বাংলাদেশের রাজনীতির সংকটের মূলে রয়েছে সাংস্কৃতিক সংঘাত। ঐতিহাসিকভাবে সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীরা ইসলামবিরোধিতার নামে সাধারণ মুসলমানদের প্রান্তিক করেছে। তাই ইসলামবিদ্বেষ থেকে সরে না এলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। দুই কিস্তির এ লেখায় এ বিষয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।]
বাংলাদেশ রাষ্ট্র জন্ম থেকে রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে আবর্তিত হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ একটি সংহত রাজনৈতিক কাঠামো হিসেবে রূপ লাভ করতে পারছে না। পৃথিবীর অনেক দেশে রাজনৈতিক সংকট আছে; তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট বা অন্তর্দ্বন্দ্ব সম্ভবত ভিন্ন ধরনের। এ দেশের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের মূলে রয়েছে সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব। আমরা সাধারণত এই সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্বকে এড়িয়ে রাজনীতি বিশ্লেষণ করতে চাই। ফলে দ্বন্দ্ব বা সংঘাতের মূলে যাওয়া সম্ভব হয় না এবং আমরা ধারাবাহিকভাবে এ সংঘাতের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছি। বুদ্ধিজীবী মহলের প্রধান অংশ, যাদের আমরা উপনিবেশিত এলিট (colonized elite) এবং জঙ্গি সেক্যুলার (militant secular) হিসেবে বিবেচনা করি, ইতিহাসকে একটি একরৈখিক প্রপঞ্চ হিসেবে দেখতে এবং ইতিহাসের দীর্ঘ পথ ও বহুমাত্রিক রূপকে অস্বীকার করতে আগ্রহী। আমাদের বিবেচনায় সংকট সমাধানের ব্যর্থতা এখানে নিহিত। বুদ্ধিজীবী শ্রেণির অন্য অংশটি গত ৫০ বছরে অনেকটা অ্যাপোলোজেটিকভাবে টিকে থেকেছে, ফলে রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে তাদের ভূমিকা বা প্রভাব গৌণ ও প্রান্তিক।
২০২৪-এর বিপ্লবের পর অনেক কিছু নতুন করে বিশ্লেষণের সুযোগ ও অনিবার্যতা তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রাজনীতির অন্তর্গত সংকট বিশ্লেষণের চেষ্টা করা প্রয়োজন, যেখানে বাংলাদেশের দীর্ঘ ইতিহাসের বিভিন্ন বাঁকের ওপর গুরুত্বারোপ করা দরকার। আমাদের বিশ্লেষণে এটি স্পষ্ট, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সংঘাত, যা রাজনৈতিক সংঘাতের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছেÑসেক্যুলার মিলিট্যান্ট বুদ্ধিজীবীরা কর্তৃক মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাঠামোগত অবিচার ও বৈষম্য করার কারণে সৃষ্টি হয়েছে। একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশের জনগণকে অবজ্ঞা, অসম্মান এবং অবহেলা করে নিজ দেশে প্রান্তিক ও গৌণ করা হয়েছে। সাধারণ মুসলমানের মানবাধিকার ও রাজনৈতিক অভিপ্রায়কে শোষণমূলক শাসন কাঠামো পরিচর্যাকারী শাসক শ্রেণির সহায়তায় সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী শ্রেণি হিসাবের বাইরে নিয়েছে। কিন্তু মুসলিম চেতনা এমনই এক চিরন্তন ও নৈতিক স্ফুলিঙ্গ যে তা সব বাধা উপেক্ষা করে নিজের অস্তিত্বের জানান দেয়। ফলে বাংলাদেশের মতো মুসলিম রাষ্ট্রে মুসলমানের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং আকাঙ্ক্ষাকে মর্যাদা দেওয়া ছাড়া রাজনৈতিক সমঝোতা সৃষ্টি করা অসম্ভব।
পোস্ট-কলোনিয়াল রাষ্ট্র এবং মিলিট্যান্ট ও ইসলামবিদ্বেষী সেক্যুলার এলিট বুদ্ধিজীবী শ্রেণির মানস গঠন
