হোম > মতামত

শিক্ষক শুধু চাকরিজীবী নন, মানুষ গড়ার কারিগরও

মো. সাব্বির ফয়েজ

মো. সাব্বির ফয়েজ। ফাইল ছবি

একটি বিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় সম্পদ শুধু বহুতল ভবন, আধুনিক আসবাব কিংবা প্রযুক্তিনির্ভর শ্রেণিকক্ষ নয়। একটি বিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো একজন যোগ্য, সৎ, সাহসী ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক; আর সেই শিক্ষকদের সঠিক পথে পরিচালনার জন্য প্রয়োজন একজন দক্ষ, নীতিবান ও দূরদর্শী প্রধান শিক্ষক। কোটি টাকা খরচ করে সুন্দর ভবন নির্মাণ করা যায়, আধুনিক প্রযুক্তি কেনা যায়, কিন্তু শুধু অর্থ ব্যয় করে একজন আদর্শবান শিক্ষক তৈরি করা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন মূল্যবোধ, সামাজিক মর্যাদা, পেশাগত স্বাধীনতা, জবাবদিহি এবং শিক্ষকতার প্রতি গভীর দায়বদ্ধতার সংস্কৃতি।

প্রতিভা শুধু বড় শহরের নামকরা বিদ্যালয়ে জন্মায় না। বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রাম, হাওর, চর ও প্রত্যন্ত জনপদে অসংখ্য মেধাবী শিশু জন্ম নেয়। কিন্তু প্রতিভা জন্ম নিলেই যথেষ্ট নয়; তাকে পরিচর্যা করতে হয়, সাহস দিতে হয়, স্বপ্ন দেখাতে হয় এবং সঠিক পথ দেখাতে হয়।

জীবনের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে আমরা অসংখ্য মানুষের সংস্পর্শে আসি। সময়ের প্রবাহে তাঁদের অনেকের মুখই স্মৃতি থেকে ধীরে ধীরে মুছে যায়। কিন্তু কিছু মানুষ থেকে যান আজীবন—আমাদের চিন্তা, চেতনা, মূল্যবোধ ও জীবনবোধের গভীরে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের অবদান যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আমার জীবনে তেমনই একজন মানুষ শায়েস্তাগঞ্জ হাই স্কুলের শ্রদ্ধেয় প্রধান শিক্ষক আবদুন নূর চৌধুরী স্যার। আজ এত বছর পরও তাঁর কথা মনে হলে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে।

আমরা আবদুন নূর চৌধুরী স্যারকে পেয়েছিলাম তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের শেষ পর্যায়ে। কিন্তু তাঁকে সরাসরি পাওয়ার আগেই আমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্মের ছাত্রদের মুখে তাঁর অসাধারণ শিক্ষাদান, দৃঢ় ব্যক্তিত্ব, সততা, শৃঙ্খলাবোধ এবং বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলায় অসামান্য দক্ষতার কথা শুনেছিলাম। প্রাক্তন ছাত্রদের কাছে তিনি ছিলেন প্রায় কিংবদন্তিতুল্য একজন শিক্ষক। তখন হয়তো বুঝিনি একজন প্রধান শিক্ষককে ঘিরে কেন এত শ্রদ্ধা, এত আবেগ। আজ বুঝতে পারি—পদ বা ক্ষমতা দিয়ে মানুষের হৃদয়ে এমন জায়গা তৈরি করা যায় না; কর্ম, সততা, নিষ্ঠা ও ভালোবাসা দিয়ে তা অর্জন করতে হয়।

