চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান এদেশের মানুষের জন্য আশীর্বাদ না হয়ে যদি উল্টো হয়, তাহলে জনগণের মুক্তি আগের মতো স্বৈরাচারী শাসনের শিকলেই আবদ্ধ থাকবে। দেশের মানুষের অধিকার হরণ করতে সব কিছুই করেছে স্বৈরাচারী হাসিনা সরকার। নিপীড়ন-নির্যাতন, গুম-খুনের শাসন কায়েম করে মানুষকে ভীতসন্ত্রস্ত্র করে রেখেছিল, যাতে তাদের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতে না পারে।
স্থানীয় সরকার অফিসগুলো পর্যন্ত ঘুস, দুর্নীতির মহামারিতে আক্রান্ত হয়েছিল। জন্ম নিবন্ধনের মতো ন্যূনতম নাগরিক অধিকারটুকুও ঘুস দেওয়া ছাড়া পাওয়া যেত না। ’২৪-এর গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে যেন বিগত ১৬ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের কোনো চিহ্ন ফিরে না আসে, সেটাই এখন এদেশের জনগণের প্রত্যাশা।
জুলাই-আগস্টের গণহত্যার পরও যদি সাধারণ মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ণ হতে থাকে এবং রাজনীতিবিদরা জনকল্যাণের বদলে ক্ষমতার লোভে অন্ধ হয়ে যান, সরকারি কর্মচারীরা দুর্নীতির পথ বেছে নেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নিজের স্বার্থসিদ্ধিকে প্রাধান্য দেন, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা স্বার্থ হাসিলের তৎপরতায় মগ্ন হন, তাহলে সাধারণ মানুষ আগের মতোই তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে।
৮ আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর তাদের কাছে জনগণের প্রত্যাশা ছিল সরকার দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে প্রকৃত গণতন্ত্রের দিকে নিয়ে যাবে দেশকে। সরকারের প্রতি জনগণের এই প্রত্যাশা এখনো আছে। কিন্তু দেশে পরিকল্পিতভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়ে মানুষের সেই প্রত্যাশাকে ফিকে করার অপচেষ্টা চলে আসছে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই। এমনকি যে লক্ষ্য অর্জনের জন্য ’২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হয়েছেন দেড় হাজারের বেশি মানুষ, তাদের সেই স্বপ্নও মুছে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে।
ফ্যাসিবাদী দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও রাষ্ট্রযন্ত্রে ঘাপটি মেরে থাকা ফ্যাসিবাদের দোসররা ৫ আগস্টের পর থেকেই দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য তৎপর রয়েছে। নানা ইস্যুতে পরিকল্পিতভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চক্রান্তে লিপ্ত তারা। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশকে একটি জঙ্গিবাদী রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরার জন্য নিষিদ্ধ ঘোষিত কয়েকটি উগ্রপন্থি সংগঠনকে পরিকল্পিতভাবে মাঠে নামানো হয়। একইসঙ্গে সারা দেশে হঠাৎ চোর-ডাকাত ও ছিনতাইকারীর উৎপাত বেড়ে যায়। অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রমকে ব্যাহত করার জন্য এ সবই ছিল পরিকল্পিত চক্রান্ত। তবে অন্তর্বর্তী সরকার সব চক্রান্ত মোকাবিলা করে ধীরে ধীরে দেশের পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক অবস্থায় নিয়ে আসছে।
এদেশের মানুষ বহুকাল ধরে শোষণের শাসন, নিপীড়ন-নির্যাতন, অন্যায়-অত্যাচার, গুম-খুন, চাঁদাবাজি, লুটপাট, দুর্নীতির রাজনীতির শিকার হয়েছে। কিন্তু আর কত? দেয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছিল বলেই ’২৪-এর জুলাই-আগস্টে স্বৈরাচারী সরকারের দাসত্ব থেকে মুক্তির জন্য দলমত নির্বিশেষে মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিল। দেশের মানুষ শান্তিতে বসবাস করতে চায়, এটুকুই তাদের চাওয়া। মানুষের এই প্রত্যাশা পূরণের জন্যই প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে বিকল রাষ্ট্রযন্ত্রকে মেরামত করতে হবে। পাশাপাশি মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা এবং নিরাপত্তা প্রদানের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে সবসময় তৎপর থাকতে হবে।
এদেশের সহজ-সরল খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ শান্তিতে বসবাস করতে চায়। ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট যেন নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি না করতে পারে সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। স্বৈরাচারী সরকারের আমলে রমজান মাস এলেই অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট নিত্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি করত। কিন্তু এবারের রমজানে সরকারের কঠোর নজরদারিতে নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যেই ছিল। আগামীতে কোনো ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট যেন আর গড়ে না উঠতে পারে সেদিকে নজর রাখতে হবে।
৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর জনমানুষের প্রত্যাশা ছিল দেশের রাজনীতির অঙ্গনে পরিবর্তন আসবে। রাজনৈতিক দলগুলো দেশ ও মানুষের জন্য রাজনীতি করবে, সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার ভাষায় কথা বলবে। কিন্তু তা না করে ক্ষমতা দখলের নেশায় রাজনীতিচর্চা করছে কোনো কোনো দল। আতঙ্কের বিষয় হলো, রাজনৈতিক দলগুলোর পাতি নেতা পর্যন্ত প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি, জবরদখলসহ নানা অপকর্ম করে যাচ্ছে। মানুষ দেশের এই সংকট সন্ধিক্ষণের পরিস্থিতিতে এমন চাঁদাবাজি ও দখলের রাজনীতি প্রত্যাশা করে না। মানুষ চায় সুষ্ঠু গণতন্ত্রের রাজনীতি- যে রাজনীতি তাদের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অধিকার আদায়ে সোচ্চার থাকবে।
জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের ছাত্রনেতৃত্বের হাত ধরে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) মাঠে এসেছে। গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণ, দেশ ও জনগণের স্বার্থরক্ষা, দাসত্বমুক্ত বাংলাদেশ গড়া, পরিবারতন্ত্রমুক্ত গণতান্ত্রিক রাজনীতিচর্চা, চাঁদাবাজ ও দখলদারমুক্ত জনকল্যাণমুখী রাজনীতি করার কথা বলছে তরুণদের এই দলটি। কিন্তু বাংলাদেশের কলুষিত রাজনৈতিক অঙ্গনে দলটি তাদের প্রতিশ্রুতি ধরে রাখতে পারে কি না, তা আগামী দিনে প্রমাণ হবে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে পুরোনো রাজনৈতিক কলহ, ক্ষমতা দখলের রাজনীতি, স্বৈরাচারী সরকার, দুর্নীতি, অপশাসন, অপরাজনীতি, গণহত্যা, জনগণের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতন, বাকস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, অসাংবিধানিক কর্মকাণ্ড, আইনের অপপ্রয়োগ, ক্ষমতার অনধিকারচর্চা, রাতের ভোট, নাগরিক অধিকার হরণ এদেশের জনগণ আর দেখতে চায় না। জনগণ চায় রাজনৈতিক দলগুলো দেশ ও মানুষের কল্যাণে রাজনীতি করুক।