ব্রিটিশ উপনিবেশের শৃঙ্খল ভেঙে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়, যার একটি অংশ ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান, যা আবার ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ নামে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি লাভ করে। ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক ভারতীয় উপমহাদেশের শাসনভার গ্রহণের আগে বাংলাদেশ অঞ্চল মুসলিম শাসনের অংশ ছিল, যা মোটামুটি ১২০৬ থেকে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। যদিও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কার্যত ১৭৫৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশে তাদের শাসন শুরু করে। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শাসনভার গ্রহণ করে। ব্রিটিশ থেকে স্বাধীনতা লাভের জন্য ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে মুসলমানরা ব্যাপক সংগ্রাম গড়ে তোলে। অন্যদিকে হিন্দু এলিট শ্রেণি, যারা ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত এবং নতুন পুঁজি তৈরির প্রক্রিয়ার অংশীদার ছিলেন তারা নিজস্ব সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও রাজনৈতিক কারণে ব্রিটিশ শাসনের সঙ্গে সহযোগিতা করে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে মুসলিম স্বার্থের বিপরীতে অবস্থান গ্রহণ করে। এ রকম একটি জটিল রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়। পাকিস্তান রাষ্ট্র নানা কারণে শুধু উপমহাদেশের মুসলমানদের জন্য নয়; বরং মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি ‘ড্রিম পলিটিক্যাল প্রজেক্ট’ হিসেবে বিবেচিত হয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে পাকিস্তান রাষ্ট্রের নেতৃত্ব এ রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি ও স্বপ্ন বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়। প্রতিষ্ঠার কয়েক বছরের মধ্যে পাকিস্তান সেনা শাসনের মধ্যে নিমজ্জিত হয়, যা আজও চলমান।
পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনে পূর্ববাংলার মুসলমানদের অবিস্মরণীয় অবদান ছিল। ১৯৪৬ সালে প্রাদেশিক নির্বাচনে মুসলিম লীগ পূর্ববঙ্গে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে, যা পরে পাকিস্তান নামক রাজনৈতিক প্রকল্প বাস্তবায়নে সহায়তা করে। কিন্তু সুশাসন ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হওয়ার কারণে পাকিস্তান রাষ্ট্র পূর্ববাংলার বুদ্ধিজীবী শ্রেণির কাছে ক্রমেই একটি অপাঙ্ক্তেয় প্রকল্পে পর্যবসিত হতে থাকে। ব্রিটিশ শাসনের অবসানের আগে বা পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক যে নতুন বুদ্ধিজীবী শ্রেণি গড়ে ওঠে, তারা ব্রিটিশ সরকারের উচ্চশিক্ষা বৃত্তির কারণে ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় অধ্যয়নের সুযোগ পায় এবং ফলে ইউরোপীয় রেনেসাঁ এবং আধুনিকায়ন তত্ত্ব (modernization theory) দ্বারা প্রবলভাবে প্রভাবিত হয়। এই বুদ্ধিজীবী শ্রেণির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আগে থেকে কলকাতাকেন্দ্রিক এনলাইটেনমেন্ট দ্বারা মোহগ্রস্ত ছিল। ইউরোপীয় ধ্যান-ধারণা ও জ্ঞানতত্ত্ব, আধুনিকায়ন তত্ত্ব এবং কলকাতার সাংস্কৃতিক প্রভাবে বুদ্ধিজীবী শ্রেণির এ অংশটি পাকিস্তান ও ইসলামকে সমান্তরালভাবে বিবেচনা করে এবং পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরোধিতাকে ইসলামের বিরোধিতা হিসেবে গণ্য করাকে ন্যায্যতা দান করে। এভাবে তারা পাকিস্তানবিরোধিতার ইসলামবিদ্বেষী তত্ত্ব এবং কাঠামো ও বয়ান তৈরি করে। ১৯৫০ এবং ১৯৬০-এর দশকের কমিউনিস্ট আন্দোলন এ ধারাকে আরো বেগবান করে। ইউরোপীয় সেক্যুলারিজম রাষ্ট্র ও ধর্মের মধ্যে একটি ভারসাম্যমূলক পার্থক্য তৈরি করলেও পূর্ব পাকিস্তানের সেক্যুলার ঘরানার বুদ্ধিজীবী শ্রেণি মুসলমানদের অধিকারকে অস্বীকার করার নীতি গ্রহণ করে। ফলে পূর্ব পাকিস্তানের সেক্যুলার আন্দোলন বস্তুত মুসলিমবিদ্বেষী রাজনৈতিক অবস্থানের সমার্থক হয়, যা পরে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আরো বেগবান ও বল্গাহীন হয়।