আবদুন নূর চৌধুরী স্যার আমাদের গণিত পড়াতেন। তাঁর পড়ানোর পদ্ধতি ছিল অসাধারণ সহজ, সাবলীল ও কার্যকর। কঠিন অঙ্কও তাঁর ব্যাখ্যায় সহজ হয়ে যেত। তিনি শ্রেণিকক্ষে একটি বিষয় ভালোভাবে বুঝিয়ে দেওয়ার পর পরবর্তী দিনের জন্য নির্দিষ্ট অনুশীলনী দিয়ে দিতেন। আমরা প্রতিদিনের কাজ প্রতিদিনই শেষ করতাম এবং পরদিন তিনি তা যাচাই করে পরবর্তী পাঠে এগিয়ে যেতেন। ফলে আলাদা করে প্রাইভেট পড়া কিংবা কোচিং করার প্রয়োজনীয়তা আমরা অনুভব করিনি। বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষই ছিল আমাদের শেখার প্রধান ও প্রায় সম্পূর্ণ জায়গা।

আজ যখন দেখি একজন শিক্ষার্থীর দিনের বড় অংশ স্কুলের পাশাপাশি কোচিং ও প্রাইভেট টিউশনের পেছনে ব্যয় হচ্ছে, তখন আমাদের সেই সময়ের কথা গভীরভাবে মনে পড়ে। প্রশ্ন জাগে—একজন দক্ষ ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক যদি শ্রেণিকক্ষেই তাঁর সর্বোচ্চটুকু দিয়ে প্রতিটি ছাত্রের শেখা নিশ্চিত করতে পারেন, তাহলে শিক্ষার্থীদের এত অতিরিক্ত নির্ভরতার প্রয়োজন কেন হবে? আমরা কি সত্যিই শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক করেছি, নাকি কোথাও আমাদের সেই কার্যকর শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শিক্ষার ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলেছি?

অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময়ের একটি ঘটনা আজও আমার স্মৃতিতে অত্যন্ত উজ্জ্বল। আমাদের শ্রেণির প্রথম দিকের প্রায় দশজন ছাত্রকে নিয়ে আবদুন নূর চৌধুরী স্যার একটি বিশেষ পরিকল্পনা করেছিলেন। আমরা প্রথমার্ধে অন্য সবার সঙ্গে নিয়মিত ক্লাস করতাম। এরপর দিনের শেষ তিনটি পিরিয়ডে আমাদের জন্য আলাদা ক্লাসের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল অষ্টম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষার জন্য আমাদের বিশেষভাবে প্রস্তুত করা। প্রধান শিক্ষক নিজে এবং বিদ্যালয়ের আরও কয়েকজন গুণী শিক্ষক অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে সেই ক্লাসগুলো নিতেন।

আজকের প্রজন্মের কাছে হয়তো অবিশ্বাস্য মনে হবে—এই অতিরিক্ত শ্রমের জন্য শিক্ষকেরা কোনো আলাদা পারিশ্রমিক নিতেন না। কোনো কোচিং ফি ছিল না, কোনো বিশেষ ফি ছিল না, ছিল না ব্যক্তিগত লাভের কোনো হিসাব। তাঁদের একমাত্র প্রত্যাশা ছিল—তাঁদের ছাত্ররা ভালো করবে, বৃত্তি পাবে, বিদ্যালয়ের মুখ উজ্জ্বল করবে। ছাত্রের সাফল্যই ছিল তাঁদের আনন্দ, আর বিদ্যালয়ের সুনামই ছিল তাঁদের সবচেয়ে বড় পুরস্কার।

বৃত্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর আমি বৃত্তি লাভ করি। আমার বাবা স্বাভাবিকভাবেই অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলেন। শিক্ষকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য তিনি তাঁদের মিষ্টিমুখ করাতে চেয়েছিলেন এবং এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষক আবদুন নূর চৌধুরী স্যারের কাছে প্রস্তাব করেছিলেন। স্যার অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে তা প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন, “এটা ঠিক হবে না।” কয়েকটি মাত্র শব্দ, অথচ এর মধ্যে লুকিয়ে ছিল কত বড় একটি নৈতিক শিক্ষা!

