হোম > মতামত

ইরাক থেকে শিক্ষা নেয়নি ইসরাইল

ম্যাক্সিমিলান হেস

ইরানের বিরুদ্ধে ১৩ জুন নয়া যুদ্ধ শুরু করার ইসরাইলের সিদ্ধান্ত একটি বিপর্যয়ের সূচনা মাত্র। এই যুদ্ধে ইসরাইল বা অন্য কোনো পক্ষই উপকৃত হবে না। বরং দেশ দুটির অসংখ্য সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগের শিকার হবে।

পাল্টাপাল্টি হামলায় ইতোমধ্যেই দুদেশেই অনেক সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছে। ইরানে শীর্ষ কয়েকজন জেনারেলসহ নিহতের সংখ্যা ২৫০ জনের বেশি। ইসরাইলে নিহতের সংখ্যা ২০ জন বলা হলেও, প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি এবং হামলায় দেশটির বিভিন্ন অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

ইসরাইলের ইতিহাসে এবারই প্রথম তেল আবিব, জেরুজালেম ও হাইফাসহ বিভিন্ন নগরী লন্ডভন্ড হয়ে গেছে ইরানের হামলায়। ইরানে ইসরাইলের আকস্মিক হামলা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট, অতীতে এ অঞ্চলে বিশেষ করে ইরাকে পশ্চিমাদের ব্যর্থ সামরিক অ্যাডভেঞ্চারের ব্যর্থতা থেকে কোনো শিক্ষাই নেয়নি ইসরাইল। বরং তা পুরোপুরিই উপেক্ষা করা হয়েছে।

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানে হামলাকে দেশটির পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা থেকে বিরত রাখার ‘আগাম প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। আর এটা করতে গিয়ে তিনি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ ও সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের ইরাকে ‘আগাম প্রতিরোধমূলক হামলা’র মতো কৌশলগত ভুলেরই পুনরাবৃত্তি ঘটিয়েছেন। এই দুই সাবেক পশ্চিমা শাসকও ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের কথিত ‘ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র’ ধ্বংস করার জন্য দেশটিতে ‘আগাম প্রতিরোধমূলক হামলা’ করেছিলেন।

ইসরাইলি যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্রগুলো মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের আকাশ পেরিয়ে ইরানে গিয়ে দেশটির সামরিক স্থাপনা ও সেনা কমান্ডারদের অবস্থানে ব্যাপক হামলা চালায়। ইরাকে আগ্রাসন চালিয়ে বুশ ও ব্লেয়ার বিশ্বকে একটি বিপর্যয়ের মুখে ফেলেছিলেন। নেতানিয়হুও একইভাবে বিনা উসকানিতে ইরানে হামলা করে ইতোমধ্যেই অস্থিতিশীল হয়ে পড়া মধ্যপ্রাচ্যকে আরো বেশি অস্থিতিশীলতার মুখে ঠেলে দিয়েছেন।

নেতানিয়াহুর দাবি, ইরানে হামলার লক্ষ্য ছিল দেশটির পরমাণু অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনের সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করে দেওয়া। ইসরাইলি বাহিনী ইরানের তিনটি পরমাণু কেন্দ্র নাতাঞ্জ, ইসফাহান ও ফরদোতে হামলা চালিয়ে এগুলোর ব্যাপক ক্ষতি করেছে। কিন্তু এই হামলা ইরানের পরমাণু কর্মসূচিটি বন্ধ করতে পারবেÑএমন সম্ভাবনা খুবই কম। নেতানিয়াহু নিজেও এ কথা ভালো করে জানেন।

ইরান তার নাতাঞ্জ পরমাণু কেন্দ্রটি মাটির অনেক নিচে একটি সুরক্ষিত বাংকারে নির্মাণ করেছে। শক্তিশালী বাংকারবিধ্বংসী বোমা ছাড়া এই পরমাণু কেন্দ্র ধ্বংস করা কারো পক্ষে সম্ভব হবে না।

এই পরমাণু কেন্দ্র স্থায়ীভাবে ধ্বংস করার মতো সামরিক শক্তি ও সক্ষমতা ইসরাইলের নেই। যে বোমা দিয়ে এটি ধ্বংস করা সম্ভব, তা শুধু যুক্তরাষ্ট্রই তৈরি করে। অনেক আগে থেকেই এই বোমা ইসরাইলকে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। এমনকি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলেও এটি দেওয়া হচ্ছে না ইসরাইলকে। সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন এই ইঙ্গিত দিয়েছে, তারা তেল আবিবকে এই অস্ত্র সরবরাহ করবে না।

ইরানে হামলার পর ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতিক্রিয়ায় এটি পুরোপুরি স্পষ্ট নয়, তেল আবিব ইরানে হামলার ব্যাপারে ঠিক কতটুকু অবহিত করেছে ওয়াশিংটনকে। ইসরাইলের প্রাথমিক হামলার পর মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তারা এই হামলা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে দূরে রাখার চেষ্টা করেন। তারা এই হামলাকে ‘একতরফা’ ইসরাইলি অভিযান হিসেবে বর্ণনা করেন। কিন্তু এর কিছুক্ষণ পরই ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি ইরানে ইসরাইলের হামলার ব্যাপারে পুরোপুরি অবহিত ছিলেন।

এ হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্টতা ও অনুমোদন কতটা ছিল, তা এখনো একটি বড় প্রশ্ন হয়ে আছে। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে নতুন একটি চুক্তি করার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাম্প্রতিক সময়ে যে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো হয়, তা যে সফল হচ্ছে না, সেটি অনেকটাই নিশ্চিত। স্বল্প মেয়াদে হলেও এটি নেতানিয়াহুর জন্য একটি বড় বিজয়।

