হোম > প্রকৃতি ও পরিবেশ

দেশে আরো ভারি বৃষ্টির পূর্বাভাস, দীর্ঘ হতে পারে বন্যা পরিস্থিতি

সরদার আনিছ

ভারী বৃষ্টিতে রাজধানীতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় হাঁটুসমান পানি মাড়িয়ে যাত্রীরা গন্তব্যে পৌঁছান। সোমবার বনানি থেকে তোলা। ছবি: আমার দেশ

চলতি সপ্তাহের শেষে আগামী বৃহস্পতিবার থেকে আরো ভারি বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। মৌসুমি বৃষ্টিবলয়ের প্রভাবে উপকূলীয় এলাকাসহ সারা দেশে সপ্তাহজুড়ে ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাত হতে পারে। একই সঙ্গে নদ-নদীর পানি বেড়ে বন্যা পরিস্থিতি দীর্ঘ হতে পারে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়া সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে তিনটি জেলা বন্যায় আক্রান্ত। এছাড়া আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আরো ছয়টি জেলায় বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এখন পর্যন্ত দেশে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ১০ লাখের বেশি মানুষ।

আবহাওয়া দপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, মৌসুমি বায়ুর একটি বর্ধিতাংশ উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। এটি বাংলাদেশের ওপর এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে মাঝারি অবস্থায় বিরাজমান আছে। এটি আরো শক্তিশালী হয়ে আগামী বৃহস্পতিবার থেকে টানা কয়েক দিন সারা দেশে ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টি হতে পারে। এতে নদ-নদীর পানি বেড়ে বন্যা পরিস্থিতি দীর্ঘ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে বেসরকারি সংস্থা বাংলাদেশ ওয়েদার অবজারভেটরি টিম ১৭ থেকে ২৪ জুলাইয়ের পূর্বাভাসে জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহের শুরুতে দেশের আকাশ আংশিক মেঘলা এবং পরে মেঘাচ্ছন্ন থাকতে পারে। খুলনা ও রাজশাহী বিভাগে সাময়িক মৃদু তাপপ্রবাহের পাশাপাশি দেশের অন্যান্য স্থানে ভ্যাপসা গরম অনুভূত হতে পারে।

এ সপ্তাহে দেশে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগে বেশি বৃষ্টি হতে পারে এবং উপকূলীয় এলাকায় ভারি থেকে অতিভারি বর্ষণের আশঙ্কা রয়েছে। সাগর কিছুটা উত্তাল থাকতে পারে এবং সপ্তাহের শেষ দিকে সতর্কসংকেত জারির সম্ভাবনা রয়েছে।

টানা বৃষ্টির কারণে দেশের উজানে নদ-নদীর পানি বেড়ে কোথাও কোথাও বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। এছাড়া শেষ দিকে সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায় পাহাড়ধসের ঝুঁকি রয়েছে এবং উত্তরাঞ্চলে মাঝারি বজ্রপাতের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে গতকাল আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক আমার দেশকে বলেন, বৃষ্টিপাতের প্রবণতা পূর্ব-দক্ষিণাঞ্চল থেকে কমে মধ্য উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের দিকে যাচ্ছে। ফলে সিলেট-চট্টগ্রামের দিকে বৃষ্টি কমে ঢাকা-ময়মনসিংহ, রাজশাহী, রংপুর, খুলনা ও বরিশালে বৃষ্টি বেশি হচ্ছে। আগের কয়েক দিনের তুলনায় আগামী দু-তিন দিন বৃষ্টিপাতের প্রবণতা কিছুটা কমে আগামী বৃহস্পতিবার থেকে বাড়তে পারে।

তবে আবহাওয়াবিদ ড. বজলুর রশিদ বলেন, গতকাল সোমবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রাজধানীতে ৪০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া ২৪ ঘণ্টায় কুমিল্লায় সর্বোচ্চ ১৩৭, বগুড়ায় ১০৮, ফরিদপুরে ৮৯ ও চট্টগ্রামে ৯৬ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। তিনি জানান, দেশের মধ্য উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলসহ ঢাকায় আরো দু-এক দিন এমন বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। এরপর কিছুটা কমে ১৮-১৯ জুলাইয়ের পর থেকে বৃষ্টি বাড়তে পারে।