পোস্ট কলোনিয়াল পাকিস্তান রাষ্ট্রে ইসলামবিদ্বেষী সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীর প্রাধান্য ও প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় সমাজে বিভেদের ক্ষত গভীর হতে থাকে। মুসলমান পরিচয় ক্রমেই প্রান্তিক অবস্থানে যায়। মূলত, এটি ১৯৩০-৪০-এর দশক থেকে শুরু হয়। পাকিস্তান স্বাধীনের আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হিন্দু শিক্ষকদের প্রভাব বেশি ছিল এবং কলকাতার সাংস্কৃতিক ধারা এবং হিন্দু-মুসলমান দ্বন্দ্ব ঢাকার রাজনৈতিক পরিবেশ এবং অবস্থানকে প্রভাবিত করত, যা পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পরও চলে। হিন্দু উগ্রবাদীদের কর্তৃক ১৯৪৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নাজির আহমদের শাহাদাত মুসলমানদের বিরুদ্ধে হিন্দু ও সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীদের সাম্প্রদায়িক ও হিংস্র মানসিকতাকে তুলে ধরে। পরে ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামপন্থি ছাত্র আবদুল মালেকের শাহাদাত পূর্ব পাকিস্তানে মুসলমান পরিচয়কে আবার চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে। এটি স্পষ্ট হতে থাকে, পাকিস্তানবিরোধী সেক্যুলারদের আন্দোলন বস্তুত মুসলমানদের পরিচয় ও মূল্যবোধকে প্রান্তিক করার প্রয়াসে পরিচালিত। যার কারণে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ব পাকিস্তানে মুসলমানদের প্রান্তিক করার বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া মুসলিম সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণে দ্বিধান্বিত করে।
পরে তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতায় মুসলিম বুদ্ধিজীবী শ্রেণির একটি বিরাট অংশ এবং ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রায় সবাই ‘পাকিস্তান রক্ষার প্রত্যয়ে’ বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের বিপরীতে রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করে। তবে স্বাধীনতাযুদ্ধে অসংখ্য মানুষের নিহত হওয়া এবং চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে স্বাধীন বাংলাদেশে ইসলামি রাজনীতি এবং চিন্তাধারা বৈরী পরিবেশের মুখোমুখি হয় এবং এর ভিত্তিতে সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী শ্রেণির ইসলামবিদ্বেষ চূড়ান্ত পর্যায়ে যায়। ১৯৭১-এর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর কোনো স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় বিচারের ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় তা শাসকশ্রেণির রাজনৈতিক পুঁজিতে পরিণত হয় এবং শাসকশ্রেণি ধারাবাহিকভাবে এটিকে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বকে টিকিয়ে রাখতে ব্যবহার করে।
