সংকটকালে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে না পারায় আমাদের জাতীয় জীবনে যেমন অনেক বিপর্যয় নেমে এসেছে, তেমনি সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে আমরা রক্ষাও পেয়েছি। আবার শক্তির মদমত্ততা, রাগ ও প্রতিশোধের স্পৃহা থেকে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো কতটা ভুল হতে পারে, তা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার দলবলের বিপর্যয় দেখে বোঝা যায়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার দলবলের এই পরিণতি দেখে এটা উপলব্ধি করা যায়, বাধাবন্ধনহীন প্রবল শক্তি মানুষকে হিতাহিত জ্ঞান শূন্য করে দেয়।
একবার বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এক জেনারেল আমার এক বন্ধুকে বলেছিলেন, কঠিন সময়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টিই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তারপর ইতিহাস বিচার করবে, সে সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল, না সঠিক ছিল। তিনি তখন সাভারস্থ নবম ডিভিশনের জিওসি ছিলেন। পরবর্তী সময়ে সেনাপ্রধান হওয়ার পর তার সঙ্গে আমার দেখা হলে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
তিনি হচ্ছেন জেনারেল নূরুদ্দীন খান। সেই সাক্ষাতের ঘটনাটি ঘটেছিল রাষ্ট্রপতি এরশাদের পতনের পর ঢাকা সেনানিবাসে তার বাসায়। এখানে উল্লেখ করতে হয়, বিগত ৫৪ বছরে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং না নেওয়ার দোদুল্যমানতায় আমাদের জাতীয় জীবনে যেমন অনেক হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে, তেমনিভাবে আবার সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণে কীভাবে বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো গেছে, তাও আমরা প্রত্যক্ষ করেছি।
নিশ্চয় নব্বইয়ের এরশাদবিরোধী সেই গণআন্দোলনের কথা অনেকের মনে আছে। তখন ভয়াবহ এক অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল। রাস্তায় নেমে এসেছিল হাজার হাজার ছাত্র-জনতা। আন্দোলন দমাতে এরশাদ কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করলে জনতা আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এরই মধ্যে গুলিতে ডা. শামসুল আলম মিলনের নিহত হওয়ার ঘটনায় ঘিয়ে আগুন দেওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। সারা দেশে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। যেমনটা ’৬৯ সালে আসাদ নিহত হওয়ার পর ঘটেছিল। যেমনটা এবার রংপুরে আবু সাঈদের শহীদ হওয়ার ঘটনায় ’২৪-এর জুলাই বিপ্লবে ছাত্র-জনতার বিস্ফোরণ ঘটেছিল।
জেনারেল এরশাদ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। এতে পরিস্থিতি আরো নাজুক হয়ে পড়ে। এ রকম সংকটকালে সেনাপ্রধান জেনারেল নূরুদ্দীন খান কালবিলম্ব না করে সেই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করেন। তিনি ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে রাষ্ট্রপতি এরশাদকে বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে সমাধানের পরামর্শ দেন। জেনারেল এরশাদ তখন সামরিক শাসন জারির কথা বললে সেনাবাহিনী তাতেও অস্বীকৃতি জানায়। এ অবস্থায় সেনাপ্রধানের নির্দেশে সিজিএস মেজর জেনারেল সালাম সরাসরি রাষ্ট্রপতি এরশাদকে পদত্যাগ করার কথা বললে তিনি বুঝে ফেলেন, তার সরকারের ওপর সেনাবাহিনীর আর কোনো সমর্থন নেই। তিনি ১৯৯০ সালের ৪ ডিসেম্বর পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন এবং ৬ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেন। সে সময় সেনাপ্রধান নূরুদ্দীন খানের সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ দেশকে ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছিল।
পক্ষান্তরে ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারির সেই হৃদয়বিদারক দিনটির কথা নিশ্চয় এ জাতি কখনো ভুলবে না। সেদিন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদের সিদ্ধান্ত নিতে না পারার ব্যর্থতায় তথাকথিত বিডিআর বিদ্রোহের নামে সেনাবাহিনীর এক মেজর জেনারেলসহ ৫৭ ঊর্ধ্বতন অফিসারকে হত্যার নিষ্ঠুরতম ঘটনাটি ঘটে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কিত অধ্যায় হিসেবে চিরকাল বিবেচিত হবে। অথচ সেনাপ্রধান ইচ্ছা করলেই নিজের অফিসারদের বাঁচানোর জন্য পিলখানায় সেনা অভিযান চালাতে পারতেন। যেমন করে ’২৪-এর আন্দোলনে জনগণের ওপর গুলি চালানোর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আদেশ অমান্য করেছেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, ঠিক যেমনটা করেছিলেন জেনারেল নূরুদ্দীন খান। কিন্তু জেনারেল মইন ইউ আহমেদ সে পথে না হেঁটে প্রমাণ করেছেন, তিনি ষড়যন্ত্রকারীদের একজন এবং নিজ বাহিনীর সঙ্গে এটা ছিল তার চরম বিশ্বাসঘাতকতা।
’২৪-এর ছাত্র-জনতার বিপ্লবের সময় জেনারেল নূরুদ্দীন খানের মতোই সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানও অফিসারদের সঙ্গে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু জেনারেল মইন ইউ কোনো পন্থাই অবলম্বন না করে ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকাণ্ডটি শুধু প্রত্যক্ষই করেছিলেন। মনে হচ্ছিল তিনি আগে থেকেই সব জানতেন।