এবারের বৃষ্টিপাতকে ‘অস্বাভাবিক’ হিসেবে উল্লেখ করে এই আবহাওয়াবিদ বলেন, এল নিনোর প্রভাবে এবার স্বল্প সময়ে অধিক বৃষ্টিপাতের কারণে পরিস্থিতি নাজুক হচ্ছে। ফলে সামনে পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায় তা বলা মুশকিল।

পাউবোর বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান আমার দেশকে বলেন, বর্তমানে দেশের সিলেট, সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনা—এ তিন জেলা বন্যায় আক্রান্ত। তবে আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ময়মনসিংহ, শেরপুর, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, রংপুর ও লালমনিরহাট জেলায় বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

তিনি আরো বলেন, চট্টগ্রাম ও পার্বত্যাঞ্চলে উন্নতি হলেও দেশের মধ্য ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

গতকাল বিকালে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের পূর্বাভাসে বলা হয়, সুনামগঞ্জের সুরমা নদীর ছাতক পয়েন্টে, একই জেলার কুশিয়ারা নদীর মারকুলি ও সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে, নেত্রকোনার সোমেশ্বরী নদী কলমাকান্দা পয়েন্টে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।

আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর ও ময়মনসিংহ, উত্তরাঞ্চলীয় নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির উদ্ভব অথবা কিছুটা অবনতি হতে পারে। অন্যদিকে আগামী ২৪ ঘণ্টায় বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার সাঙ্গু, মাতামুহুরী নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলসমূহে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি অব্যাহত থাকতে পারে।

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ১০ লাখ

দেশের বিভিন্ন এলাকায় টানা অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় সাতটি জেলায় ১০ লাখ ২৩ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত বন্যায় ৫১ জন নিহত এবং ৩৯ জন আহত হয়েছে। বর্তমানে ২ লাখ ৬৮ হাজার পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে।

আক্রান্ত জেলাগুলোর মধ্যে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। দুর্গত মানুষের জন্য এক হাজার ১৩১টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে, যেখানে ৪৪ হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোর জন্য ২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা এবং ৩ হাজার ২৫০ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবীদের সমন্বয়ে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

এদিকে বন্যাকবলিত এলাকায় চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ফেনী, কুমিল্লাসহ ঝুঁকিপূর্ণ ১১টি জেলায় বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চালু করা হয়েছে এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল করে মাঠে থাকা নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রতিটি জেলার সার্বিক পরিস্থিতি তদারকির জন্য একজন করে জ্যেষ্ঠ চিকিৎসককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হাসপাতালে পর্যাপ্ত ওষুধ ও স্যালাইন প্রস্তুত রয়েছে। পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধে ওআরএস ও পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করা হচ্ছে। জেলা পর্যায়ে ২১ হাজার ভায়াল অ্যান্টিভেনম সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং দ্রুত আরো ২৫ হাজার ভায়াল যুক্ত হবে। ইতোমধ্যে সাপে কাটা ৯৫ জন রোগী চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছে। জরুরি পরামর্শের জন্য জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা কল সেন্টার—১৬২৬৩ সার্বক্ষণিক সচল রয়েছে।

রাজধানীতে দেখা মিলেছে সূর্যের, বাড়তে পারে তাপমাত্রা

ঢাকায় বৃষ্টির যে পূর্বাভাস জানাল আবহাওয়া অফিস

টানা বর্ষণে রাজধানীতে অচলাবস্থা, বৃষ্টি আরো বাড়বে বৃহস্পতিবার থেকে

উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি, ১০ লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি

আজও ভারী বৃষ্টির শঙ্কা, ১৯ অঞ্চলের নদীবন্দরে সতর্কতা

চার নদীর পানি বিপৎসীমার উপরে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বন্যার ঝুঁকি

সুস্থ হয়ে সুন্দরবনে ফিরল বাঘিনী

প্লাবনের শীতলতা ছাপিয়ে আষাঢ়ের গুমোট গরম

টানা বৃষ্টি কত দিন, জানাল আবহাওয়া অফিস

রাতভর বৃষ্টিতে ডুবল রাজধানী, আজও সারা দেশে বৃষ্টির আভাস