আজ এত বছর পর যখন সেই ঘটনাটি স্মরণ করি, তখন সত্যিই বিস্মিত হই। যে শিক্ষক বিনা পারিশ্রমিকে অতিরিক্ত সময় দিয়ে ছাত্রকে বৃত্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করেছেন, ছাত্রের সাফল্যের পর তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে দেওয়া সামান্য মিষ্টিটুকুও নৈতিক বিবেচনায় গ্রহণ করতে চাননি—সেই মূল্যবোধকে আজ আমরা কোন মানদণ্ডে পরিমাপ করব? এটি শুধু ব্যক্তিগত সততা ছিল না; এটি ছিল শিক্ষকতার মর্যাদা ও নৈতিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। সেদিন হয়তো আমরা এর গভীরতা বুঝিনি। আজ বুঝি—নৈতিকতা শুধু বই পড়ে শেখানো যায় না, নিজের জীবন ও আচরণের মধ্য দিয়েই তার সবচেয়ে বড় শিক্ষা দেওয়া যায়।

আমরা নবম শ্রেণিতে ওঠার পর থেকেই আবদুন নূর চৌধুরী স্যার আমাদের এসএসসি পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য পরিকল্পিতভাবে কাজ শুরু করেছিলেন। তাঁর কাছে ভালো ফল কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; এটি ছিল দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নিয়মিত তদারকি, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর জবাবদিহি এবং ধারাবাহিক পরিশ্রমের ফল। শিক্ষকেরা যথাযথভাবে পাঠদান করছেন কি না, ছাত্ররা নিয়মিত পড়াশোনা করছে কি না—সবকিছুর ওপর তাঁর নজর ছিল। মেধাবী ছাত্রদের এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি দুর্বল ছাত্রদের জন্যও ছিল বিশেষ পরিকল্পনা। তাঁর শিক্ষা-দর্শনে কাউকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল না।

বিদ্যালয়ের প্রতি প্রাক্তন ছাত্রদের সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রেও তাঁর চিন্তা ছিল অত্যন্ত দূরদর্শী। শায়েস্তাগঞ্জ হাই স্কুলের যেসব প্রাক্তন ছাত্র ভালো ফল করে বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করতেন, তাঁদেরও তিনি বর্তমান ছাত্রদের সহায়তায় সম্পৃক্ত করতেন। তাঁরা বিদ্যালয়ে এসে ছোট ভাইদের পড়াতেন, পরামর্শ দিতেন, নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতেন এবং তাদের ভালো ফলের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করতেন। বিস্ময়ের বিষয়, তাঁরাও এর জন্য কোনো পারিশ্রমিক প্রত্যাশা করতেন না। বিদ্যালয়ের কাছ থেকে তাঁরা যা পেয়েছেন, তার কিছুটা পরবর্তী প্রজন্মকে ফিরিয়ে দেওয়াই যেন ছিল তাঁদের দায়িত্ব ও আনন্দ। এভাবেই একটি বিদ্যালয় শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি পরিণত হয়েছিল প্রজন্মের সঙ্গে প্রজন্মের এক আত্মিক বন্ধনে।

আবদুন নূর চৌধুরী স্যার বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা শুধু পাঠ্যবই, পরীক্ষা কিংবা ভালো ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিদিনের অ্যাসেম্বলিতে আলাদা আলাদা ছাত্রকে গান গাইতে হতো। তখন হয়তো আমরা এটিকে সাধারণ একটি নিয়ম হিসেবেই দেখতাম। আজ বুঝতে পারি, এর মধ্যেও ছিল অসাধারণ শিক্ষাচিন্তা। শত শত সহপাঠীর সামনে দাঁড়িয়ে গান গাওয়া কিংবা কিছু উপস্থাপন করার মধ্য দিয়ে একজন কিশোরের জড়তা কাটত, আত্মবিশ্বাস বাড়ত এবং জনসমক্ষে নিজেকে প্রকাশ করার সাহস তৈরি হতো।

