বৃষ্টির প্রভাবে তাপমাত্রা খুব বেশি না বাড়লেও সারা দেশে তীব্র ভ্যাপসা গরম অনুভূত হচ্ছে। গরমের তুলনায় প্রকৃতপক্ষে তাপমাত্রা কম। বছরের সবচেয়ে উষ্ণতম এপ্রিল-মে মাসে যে ধরনের তাপমাত্রা থাকার কথা তাও নেই; কখনো কখনো তাপপ্রবাহ শুরু হলেও বৃষ্টির কারণে তা আর বেশি সময় ধরে স্থায়ী হচ্ছে না। এমন কি দেশের দ্বিতীয় উষ্ণতম মাসেও রাতের বেলায় কখনও কখনও রাজধানীতেও গায়ে চাদর মুড়িয়ে ঘুমাতে হয়েছে। আবহাওয়ার এমন পরিস্থিতিকে অনেক অস্বাভাবিক মনে করছেন আবহাওয়াবিদরা।
শুধু তাই নয়, গত ১৪ বছরের চাকরিজীবনে এপ্রিল-মে মাসে অভ্যন্তরীণ এত বৃষ্টি আর ভ্যাপসা গরম আর কখনো দেখেননি বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদ এ. কে. এম. নাজমুল হক ও মো. শাহীনুল ইসলাম।
বেশি বৃষ্টির পরও দেশজুড়ে কেন তীব্র ভ্যাপসা গরম অনুভূত হচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে মঙ্গলবার রাতে আবহাওয়াবিদ এ. কে. এম. নাজমুল হক আমার দেশকে বলেন, দেশজুড়ে বৃষ্টি তাপমাত্রা খুব বেশি বাড়তে না দিলেও দক্ষিণা বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ বেশি থাকায় মানুষের শরীর বেশি ঘামছে। আর সেই ঘাম সহজে শুকাতে দিচ্ছে না আর্দ্রতা। আর এতেই সারাদেশে তীব্র ভ্যাপসা গরম অনুভূত হচ্ছে।
আবহাওয়াবিদ এ. কে. এম. নাজমুল হক বলেন, ২০২৩ সালে এপ্রিল-মে মাসে টানা ৩৫ দিন আর ২০২৪ সালে টানা ২৬ তাপপ্রবাহ বয়ে যায়। ওই দুই বছরে তাপমাত্রাও বেশি ছিল কিন্তু এবার বৃষ্টি বেশি হওয়ায় সে ধরনের আবহাওয়া নেই।
আবহাওয়াবিদ মো. শাহীনুল ইসলাম বলেন, গত ২০২৩ ও ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে এপ্রিল মাসে কিছুটা কম তাপমাত্রা ছিল। আর গতবারের তুলনায় এবার আরো কম। বৃষ্টির প্রভাবে তাপমাত্রা খুব বেশি বাড়তে দিচ্ছে না। কিন্তু বাতাসে আর্দ্রতা বেড়ে যাওয়ায় গরম অনুভূত হচ্ছে তীব্র তাপপ্রবাহের মতো। তিনি বলেন, এ পরিস্থিতি আগামী জুন-জুলাই জুড়েই থাকতে পারে।
আবহাওয়া দপ্তরের বিগত সময়ের তথ্য উপাত্ত পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত ২০২৩ ২০২৪ এপ্রিল মাসে যে ভয়াবহ তাপপ্রবাহ (৪২-৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস) ছিল। সেই তুলনায় ২০২৫ সালেও কম ছিল। তবে এবার এ পর্যন্ত তার চেয়েও কম তাপমাত্রা বিরাজ করছে। গত বছর ১০ মে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল চুয়াডাঙ্গায় ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগের বছর ২০২৪ সালে দেশে প্রচণ্ড তাপপ্রবাহের সময় এপ্রিল মাসে চুয়াডাঙ্গায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ৪৩ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর এবার গত ২২ এপ্রিল শুধু একদিন রাজশাহীতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
এদিকে আগেরদিনের তুলনায় তাপমাত্রা কমে মঙ্গলবার সারাদেশের মধ্যে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৩৬ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস; যা সোমবার ছিল চুয়াডাঙ্গায় ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে আগের দিনের তুলনায় রাজধানীতে তাপমাত্রা কিছুটা বেড়ে হয়েছে ৩৪ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস; যা সোমবার ছিল চুয়াডাঙ্গায় ৩২ ডিগ্রির কিছুটা বেশি। এছাড়া আগের কয়েকদিন দেশের ১৩ জেলার ওপর দিয়ে বয়ে গেলেও মঙ্গলবার তা কমে ৪ জেলার ওপর দিয়ে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে গেছে। এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীতে বৃষ্টির পরিমাণ ছিল ১৬ মিলিমিটার। সারাদেশের মধ্যে রাঙ্গামাটিতে সর্বোচ্চ ৮৬ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। তবে রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগে মোটেও বৃষ্টি হয়নি। এছাড়া দেশের অন্যান্য স্থানেও আগের কয়েকদিনের তুলনায় কম বৃষ্টি হয়েছে।
অর্থাৎ বৃষ্টির প্রভাবে সারা দেশের তাপমাত্রা খুব বেশি না বাড়লেও স্বস্তি মিলছে না কোথাও। সারাদিনে জ্যৈষ্ঠের খরতাপ আর ভ্যাপসা গরমে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এ অবস্থা থেকে সহসা পরিত্রাণ পাওয়ারও কোনো লক্ষণ দেখছেন না আবহাওয়াবিদরা।
এর আগে চলতি মাসের শুরুর দিকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক ও বিশেষজ্ঞ কমিটির চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম স্বাক্ষরিত দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে বলা হয়েছিল, মৌসুমের সবচেয়ে উষ্ণতম মাস এপ্রিলে স্বাভাবিকের চেয়ে ৭৫ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হলেও চলতি মে মাসে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হতে পারে। এছাড়া আগামী জুন-জুলাই মাসে বৃষ্টি কম হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ বর্ষাজুড়েও থাকতে পারে ভ্যাপসা গরমে দাপট।
এদিকে কখনও ঠাণ্ডা কখনও তীব্র ভ্যাপসা গরমে নারা ধরনের রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন বৃদ্ধ ও শিশুরা। একটি বেসরকারি হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. আবু আসমা আমার দেশকে বলেন, বেশ কিছুদিন থেকে ঠাণ্ডা কাশি ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে শিশু হাসপাতালে ভর্তির পরিমাণ বেড়েছে।
এএস