হোম > মতামত

ধর্ষণ : কিছু কথা

তাসকিন ফাহমিনা

মাগুরার সেই ছোট্ট মেয়েটি ভয়াবহ ধর্ষণের শিকার হয়ে না ফেরার দেশে চলে গেল। পেছনে ফেলে গেল এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ, আর ধসে পড়া বিচারব্যবস্থা, যেখানে প্রতিদিনই ধর্ষণের খবর আমরা পাচ্ছি।

এদেশে নারীদের ওপর ধর্ষণের ব্যাপকতা থাকলেও হতাশাজনক ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার কারণে অধিকাংশ ভিকটিম বিচার পান না। ধর্ষণ মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবেই বিবেচিত হবে, যখন রাষ্ট্রের আইন ও বিচারব্যবস্থা নারীকে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয় এবং অপরাধীর বিচার হয় না। এ ছাড়া হেফাজতে থাকাকালে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা কর্তৃক ধর্ষণ নির্যাতন হিসেবে বিবেচিত হয়।

শেখ হাসিনা সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হাতে অনেক ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে । এ ছাড়া সে সময় চলন্ত বাসে ধর্ষণ, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কর্তৃক ধর্ষণ, ক্যান্টনমেন্টে ধর্ষণ, পাহাড়ে ধর্ষণ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। বহু ক্ষেত্রে বিচার পাননি নারীরা। সম্পূর্ণ বিচার ব্যবস্থাকে আওয়ামীকরণ করা হয়েছিল।

মানবাধিকার সংস্থা অধিকার-এর ডকুমেন্টেশন অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত মোট ১১ হাজার ৪ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছে ৩ হাজার ৯৭৫ প্রাপ্তবয়স্ক নারী ও ৬ হাজার ৭৮৭ মেয়েশিশু (১৮ বছরের নিচে যাদের বয়স) এবং ২৪২ জনের বয়স জানা যায়নি। গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৩ হাজার ৮০ জন এবং ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৭৯৯ জনকে। ধর্ষণের কারণে সামাজিকভাবে হেয় করায় ৩০ নারী ও ৬৮ মেয়েশিশু আত্মহত্যা করে বলে জানা যায়। ভয়াবহ বিষয় হলো শিশু ধর্ষণের হার অনেক বেশি।

এদেশে ঘরবাড়িহীন রাস্তায় থাকা নারী থেকে শুরু করে নিজ ঘরে থাকা নারীরাও ধর্ষণ এবং গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। বেঁচে গেলে সেই নারীটিকে চুপ করিয়ে রাখা হয়, অথবা বিভিন্ন কলঙ্ক দেওয়া হয় বা খারাপ তকমা দেওয়া হয়। আরো হেনস্তা হওয়ার ভয়ে এবং নারীর প্রতি অনুকূল নয়, এমন বিচারব্যবস্থার কারণে বেঁচে যাওয়া ভিকটিম অধিকাংশ ক্ষেত্রে আইনের দ্বারস্থ হন না। অপরাধী প্রভাবশালী হলে তাদের বিচারের সম্মুখীন করাই যায় না। ধর্ষণকারীদের হুমকিতে কিংবা আদালতে মামলা চালানোর মতো আর্থিক সংগতি না থাকায় এবং বছরের পর বছর ধরে আদালতে হাজিরা দিতে দিতে নারী ও তাদের পরিবার বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে বহু ক্ষেত্রে দেখা যায়, আদালতের বাইরে ধর্ষণের ঘটনাগুলোর মীমাংসা হয়ে যায়। এমনকি এসব সালিশের মাধ্যমে ধর্ষণকারীর সঙ্গে ভুক্তভোগীকে বিয়েও দিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিচারের নামে অবিচার চলছে।

ধর্ষণ মূলত আতঙ্ক সৃষ্টি করা, ব্যক্তিকে দুর্বল ও অসহায় করে তোলা এবং মানসিক ও শারীরিকভাবে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যেই হয়ে থাকে। অনেক সময় অসুস্থ কামনা একটি ভূমিকা রাখে, তবে এটি কেবল যৌন আকাঙ্ক্ষার বিষয় নয়, বরং সমাজে নারীর প্রতি অসম্মান, নারীবিদ্বেষ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অপরাধমূলক মানসিকতারই প্রতিফলন। এটি একটি গুরুতর অপরাধ এবং সমাজের সবার জন্য ভয়াবহ ক্ষতিকর। তাই ধর্ষণের জন্য যারা নারীর পোশাক ও চলাফেরাকে দায়ী করেন, তাদের বুঝতে হবে কোনো আট বছর বয়সি শিশু যখন ধর্ষণের শিকার হয়, তখন কি তার পোশাক বা চলাফেরাকে দায়ী করা যায়? কোনো নারী বোরকা-হিজাব পরেন বা না পরেন, যেকোনো পোশাকেই তিনি ধর্ষণের শিকার হতে পারেন এবং হয়েছেনও। তাই যেকোনো অবস্থাতেই ধর্ষণকে ন্যায্যতা দেওয়া যাবে না, কারণ এতে ধর্ষণকারী ও সম্ভাব্য ধর্ষণকারী উৎসাহিত হয়।