স্কাউটিং কার্যক্রমের দায়িত্ব তিনি অন্য কোনো শিক্ষককে দিলেও নিজে নিয়মিত তদারকি করতেন। সারা বছর বিদ্যালয় খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, স্কাউটিং এবং বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রমে মুখর থাকত। এসব কার্যক্রমকে তিনি পড়াশোনার প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করতেন না; বরং একজন পরিপূর্ণ মানুষ তৈরির অপরিহার্য অংশ হিসেবে দেখতেন। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, এসব আয়োজনের জন্য অভিভাবকদের ওপর একের পর এক অতিরিক্ত ফি চাপিয়ে দেওয়া হতো না। টিফিনের জন্য আমরা খুব সামান্য অর্থ দিতাম, অথচ সেই সামান্য অর্থও যে কত সুশৃঙ্খল, স্বচ্ছ ও মানসম্মতভাবে ব্যবহার করা সম্ভব—আমরা তখন তা প্রত্যক্ষ করেছি।

আজ আমরা শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য দেশ-বিদেশে ছুটছি, নানা দেশের শিক্ষা-মডেল পর্যবেক্ষণ করছি, নতুন নতুন প্রশিক্ষণ, প্রকল্প ও পদ্ধতি গ্রহণ করছি। উন্নত বিশ্বের ভালো দিক থেকে অবশ্যই আমাদের শেখার আছে। কিন্তু একই সঙ্গে আমার মনে একটি প্রশ্ন জাগে—আমাদের নিজেদের অতীতের সফল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মহান শিক্ষকদের কাছ থেকে আমরা কতটুকু শেখার চেষ্টা করেছি? আবদুন নূর চৌধুরীদের মতো প্রধান শিক্ষকেরা কীভাবে সীমিত সম্পদের মধ্যে একটি বিদ্যালয়কে সফলভাবে পরিচালনা করতেন, শিক্ষকদের উদ্বুদ্ধ করতেন, প্রাক্তন ছাত্রদের সম্পৃক্ত করতেন, মেধাবী ও দুর্বল ছাত্রদের জন্য পৃথক পরিকল্পনা করতেন এবং একই সঙ্গে পড়াশোনা, সংস্কৃতি, খেলাধুলা ও স্কাউটিংকে এগিয়ে নিতেন—এসব অভিজ্ঞতাও আমাদের শিক্ষা-সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ পাঠ হতে পারত।

তাঁর নেতৃত্বে এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর একের পর এক ব্যাচ ভালো ফল করে বিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে দেশের বিভিন্ন স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতো। গ্রামের সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা অসংখ্য শিক্ষার্থী নিজেদের মেধা বিকাশের সুযোগ পেত। পরবর্তী সময়ে তাঁদের অনেকেই সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। এসব সাফল্যের পেছনে ব্যক্তিগত মেধার পাশাপাশি ছিল একটি বিদ্যালয়ের সুন্দর পরিবেশ, একদল নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক এবং সর্বোপরি একজন দূরদর্শী প্রধান শিক্ষকের নেতৃত্ব।

আজ সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, আবদুন নূর চৌধুরীদের মতো মানুষ ধীরে ধীরে আমাদের সমাজ থেকে হারিয়ে যাচ্ছেন। আরও উদ্বেগের বিষয়, রাষ্ট্র ও সমাজ যেন তাঁদের যোগ্য উত্তরসূরি তৈরির কাজেও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য দেখাতে পারছে না। এর ক্ষতি শুধু একটি বিদ্যালয়ের নয়; এর ক্ষতি পুরো জাতির। কারণ বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জে প্রতিভার কোনো অভাব নেই। প্রত্যন্ত গ্রামের কোনো সাধারণ পরিবারের শিশুর মধ্যেও হয়তো লুকিয়ে আছে ভবিষ্যতের একজন অসাধারণ চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, বিজ্ঞানী, বিচারক কিংবা রাষ্ট্রনায়ক। প্রয়োজন শুধু সেই প্রতিভাকে চিনে নেওয়ার মতো একজন শিক্ষক এবং তাকে সঠিক পথে এগিয়ে নেওয়ার মতো একটি বিদ্যালয়।