এসব ছাড়াও ব্যক্তি ও রাজনৈতিক জীবনে সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করলে কিংবা ব্যর্থ হলেও ভয়াবহ বিপর্যয়ে পড়তে হয়। আবার সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারলে সাফল্যও পাওয়া যায় হাতেনাতে। ১৯৮৬ সালে এরশাদের নীলনকশার নির্বাচনে বিএনপির অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। সে সময় শেখ হাসিনার সঙ্গে এরশাদের আঁতাতের মূল লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগকে সংসদে বিরোধী দল করা। আর বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলে হবে তৃতীয় পার্টি। বিএনপি এটা বুঝতে পেরে ওই নির্বাচনে অংশ নেয়নি। এর সুফল বিএনপি লাভ করে এরশাদের পতনের পর অনুষ্ঠিত ১৯৯১ সালের নির্বাচনে। সেই নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে সক্ষম হয়।
আবার ২০০৯ সালে আরেকটি নীলনকশার নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিএনপি মারাত্মক ভুল করেছিল। তখন বিভিন্ন মহল থেকে বিএনপিকে নির্বাচনে অংশ নিতে নিষেধ করা হয়েছিল। কারণ ওটা জেনারেল মইন ইউ ও শেখ হাসিনার আঁতাতের নির্বাচন ছিল। সিদ্ধান্ত ছিল বিএনপি ৩০ থেকে ৪০টি আসন পাবে। ওই নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বিএনপির সিদ্ধান্ত কতটা ভুল ছিল, তা নির্বাচনের ফলাফলে প্রমাণিত হয়।
এখানেই শেষ নয়, ১৯১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপির যোগদান করা অপরিহার্য ছিল। কিন্তু সেই নির্বাচন বয়কট করে বিএনপি কেবল দলের নয়, গোটা দেশের বিপর্যয় ডেকে এনেছিল। বলা যায়, ওই বয়কট শেখ হাসিনাকে বেপরোয়া এক নিষ্ঠুর শাসকে পরিণত করে। তার মধ্যে একটি বদ্ধমূল ধারণা জন্মায় যে, তিনি, আওয়ামী লীগ ও রাষ্ট্র একটি পরিপূরক শক্তি। আর এই ধারণাই তাকে ফ্যাসিস্ট করে তুলেছিল। তিনি নিজেকে এতটাই ক্ষমতাবান ভাবা শুরু করেন যে, তিনি নিয়তির কথা ভুলেই গিয়েছিলেন। কিংবা নিয়তি হয়তো তার নির্ধারিত পথে তাকে (শেখ হাসিনা) পরিচালিত করেছে। কী ভয়ংকর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। যত খুশি তত মানুষ হত্যা করে হলেও ক্ষমতায় টিকে থাকতে চেয়েছিলেন। তিনি সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত স্বাধীন জীবনযাপন স্তব্ধ করে দিয়েছিলেন। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, নির্বাচন, বিচার পাওয়ার অধিকার, মুক্ত চিন্তা, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ইত্যাদি সবকিছুকে নিজের ইচ্ছাধীন করে চরম এক ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম করেছিলেন। তার কর্মী ও সমর্থকরা তার (শেখ হাসিনা) সব সিদ্ধান্তকে ঐশ্বরিক বলে মনে করে থাকে। যেমন করে শেখ মনি বলতেন, ‘বঙ্গবন্ধুর’ আদেশই আইন। স্বাধীনতার পর ১৯৭২-’৭৫ সালে সেই দুঃস্বপ্নের দিনগুলোয় যখন আইনের শাসনের দাবি প্রবল হয়ে উঠেছিল, তখন যুবলীগ সভাপতি শেখ মনি ওই মন্তব্য করেছিলেন। এই যে ‘কাল্ট’ বা ব্যক্তিপূজার রাজনীতি, তার অবধারিত পরিণতি কেবল কোনো ব্যক্তি বা দলের বিপর্যয় নয়, গোটা জাতিকে বিপদগ্রস্ত করে ফেলে।
শেখ হাসিনা তার পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনপদ্ধতি অনুসরণ করে নিজেকে সর্বগ্রাসী করে তুলেছিলেন। উভয়ই জনগণের মধ্যে গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা প্রবল করে দিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার পর সর্বগ্রাসী হয়ে পড়েছিলেন। তারা সর্বগ্রাসী শাসন প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোকে ভুল ভাবা তো দূরের কথা, বরং জনগণের কল্যাণ হিসেবে দেখে থাকে। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংসদে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করাকে শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘এটাও গণতন্ত্র’, ‘শোষিতের গণতন্ত্র’। পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনা তার পিতার ওই মন্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে একদলীয় বাকশালী শাসনকে যুক্তিগ্রাহ্য করার চেষ্টা করে বলেছিলেন, যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য ‘বঙ্গবন্ধু’ একদলীয় বাকশাল সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি নিজেও সেই উন্নয়নের কথা বলে তার সর্বগ্রাসী ফ্যাসিবাদী শাসনকে ‘গণতান্ত্রিক শাসন’ হিসেবে দেখানোর অপচেষ্টা চালিয়েছেন। সীমাহীন দম্ভ ও অহংকার তাকে সর্বগ্রাসী করে তুলেছিল। তাই তো তিনি দম্ভভরে বলতেন, আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করার ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। নেতাকর্মীরাও সে ভাষায় কথা বলতেন। যেমন আওয়ামী লীগের নেতা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম ২০২৩ সালের ২৫ ডিসেম্বর চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলায় এক জনসভায় বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করার ক্ষমতা কারো নেই।’ এই একই কথা প্রতিধ্বনিত হয় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব-উল আলম হানিফের মন্তব্যে। তিনি ২০২৩ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় বেইলি রোডে মহিলা সংস্থায় একটি পুস্তকের মোড়ক উন্মোচক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করার ক্ষমতা এ দেশের কোনো দলের নেই।’ এসবই ছিল ভুল সিদ্ধান্তের প্রতিশ্রুতি।