পোস্ট কলোনিয়াল পাকিস্তানে সেক্যুলার বুদ্ধিজীবিতা শুরু থেকে ইসলামবিদ্বেষী তত্ত্বকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। অর্থাৎ এ শ্রেণি মুসলমানদের স্বতন্ত্র পরিচয়বোধ, মূল্যবোধ এবং রাজনৈতিক অধিকারকে অস্বীকার করার প্রাতিষ্ঠানিক নীতি গ্রহণ করে। বিভিন্ন সময় আন্তর্জাতিক নীতি ও রাজনীতি এ প্রক্রিয়াকে বেগবান করে। ৯/১১-এর প্রেক্ষাপটে ‘মুসলমানদের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধ’ নীতি শাসকশ্রেণি ও সেক্যুলার মহলকে মুসলিম নিধনের বৈধতা দেয়। ২০০৮-২৪ পর্যন্ত মুসলমানদের ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন সত্ত্বেও ইউরোপীয় ও ভারতীয় ঔপনিবেশিক মূল্যবোধ দ্বারা প্রভাবিত বুদ্ধিজীবী শ্রেণি, মানবাধিকারকর্মী, সম্পাদকমণ্ডলী, রাজনৈতিক গোষ্ঠী কোনো প্রতিবাদ করেনি। বরং ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধকে পাটাতন হিসেবে ব্যবহার করে ইসলামকে চূড়ান্তভাবে ধ্বংস করার রাজনীতিকে বৈধতা প্রদান করে।
সেক্যুলার জঙ্গি বৃদ্ধিজীবী শ্রেণির ‘পছন্দমাফিক বিচার’ পদ্ধতি (সিলেকটিভ জাস্টিস) ও সমাজে ঘৃণার চাষ
১৮৮৫ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশ শুরু হয়। ভারতীয় কংগ্রেস ব্রিটিশ সরকার প্রভাবিত এবং হিন্দু এলিট কর্তৃক পরিচালিত একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। মুসলমানদের স্বার্থের সুরক্ষা না থাকায় ১৯০৬ সালে ঢাকায় মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়, যা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে হিন্দু ও সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী সমাজ সিলেকটিভ বিচার পদ্ধতি ও সমাজে ঘৃণার চাষকে উৎসাহিত করে। এটি পূর্ব পাকিস্তান ও ১৯৭১-পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশে ব্যাপক বিস্তার লাভ করে। মুসলমানদের ইতিহাস-ঐতিহ্য সমাজ মানস থেকে সরিয়ে দেওয়ার পদ্ধতি ক্রমেই শক্তিশালী হয়। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এসব কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। মুসলমানদের সাংস্কৃতিক পরিচয়, তথা দাড়ি, টুপি, হিজাব ঘৃণা ও বৈষম্যের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।
এ প্রসঙ্গে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হচ্ছে, ১৯৭০-এর শেষ দিক থেকে সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী এলিটরা পাশ্চাত্য থেকে অকাতরে আর্থিক সহায়তা লাভ করতে থাকে এবং সিভিল সোসাইটি এবং এনজিওর নামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। পাশ্চাত্যের আদর্শ ও মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার অ্যাজেন্ডাকে সামনে রেখে তারা ‘ওয়ার অন টেরর’ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে। সিভিল সোসাইটির এ অংশ বৈশ্বিক নলেজ-ইকোসিস্টেমের অংশ হয়ে জঙ্গিবাদ দমনের নামে মুসলিম ও ইসলামবিরোধী বয়ানকে প্রতিষ্ঠা করে। সমাজে মুসলিম পরিচয়কে এতটাই ক্রিমিনালাইজ করা হয় যে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মুসলিম ছাত্রছাত্রীরা প্রকাশ্যে নামাজ-পর্দা করতে ভয় পান। প্রকাশ্য ধর্মীয় প্রতীকের কারণে অনেকে চাকরিচ্যুত হয়, চাকরিতে পদোন্নতিবঞ্চিত হন এবং এমনকি চাকরি লাভের সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। জঙ্গি অর্থনীতির দোহাই দিয়ে প্রতিষ্ঠিত ও সফল ব্যাংককে দখল করা হয়। এর ফলে আর্থিক ও ব্যাংক খাতে কী প্রভাব হতে পারে, সে বিষয়েও এই সেক্যুলার গোষ্ঠী ন্যূনতম কাণ্ডজ্ঞান দেখাতে পারেনি।
