিপ্লবের মূল আকাঙ্ক্ষা ধারণ করতে না পারাই দায়ী। এর পাশাপাশি বিএনপির ভারতের ফাঁদে পা দেওয়াও এ অবস্থার জন্য সমানভাবে দায়ী।’
নেপথ্যে কি আমলাতান্ত্রিক কারসাজি?
উদ্বোধন ঝুলে থাকার পেছনে প্রশাসনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা প্রভাবশালীদের হাত দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাবেক এক উপদেষ্টা দাবি করেন, ‘সরকার ইতিবাচক থাকলেও একজন সিনিয়র আমলার কারসাজিতে সব কাজ বন্ধ। সেই আমলা বিগত সরকারের প্রভাবশালী ও বর্তমানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতা মির্জা আজমের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তার প্ররোচনাতেই সংশ্লিষ্ট বিভাগ জাদুঘর উদ্বোধনে টালবাহানা করছে। বিএনপি জুলাই অধ্যাদেশ পাস করেছে, কিন্তু এ আমলার প্রভাবে সবকিছু আটকে আছে বলে আশঙ্কা করছি।’
তবে এর বিপরীতে আশার কথা শুনিয়েছেন শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের ভাই এবং জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনের সাবেক সিইও মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ। তিনি বলেন, ‘আমি যতটুকু জানি এ সরকার জুলাই জাদুঘর নিয়ে খুবই আন্তরিক এবং শিগগির এটি জনগণের জন্য খুলে দেওয়ার সব রকম চেষ্টা চলমান রয়েছে।’
যেভাবে সাজছে বিপ্লবের এ জীবন্ত স্মারক
জাদুঘরটি মূলত বিভিন্ন থিম্যাটিক গ্যালারিতে সাজানো হয়েছে। এখানে ডিজিটাল ও ভিজ্যুয়াল প্রযুক্তির মাধ্যমে ইতিহাসকে জীবন্ত করে তোলা হচ্ছে। দর্শনার্থীরা এখানে জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের ঐতিহাসিক বিবরণ, দেয়ালচিত্র বা গ্রাফিতি, পোস্টার এবং গুরুত্বপূর্ণ ভিডিও ফুটেজ দেখতে পাবেন। এছাড়া, শহীদদের ব্যবহৃত পোশাক, তাদের লেখা চিঠিপত্র এবং সে সময়ের সংবাদপত্রের কাটিংও সংরক্ষিত রয়েছে। বিশেষ প্রযুক্তির মাধ্যমে শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার দৃশ্যসহ ঘটনার ধারাবাহিক বর্ণনাও পাবেন দর্শনার্থীরা। শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য থাকছে আলাদা পাঠাগার ও ইন্টারঅ্যাকটিভ ডিসপ্লে।
আইন অনুযায়ী এটি একটি সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হবে এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত ‘আয়নাঘর’ বা নির্যাতনের কেন্দ্রগুলোকে এ মূল জাদুঘরের শাখা হিসেবে পরিচালনা করা যাবে। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী এ জাদুঘরের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
দম্ভের গণভবন থেকে জনতার আঙিনা
গণভবন নির্মাণ শুরু হয়েছিল ১৯৭৩-৭৪ সাল নাগাদ। মার্বেল-আচ্ছাদিত মেঝে আর প্রশস্ত করিডোরের এ ভবনটি ছিল রাষ্ট্রীয় মর্যাদার প্রতীক। প্রায় ১৮ একরের বিশাল কমপ্লেক্সের ২৯ হাজার বর্গফুটের দ্বিতল ভবনটিতে পরিবার নিয়ে থাকতেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিশাল লেকে মাছ চাষ, গরু, মুরগি, কবুতর পালন এবং বিনোদনের জন্য ছিল বিশাল টেনিস কোর্ট। এমনকি ধান ও শাকসবজির চাষও করতেন তিনি। কিন্তু সময় বদলেছে। একসময়ের দম্ভের সেই উন্মুক্ত স্থান এখন ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে বিপ্লবের গল্প বলছে।
পরিদর্শন ও আগামীর ধোঁয়াশা
২০২৬ সালের ২০ জানুয়ারি সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাদুঘরটির চূড়ান্ত পর্যায়ের কাজ পরিদর্শন করেন। তিনি একে ‘বিশ্বের এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, ‘এই জাদুঘর জুলাই শহীদদের রক্ত তাজা থাকতেই করা সম্ভব হয়েছে। যদি আমাদের জাতি কখনো দিশাহারা হয়, তবে এই জাদুঘরে পথ খুঁজে পাবে।’ সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীও বলেন, রেকর্ড সময়ে এবং অনেকের স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে কাজ এ পর্যায়ে এসেছে।
এত কিছুর পরও মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা এবং উদ্বোধনের দিনক্ষণ চূড়ান্ত না হওয়ায় গণভবন ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে জনতার স্মৃতির কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার এ যাত্রাপথ এখন অনেকটাই ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। জুলাইয়ের সেই আকাঙ্ক্ষা কি তবে আমলাতান্ত্রিক ফাইলে চাপা পড়ে যাচ্ছে? সাধারণ মানুষের দাবি—সব জটিলতা কাটিয়ে দ্রুতই যেন বিপ্লবের এ জীবন্ত দলিলটি সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়, যাতে পরবর্তী প্রজন্ম নিজ চোখে ইতিহাসের সাক্ষী হতে পারে। এ জাদুঘর কেবল একটি ভবন নয়, এটি কোটি মানুষের ত্যাগ আর দীর্ঘ সংগ্রামের এক অবিনাশী স্মারক।