জুলাই শেষ হয়ে গেছে—এ কথা শুধু ক্যালেন্ডারই বলতে পারে। ইতিহাস তা বলে না। ইতিহাস জানে, কিছু মাস কখনো শেষ হয় না। কিছু রক্ত শুকিয়ে গেলেও তার দাগ মুছে যায় না। কিছু নাম কবরের নিচে চাপা পড়ে না; তারা ফিরে আসে বাতাসে, দেয়ালের স্লোগানে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো কোনো তরুণের কণ্ঠে। তাই জুলাই শুধু একটি মাস নয়; এটি একটি জাতির বিবেক, একটি চলমান প্রশ্ন, একটি অসমাপ্ত দায়িত্ব।
জুলাই শুধু একটি আন্দোলন ছিল না । এটি ছিল রাষ্ট্রের চোখে চোখ রেখে উচ্চারিত একটি সত্য—গণমানুষের সম্মিলিত জাগরণের কাছে ক্ষমতাধররাই অসহায়, পরাজিত। সেই সত্যের সাক্ষী ছিল রাজপথ, অসংখ্য আহত-নিহতের আত্মত্যাগ। শহীদ আবু সাঈদের মতো তরুণরা শুধু জীবন হারাননি; তারা একটি জাতিকে প্রশ্ন করতে শিখিয়েছেন—রাষ্ট্রের শক্তি কি মানুষের ওপর, নাকি মানুষের জন্য?
সমস্যা হলো, ক্ষমতা প্রশ্নকে সহজে মেনে নিতে পারে না। ক্ষমতা আনুগত্য পছন্দ করে, করতালি ভালোবাসে আর ভিন্নমতকে সন্দেহের চোখে দেখে। ইতিহাসের প্রায় প্রতিটি সময়েই দেখা গেছে, যারা মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়, তাদের কখনো উচ্ছৃঙ্খল, কখনো ষড়যন্ত্রী, কখনো রাষ্ট্রবিরোধী বলে চিহ্নিত করা হয়। অভিধান বদলায়, ভাষা বদলায়, কিন্তু রক্তের রঙ বদলায় না।
আজও যখন বিভিন্ন শিক্ষাঙ্গনে উত্তেজনা, সহিংসতা কিংবা বিভাজনের খবর আসে, তখন অনিবার্যভাবেই প্রশ্ন জাগে—আমরা কি সত্যিই জুলাই থেকে শিক্ষা নিয়েছি? যে বিশ্ববিদ্যালয় মুক্তচিন্তার প্রতীক হওয়ার কথা, সেখানে যদি মতের বদলে পরিচয় বিচার হয়, তবে তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সংকট নয়; এটি জাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের কারণ।
জুলাইয়ের চেতনা শুধু স্মরণসভা, শোভাযাত্রা বা আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। শহীদদের ছবি টাঙিয়ে তাদের স্বপ্নকে বিস্মৃত করা, সনদ প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা বাস্তবায়নে বিলম্ব করা, কিংবা শহীদ পরিবারের প্রত্যাশাকে দীর্ঘ অপেক্ষায় ফেলে রাখা—এসব কোনো জাতির জন্য গৌরবের বিষয় হতে পারে না। আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষা হয় বাস্তব পদক্ষেপে, ন্যায়বিচারে এবং মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে।
আরো একটি বিষয় আমাদের মনে রাখা জরুরি। ইতিহাসকে ব্যবহার করা যায়, কিন্তু ইতিহাসকে প্রতারিত করা যায় না। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত মনে রাখে কে ক্ষমতায় ছিল, তা নয়; মনে রাখে কে ক্ষমতার কাছে সত্যকে বিসর্জন দিয়েছিল আর কে সত্যের জন্য মূল্য দিয়েছিল। তাই শহীদদের রক্ত কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর সম্পত্তি হতে পারে না। সেটি সমগ্র জাতির নৈতিক অঙ্গীকার।
ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু ইতিহাস দীর্ঘজীবী। আজ যারা ক্ষমতায় আছেন, কাল তারা থাকবেন না; কিন্তু তাদের সিদ্ধান্ত, তাদের ন্যায়বোধ কিংবা তাদের নীরবতা ইতিহাসের পাতায় থেকে যাবে। ইতিহাস একদিন প্রশ্ন করবে—রক্তের মর্যাদা কি রক্ষা করা হয়েছিল? শহীদদের স্বপ্ন কি বাস্তবায়নের পথে এগিয়েছিল? মেধা, মতপ্রকাশ এবং ন্যায়বিচারের প্রতি কি সম্মান দেখানো হয়েছিল?
জুলাই তাই কোনো উৎসবের নাম নয়, কোনো রাজনৈতিক স্লোগানেরও নাম নয়। জুলাই একটি নৈতিক মানদণ্ড, যা প্রতিটি ক্ষমতাকে, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে এবং প্রতিটি নাগরিককে বারবার নিজের সামনে দাঁড় করায়। সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার একমাত্র উপায় হলো—মানুষকে ক্ষমতার ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া, সত্যকে ভয় না করা এবং শহীদদের আত্মত্যাগকে শুধু স্মৃতিতে নয়, রাষ্ট্রচর্চায় ধারণ করা।
কারণ শহীদরা ফুল চাননি। তারা এমন একটি বাংলাদেশ চেয়েছিলেন, যেখানে ক্ষমতার চেয়ে সত্য বড় হবে, দলের চেয়ে দেশ বড় হবে ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