শুধু দাড়ি-টুপি-হিজাব এবং ইসলামি বিশ্বাসের কারণে প্রথিতযশা বুদ্ধিজীবীরা সমাজ থেকে হারিয়ে যান। আল মাহমুদের মতো শক্তিশালী কবি, যিনি স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, সমাজে কোনো স্থান পাননি। প্রফেসর সৈয়দ আলী আহসান, যিনি শুধু স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশ নেননি; বরং বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের ইংরেজি তর্জমা করেছিলেন, তিনিও অপাঙ্ক্তেয় হন। নজরুল সাহিত্যকে পরিকল্পিতভাবে উপেক্ষা করা হয়। ড. ইন্নাস আলী, ড. শমসের আলীর মতো প্রথিতযশা বিজ্ঞানীদের তরুণদের কাছে অপরিচিত করে রাখা হয়। এমনকি প্রফেসর আবু হেনা মোস্তফা কামালের সাহিত্য কৃতিকে অবজ্ঞা করা হয়। সব্যসাচী সাহিত্য সমালোচক আব্দুল মান্নান সৈয়দও হারিয়ে যান। ছোট গল্পকার শাহেদ আলী উল্লেখহীন আমাদের সাহিত্য ইতিহাসে। পণ্ডিত এবনে গোলাম সামাদ অজানা থেকে যান। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ড. মোহর আলী, ড. এমএ করিম যথার্থ মর্যাদা পাননি। হাবিলদার রজব আলী, হাজি শরীয়তুল্লাহ, তিতুমীর, দুদু মিয়াদের ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অবদান ছাত্রদের জানতে দেওয়া হয়নি। বাহাদুর শাহ পার্কে আজাদির জন্য নিবেদিত মুসলমানদের নির্যাতনের ইতিহাস নিয়ে সামান্য আলোচনাও হয়নি। অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও সম্মানের সঙ্গে সূর্য সেন ও প্রীতি লতাকে স্মরণ করা হয়। এ রকম অসংখ্য উদাহরণ আছে যে শুধু মুসলমান হওয়ার কারণে অনেকে যথাযথ মর্যাদা ও স্বীকৃতি লাভ করতে পারেননি।
অনেক সৎ, নিষ্ঠাবান সরকারি কর্মকর্তা শুধু ইসলামি বিশ্বাসের কারণে যোগ্য স্থান পাননি। সেক্যুলার বৃদ্ধিজীবী শ্রেণির কাঠামোগত ঘৃণা চাষের কারণে সমাজে বৈষম্য ও অধিকারহীনতার সংস্কৃতি শক্তিশালী রূপ লাভ করে। মুসলমানদের প্রতি বৈরিতা ও ঘৃণা এবং হিন্দুদের প্রতি সহানুভূতি সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীদের পরিকল্পিত রাজনৈতিক প্রকল্পের অংশ হিসেবে ক্রিয়াশীল। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সেক্যুলারিজমের দোহাই দিয়ে গণমাধ্যম ও ব্যক্তির কণ্ঠ রোধ করা হলেও সেক্যুলার মিলিট্যান্ট বুদ্ধিজীবীরা কখনোই তার প্রতিবাদ করেনি। এসব বুদ্ধিজীবী এবং তাদের বশংবদ গণমাধ্যম ‘শাহবাগের বিচারহীন হত্যা’ এবং ‘শাপলা গণহত্যা’র মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে হিংসার বীজ স্থায়ী করে দিয়েছে। শাহবাগ ও শাপলায় ন্যূনতম ন্যায়বিচার এবং মানবাধিকার বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। পশ্চিমের দাস, জাতীয় স্বার্থবিনাশী, মানবতাবোধহীন সেক্যুলার বুদ্ধিজীবীরা চূড়ান্ত মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো দুষ্কর্মের জন্য সামান্যতম অনুশোচনা করেনি। এসব উপনিবেশিত এলিট নাটক-সিনেমায় মুসলমান এবং মুসলমানদের ধর্মীয় প্রতীককে যুগের পর যুগ ধরে হেয়প্রতিপন্ন করেছে; কিন্তু এ জন্য কোনো আত্মসমালোচনা করেনি।
ভাষাভিত্তিক জাতীয়তা ও রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণ
১৯৬০-এর দশক থেকে পূর্ব পাকিস্তানে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তা ও রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণের জন্য আন্দোলন পরিচালিত হয়। সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী শ্রেণি স্বাধীন বাংলাদেশের তাত্ত্বিক কাঠামো তৈরিতে বাঙালি জাতীয়তাবাদকে ব্যবহার করা শুরু করে। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের সাংস্কৃতিক ও মূল্যবোধকে ধারণ করে বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদ তত্ত্ব নির্মাণ করা হয়। ফলে ইসলাম এবং ইসলামি মূল্যবোধ কাঠামো রাষ্ট্রের নাগরিকদের পরিচয় ও ভাবনা থেকে কার্যত প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পৃথক হয়। এই সর্বনাশা প্রক্রিয়া জাতিকে ক্রমেই মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্ত করে ফেলে।
