ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ ও পুদুচেরির ইয়ানাম উপকূলের কাছাকাছি দিয়ে বুধবার ভোরে স্থলভাগে আঘাত হেনেছে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’। ঝড়টির কেন্দ্রে বাতাসের একটানা গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১২৫ থেকে ১৩৫ কিলোমিটার, যা দমকা বা ঝোড়ো হাওয়ার আকারে ঘণ্টায় ১৪০ থেকে ১৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছিল। ঘূর্ণিঝড়টির স্থলভাগে প্রবেশের প্রক্রিয়া শুরু হলেও বুধবার সকালেও এর কেন্দ্র উপকূলের কাছাকাছি অবস্থান করছিল। ফলে আরও কয়েক ঘণ্টা ভারি বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ভারতের আবহাওয়া দপ্তরের বরাত দিয়ে এনডিটিভি জানিয়েছে, ‘অর্ণব’-এর কেন্দ্র অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলের খুব কাছে চলে এসেছে। ঝড়টি বাপাতলা ও বিশাখাপত্তনমের মধ্যবর্তী উপকূল দিয়ে স্থলভাগে প্রবেশ করছে। আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, স্থলভাগে ঢোকার পর উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হতে হতে ঝড়টি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়বে। তবে এর প্রভাবে অন্ধ্রপ্রদেশ ও প্রতিবেশী ওড়িশায় ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে।
ঘূর্ণিঝড়ের বিপদ মোকাবিলায় অন্ধ্রপ্রদেশ ও ওড়িশায় ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। বার্তা সংস্থা এপি ও এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই রাজ্যে মোট ১ লাখ ৮০ হাজারের বেশি মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। অন্ধ্রপ্রদেশে ২০টি জেলার জন্য দুই হাজারের বেশি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়। মাছ ধরার ৩০ হাজারের বেশি নৌযান নিরাপদে সরিয়ে রাখা এবং জরুরি চিকিৎসাসেবায় প্রায় ১ হাজার ১০০টি চিকিৎসা দল মোতায়েন করা হয়েছে।
অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী এন চন্দ্রবাবু নাইডু দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশাসনকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া এবং শিশু, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ও অন্তঃসত্ত্বা নারীদের বিশেষ সুরক্ষা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলীয় জেলাগুলোতে ব্যাপক বৃষ্টিপাত হয়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৮টা থেকে বুধবার ভোর সাড়ে ৫টা পর্যন্ত বিশাখাপত্তনমে ২১৬ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়। একই সময়ে কলিঙ্গপত্তনমে ১৪৭, কাকিনাড়ায় ১১৮ এবং মছিলিপত্তনমে ১১৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। অন্য কয়েকটি এলাকায়ও ২০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
কাকিনাড়া, বিশাখাপত্তনম, অমলাপুরম ও কোনাসীমা জেলায় ঝড়ের প্রভাবে গাছ উপড়ে পড়া, বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়া এবং নিচু এলাকায় পানি জমার খবর পাওয়া গেছে। কোনাসীমা জেলায় প্রায় ছয় হাজার বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে যাওয়ার তথ্যও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। দুর্যোগের কারণে কয়েকটি ট্রেন ও ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। অন্ধ্রপ্রদেশের ৬০৯টি স্কুলকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
বুধবার সকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে দুই রাজ্যে প্রাণহানির কোনো খবর পাওয়া যায়নি। তবে উদ্ধারকাজ ও ক্ষয়ক্ষতির হিসাব চলমান থাকায় পরিস্থিতির পরিবর্ধন বা পরিবর্তন হতে পারে।
ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে ওড়িশার বিভিন্ন এলাকায় ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। রাজ্যটিতে উদ্ধার ও জরুরি সেবার দল মোতায়েন করা হয়েছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা, হাওড়া, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুরসহ কয়েকটি এলাকায় বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। তবে ঘূর্ণিঝড়টির মূল আঘাত অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলেই পড়েছে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড়টির সরাসরি বাংলাদেশে আঘাত হানার আশঙ্কা নেই। তবে এর প্রভাবে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টি হতে পারে। বুধবার দেশের আট বিভাগেরই কিছু কিছু জায়গায় বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। পরবর্তী কয়েক দিনে রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের অনেক জায়গায় এবং অন্যান্য বিভাগের কিছু এলাকায় বৃষ্টি হতে পারে।
এদিকে, বঙ্গোপসাগর উত্তাল থাকায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত বহাল রাখা হয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারগুলোকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে সতর্কতার সঙ্গে চলাচল করতে বলা হয়েছে।
ঘূর্ণিঝড়টির প্রভাবে দেশের উপকূলীয় এলাকায় বৃষ্টি ও সাগরের উত্তাল পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে বলে সতর্ক করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।