আবদুন নূর চৌধুরীদের হারিয়ে যাওয়া শুধু কয়েকজন ভালো শিক্ষকের অবসর নেওয়া নয়; এটি একটি শিক্ষাদর্শ, একটি মূল্যবোধ এবং একটি ঐতিহ্যের ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়া। আমরা যদি তাঁদের মতো প্রধান শিক্ষক তৈরি করতে পারি, যোগ্য শিক্ষকদের যথাযথ মর্যাদা দিতে পারি এবং তাঁদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারি, তাহলে আমাদের গ্রামের স্কুলগুলো আবারও প্রতিভা বিকাশের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।

আজ বহু বছর পর যখন শায়েস্তাগঞ্জ হাই স্কুলের সেই দিনগুলোর কথা মনে করি, চোখের সামনে ভেসে ওঠে সকালের অ্যাসেম্বলি, ছাত্রদের গান, স্যারের গণিতের ক্লাস, পরের দিনের অনুশীলনী, বৃত্তির বিশেষ ক্লাস, এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি, মাঠের খেলাধুলা, স্কাউটিং আর একদল শিক্ষকের নিঃস্বার্থ ব্যস্ততা। মনে হয়, কত সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে কত সমৃদ্ধ ছিল আমাদের সেই শিক্ষাজীবন!

আমি বিশ্বাস করি, সেই দিন আবার ফিরতে পারে। তার জন্য শিক্ষককে শুধু একজন চাকরিজীবী হিসেবে না দেখে জাতি গড়ার কারিগর হিসেবে মর্যাদা দিতে হবে। প্রধান শিক্ষককে শুধু একটি প্রশাসনিক পদের অধিকারী না বানিয়ে প্রকৃত শিক্ষানেতা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। সততা, নিষ্ঠা, দক্ষতা ও জবাবদিহিতাকে আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাণশক্তিতে পরিণত করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের আবার আবদুন নূর চৌধুরীদের মতো শিক্ষক তৈরি করতে হবে এবং যাঁরা এখনো আছেন, তাঁদের মর্যাদা ও মূল্যবোধকে রক্ষা করতে হবে।

তাহলেই হয়তো আমাদের গ্রামের স্কুলগুলো আবার জেগে উঠবে। অজপাড়াগাঁয়ের কোনো অচেনা শিশুর চোখে আবার বড় হওয়ার স্বপ্ন জ্বলবে। বিদ্যালয় আবার শুধু পরীক্ষার্থী নয়, মানুষ তৈরি করবে। গ্রামের মাটি থেকে আবার উঠে আসবে অসংখ্য প্রতিভা, যারা একদিন দেশ ও সমাজকে আলোকিত করবে।

গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করি আমার প্রিয় প্রধান শিক্ষক আবদুন নূর চৌধুরী স্যারকে। আজ উপলব্ধি করি—তিনি আমাদের শুধু গণিত শেখাননি; তিনি আমাদের মানুষ হওয়ার অঙ্কটিও শিখিয়েছিলেন।

লেখক: জেলা ও দায়রা জজ, প্রাক্তন ছাত্র শায়েস্তাগঞ্জ হাই স্কুল।

বাংলাদেশের কূটনৈতিক বৈচিত্র্যে ভীত ভারত

এনটিআরসিএ-কে শক্তিশালী করুন

সরকারের ৬ মাস ও জ্বালানি মহাপরিকল্পনা

আমরা কি জুলাই থেকে শিক্ষা নিয়েছি

মৎস্য খাতের সাফল্য থেকে টেকসই সমৃদ্ধির অভিযাত্রা

সরকারের ছয় মাস ও ‘জনগণের দিন’

কোচিং যখন সমান্তরাল শিক্ষাব্যবস্থা

ইসলামি অর্থনীতির প্রকৃত অর্থ

খালেদা জিয়া : সংগ্রাম ও মানুষের ভালোবাসায় এক জীবন

একাত্তর আর চব্বিশ দুজনে দুজনার