বাংলা ভাষার প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশ ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসনামলে হলেও বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তির মধ্যে মুসলমান এবং ইসলামের কোনো প্রভাব রাখা হয়নি। বরং বাঙালি তথা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ ইসলামি পরিচয়ের অ্যান্টি থিসিস হিসেবে পরিগণিত হয়। ইসলামি পরিচয় ও দর্শনের বিপরীতে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক প্রকল্প হিসেবে বাঙালি জাতীয়তাবাদকে উপস্থাপন করা হয়। বাঙালি জাতীয়তাবাদকে রাজনৈতিক প্রকল্প হিসেবে হাজির করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ এবং তৎপরবর্তী রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ভারতের ব্যাপক প্রভাব অন্যতম প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। বিগত অর্ধশতাব্দীর রাজনৈতিক উন্নয়ন পর্যালোচনায় এটি স্পষ্ট যে, ভারত বাংলাদেশকে স্বাধীন নয়; বরং একটি protectorate রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে বেশি আগ্রহী।
বাঙালি জাতীয়তাবাদ যেহেতু একটি ইহলৌকিক রাজনৈতিক প্রপঞ্চ, ফলে এ জাতীয়তাবাদ এবং তৎসংশ্লিষ্ট সাংস্কৃতিক প্রভাবে সমাজে নৈতিকতা দ্রুত হ্রাস পায় এবং সমাজ একটি অন্তঃসারশূন্য অবস্থায় যায়। প্রতিটি সমাজ টিকে থাকে নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা ও লালনের ওপর। কিন্তু ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদে নৈতিকতার সূত্র আশা করা যায় না। ভাষাভিত্তিক রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণের কারণে বিগত ৫০ বছরে সমাজ থেকে ইসলামি পরিচয় ম্রিয়মাণ ও ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। তরুণ শ্রেণিকে ইসলামি সাহিত্য ও মূল্যবোধ চর্চা থেকে দূরে রাখার জন্য সর্বোচ্চ বল ও শক্তি প্রয়োগ করা হয়। রাষ্ট্রের coercive instruments এবং institutions খুব দক্ষতার সঙ্গে শাসকশ্রেণির ইসলাম নির্মূলের রাজনৈতিক কর্মসূচিকে সহায়তা করে। ব্যক্তির মতো রাষ্ট্রেরও আধ্যাত্মিক শক্তির প্রয়োজন হয়। ইউরোপীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা খ্রিষ্টীয় মূল্যবোধ দ্বারা রাষ্ট্রীয় আধ্যাত্মিকতার বুনিয়াদ নির্মাণ করেছে। ফলে রাষ্ট্র ও খ্রিষ্ট ধর্মের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে। একইভাবে ভারত রাষ্ট্র বহু ভাষিক, বহু জাতির ও ধর্মের হলেও রাষ্ট্রীয় মূল্যবোধ নির্মাণে হিন্দু ধর্ম ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশ সমাজে সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী সমাজের হীনম্মন্যতার কারণে উল্টো ঘটনা ঘটেছে; সমাজ থেকে ইসলামকে নির্মূলের প্রকল্পকে শক্তিশালী করা হয়েছে। বর্তমানে যেসব সামাজিক কুসংস্কার, দুর্নীতি, অবিচার দেখা যাচ্ছে, যেসব সংকটের মূলে রয়েছে জাতীয় পরিচয়ে দার্শনিক মূল্যবোধের ঘাটতি থাকা। ভাষিক জাতীয়তাবাদ দার্শনিক ও নৈতিক মূল্যবোধ তৈরি করতে পারে না।
লেখক : পাবলিক পলিসি বিশেষজ্ঞ ও ইউরোপের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাফিলিয়েটেড গবেষক