তবে ইরানের বিরুদ্ধে আরো বেশি সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা নির্ভর করছে এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রকে জড়িত করার ওপর। নেতানিয়াহুর জন্য এটি বলতে গেলে একটি বড় ধরনের জুয়ার চাল। এই চালে তিনি জিততেও পারেন, হারতেও পারেন। এর ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে ট্রাম্পের উপদেষ্টাদের ওপর। কারণ ট্রাম্পের কয়েকজন শীর্ষ উপদেষ্টা সামরিক হস্তক্ষেপের নীতির ঘোরবিরোধী। এমনকি ট্রাম্প নিজেও যুক্তরাষ্ট্রের অতীতের এই নীতিতে এখন পরিবর্তন আনতে চান। ইরান ও হামাসের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি আলোচনায় বসা তার এই নীতিরই প্রতিফলন।

ইরানে ইসরাইলের সামরিক পদক্ষেপ ইতোমধ্যেই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়িয়ে দিয়ে ট্রাম্পের অন্য কয়েকটি দিকের স্বার্থকে হুমকির মুখে ফেলেছে। একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে তার সম্পর্ককেও জটিল করে তুলেছে এই হামলা। কারণ এই সংঘাতের ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানিবাহী জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে তা উপসাগরীয় দেশগুলোর বাণিজ্যিক স্বার্থকে ক্ষুণ্ণ করবে।

যদি দেখা যায়, ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতে ইসরাইল জিতে যাচ্ছে, তাহলে ট্রাম্প এটাকে তার বিজয় হিসেবে দাবি করবেন। কিন্তু নেতানিয়াহুর কৌশল থেকে যদি এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলার চেষ্টা করছেন, তখন ট্রাম্প আবার তাকে ছুড়ে ফেলবেন।

যুদ্ধের বর্তমান যে পরিস্থিতি, তাতে নেতানিয়াহু যদি আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ইরানে পরমাণু বোমা হামলার মতো সিদ্ধান্ত না নেন, তাহলে ইসরাইলের জয়লাভের কোনোই সম্ভাবনা নেই। দেশটির বিজয়ী হওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ও সহযোগিতা অনিবার্য হয়ে পড়বে।

এই যুদ্ধে নেতানিয়াহুর দ্বিতীয় টার্গেট হচ্ছে ইরানে সরকার পরিবর্তন করা, যা এখনো পর্যন্ত অনেক দূরের বিষয় বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। নেতানিয়াহু ইরানের জনগণকে তাদের বর্তমান ইসলামপন্থি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।

কিন্তু ইরানে ইসরাইলের একতরফা সামরিক আগ্রাসনে ক্ষুব্ধ দেশটির সাধারণ মানুষ। তারা নেতানিয়াহুর ডাকে সাড়া দেবেÑএমন সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। বরং এ হামলার পর ইরানের জনগণ তাদের সরকারের পরমাণু কর্মসূচির প্রতিই জোরালো সমর্থন জানাবেন।

কিন্তু ইসরাইল যদি হামলা অব্যাহত রেখে ইরানে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে সক্ষমও হয়, তা এই অঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনবে না। ইরাকে ইঙ্গ-মার্কিন সামরিক আগ্রাসনে সাদ্দাম হোসেনের পতনের ঘটনা থেকে নেতানিয়াহুর শিক্ষা নেওয়া উচিত। সাদ্দাম সরকারের পতনের পর রাষ্ট্র হিসেবে ইরাক কার্যত ভেঙে পড়ে এবং উগ্রপন্থি বিভিন্ন সংগঠনের জন্ম হয়, যার অন্যতম হলো ইসলামিক স্টেট বা আইএস।

এ কথা নিশ্চিত করেই বলা যায়, ইরানে ক্ষমতার মসৃণ পালাবদল করার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ ইসরাইলের সামনে নেই। ইরান দখল করে সেখানে নিজেদের পছন্দের সরকার বসানোর মতো কোনো কিছু করার ক্ষমতা নেই নেতানিয়াহুর। কারণ দুই দেশের মধ্যে কোনো সীমান্ত নেই।

এ ধরনের কোনো উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ অপরিহার্য। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের আমলে তা ঘটবে বলে মনে হয় না। কারণ, তারা এ ধরনের কোনো পদক্ষেপ নিলে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে ইরানের আঘাত হানার ঝুঁকি বেড়ে যাবে।

অন্যভাবে বলতে গেলে, নেতানিয়াহুর এই হামলা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা ভন্ডুল করে দিয়ে ইরানের পরমাণু আকাঙ্ক্ষা অর্জনকে সাময়িক বিলম্বিত করবে। এটা ইসরাইলের জন্য স্বল্পমেয়াদি কৌশলগত সুবিধা এনে দিতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে তা দীর্ঘ মেয়াদে কৌশলগত বিপর্যয়ও বয়ে আনবে।

লেখক : আমেরিকান থিংক ট্যাংক ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ফেলো

আল-জাজিরা থেকে অনুবাদ : মোতালেব জামালী

পিলখানার অসমাপ্ত অধ্যায়

হাদি হত্যায় ভারত এবং গোয়েন্দা স্লিপার সেল

ইচ্ছাকৃত রাজনৈতিক সংকট

সিরিয়ায় ওয়াইপিজির বিলুপ্তি ইরাকের জন্য সতর্কবার্তা

চিন্তার স্বাধীনতা বনাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব

বিধ্বস্ত শিক্ষাব্যবস্থা

ভাষার কোনো বিদেশ নেই, নেই কোনো খাঁচা

নৌবিদ্রোহ ও রাজনীতির বিশ্বাসঘাতকতা

চ্যালেঞ্জের মুখে খামেনির নেতৃত্ব ও ইসলামি বিপ্লব

শব্দের রাজনীতি, ক্ষমতার ভয়