সমাজে মানুষগুলোকে সচেতন হতে হবে। আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধবের কাছে মেয়েশিশুটিকে নিশ্চিন্তে দিয়ে মা-বাবা নিজের কাজে ব্যস্ত থাকে। অন্যদিকে বাচ্চাটির ওপর কী ভয়াবহ ধর্ষণ কিংবা যৌন সহিংসতা চালানো হলো, তা হয়তো তাদের কল্পনাতেও নেই। নিকটজনের কাছেই শিশুরা বেশি ধর্ষণের শিকার হয়। শিশুদের গুড টাচ, ব্যাড টাচ শেখাতে হবে। মা-বাবাকে সচেতন হতে হবে। ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার বিষয়গুলো শিশুদের জানাতে হবে। কারণ তারাই ধর্ষণকারীদের সহজ শিকার। স্কুলের কারিকুলামে এ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করে তা শিশুদের জানাতে হবে, বোঝাতে হবে এবং সচেতন করতে হবে।

সেই ১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্ট ১৪ বছর বয়সী ইয়াসমিন আখতার দিনাজপুরে তার বাড়ি ফেরার পথে ভুল বাসে উঠে পথ হারিয়ে ফেলেন। এরপর তিন পুলিশ সদস্য মঈনুল হক, আব্দুস সাত্তার ও অমৃতলাল তাকে পুলিশের ভ্যানে করে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। তবে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার পরিবর্তে তারা তাকে ধর্ষণ করে এবং শ্বাসরোধে হত্যা করে। পরে তার মরদেহ রাস্তার পাশে ফেলে দেওয়া হয়, যা পরদিন উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনায় পুলিশ সদস্য মঈনুল হক, আব্দুস সাত্তার ও অমৃতলালের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। সেই সময় নারী অধিকার কর্মীরা ব্যাপকভাবে রাস্তায় ছিলেন এবং সারাদেশে প্রতিবাদ হয়েছিল। ২০০৪ সালে মঈনুল হক, আব্দুস সাত্তার ও অমৃতলালের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল ঘটনাটি ঘটার ৯ বছর পর । আমাদের দেশে ধর্ষণের যেসব ঘটনায় বিক্ষোভ-প্রতিবাদ হয়, সেগুলোর কিছু কিছু বিচার হয়, বাকিগুলো উপেক্ষিত হয়ে থাকে। এটি আমাদের খুব দুর্বল বিচারব্যবস্থার প্রতিফলন।

অন্যদিকে শুধু নারী নন, পুরুষ কিংবা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষেরাও ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। কিন্তু আমাদের দেশের আইনে পুরুষ কিংবা তৃতীয় লিঙ্গের ওপর ধর্ষণ অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। বাংলাদেশে বৈবাহিক ধর্ষণকেও আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে ধর্ষণের ঘটনা ঘটলেও এসব ভুক্তভোগী বিচার পাচ্ছেন না । এ ছাড়া ধর্ষণের ঘটনা ঘটলেই ভিকটিমকে দোষারোপ করার সংস্কৃতি এদেশে প্রবল। এ থেকে সবাইকে বের করে আনতে হলে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টির প্রয়োজন রয়েছে।

বাংলাদেশের ধর্ষণবিরোধী আইনকে সময়োপযোগী করতে হবে। পুরুষ, তৃতীয় লিঙ্গ ও বৈবাহিক ধর্ষণকে আইনের আওতায় আনতে হবে। ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা এবং অপরাধীদের শনাক্ত করতে যৌন অপরাধীদের একটি পাবলিক ডেটাবেজ তৈরি করা দরকার । পাশাপাশি সমাজে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। আইনের কার্যকর প্রয়োগ, বিচারব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা ও সামাজিক সচেতনতা ধর্ষণের মতো ভয়াবহ অপরাধ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এজন্য সবাইকে একসঙ্গে এখনই কাজ শুরু করতে হবে।

লেখক : মানবাধিকারকর্মী

সিরিয়ায় ওয়াইপিজির বিলুপ্তি ইরাকের জন্য সতর্কবার্তা

চিন্তার স্বাধীনতা বনাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব

বিধ্বস্ত শিক্ষাব্যবস্থা

ভাষার কোনো বিদেশ নেই, নেই কোনো খাঁচা

নৌবিদ্রোহ ও রাজনীতির বিশ্বাসঘাতকতা

চ্যালেঞ্জের মুখে খামেনির নেতৃত্ব ও ইসলামি বিপ্লব

শব্দের রাজনীতি, ক্ষমতার ভয়

নতুন প্রধানমন্ত্রীর শুরুটা কেমন হলো

কূটনীতিক, পণ্ডিত ও বাংলাদেশের বন্ধু

কৃষি পর্যটন : টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত