হোম > মতামত

মুসলিম জোট: মিনি-ন্যাটোর উত্থান?

শাহীদ কামরুল

প্রাচীন রোমের কলোসিয়ামে যেমন একসময় সিংহ আর যোদ্ধার দ্বন্দ্ব হতো, তেমনি আজকের বিশ্বমঞ্চেও নতুন কলোসিয়াম তৈরি হয়েছে। সেখানে দুই যোদ্ধা—পাকিস্তান ও সৌদি আরব—হাত মিলিয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের জোট যেন গ্রিক পুরাণের দুই দেবতার অঙ্গীকারের মতো, যেখানে জিউস শপথ নিতেন সমুদ্রদেব পোসেইডনের সাথে, আকাশে ঝড় উঠলে সাগরও গর্জে উঠবে। দীর্ঘকাল ধরে পাকিস্তান ছিল যেন ট্রয়ের হেক্টরের মতো—নিজেকে একা রক্ষা করতো, কিন্তু জানতো, তার বিপরীতে আছে শক্তিশালী “আকিলিস”—অর্থাৎ ভারত। অন্যদিকে সৌদি আরব ছিল স্পার্টার রাজা মেনেলাউসের মতো—ধনসম্পদে প্রভাবশালী, কিন্তু সামরিক শক্তিতে সীমিত। এবার তারা দুজন মিলে বানালো এক নতুন ট্রোজান ঘোড়া—যেটি শুধু অস্ত্রশস্ত্র নয়, বরং সভ্যতার পরিচয়ও বহন করে। আর বাংলাদেশ? সে হলো এই কাহিনির ছোট্ট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ নগররাষ্ট্র—যেমন করিন্থ বা ডেলফি। তার চারপাশের দানবীয় সাম্রাজ্য যখন লড়াইয়ে মত্ত, তখন তাকে খুব সতর্ক থাকতে হয়, যেন কারো হাতিয়ার না হয়ে পড়ে। কখনো সুবিধা পেতে পারে, কিন্তু ঝুঁকিও আছে। শেষ পর্যন্ত এ গল্প এক আধুনিক মহাকাব্য। পাকিস্তান ও সৌদি আরবের চুক্তি শুধু সমসাময়িক রাজনীতি নয়—এ যেন ইলিয়াড–এর নতুন সংস্করণ। পার্থক্য শুধু, এখন তরবারি ও ঢাল নেই; আছে পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র আর তেলের রিজার্ভ। আর প্রতিটি খেলোয়াড় জানে, হেক্টরের মৃত্যু যেমন ট্রয় ধ্বংস করেছিল, তেমনি ভুল পদক্ষেপ গোটা অঞ্চলকে আগুনে পুড়িয়ে দিতে পারে।

আদতে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে সময়ে সময়ে এমন কিছু ঘটনা ঘটে যা কেবল দুটি দেশের সীমিত জোট নয়, বরং গোটা অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেয়। সম্প্রতি পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে স্বাক্ষরিত নিরাপত্তা চুক্তি এমনই একটি যুগান্তকারী ঘটনা, যা দক্ষিণ এশিয়া এবং বৃহত্তর এশীয় মহাদেশে নতুন ধাক্কা তৈরি করেছে। কয়েক দশক ধরে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি অলিখিত নিরাপত্তা চুক্তি কার্যকর ছিল। এর মূল মর্মকথা ছিল—যদি সৌদি আরব কোনো বড় ধরনের আক্রমণের শিকার হয়, তাহলে পাকিস্তান তার পারমাণবিক সক্ষমতা ব্যবহার করে প্রতিক্রিয়া জানাবে। কিন্তু ইতিহাসে কখনো উল্টোটা ঘটেনি; পাকিস্তান যখন আক্রান্ত হয়েছে, সৌদি আরব তখন নিরপেক্ষ থেকেছে। এবার সেই অবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটলো। পাকিস্তান যদি আগামী দিনে আক্রান্ত হয়, তবে সেটাকে সৌদির বিরুদ্ধে আক্রমণ হিসেবে ধরা হবে, এবং সৌদি আরবও যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়বে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির ভাষায় এটি “Collective Defense Doctrine” বা যৌথ প্রতিরক্ষা নীতি, যা ন্যাটোর অনুরূপ। এটি প্রথমবারের মতো কোনো দুটি মুসলিম রাষ্ট্র বাস্তবে কার্যকর করলো।

এই চুক্তি বাস্তববাদী (Realist) দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাষ্ট্রগুলোর মূল চালিকাশক্তি হলো নিরাপত্তা ও টিকে থাকা। হান্স মরগেনথাউ বা কেনেথ ওয়াল্টজের বাস্তববাদ অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক অরাজকতার ভেতরে রাষ্ট্রগুলো নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য জোট বাঁধে। পাকিস্তান জানে তার মূল শত্রু ভারত একটি পরাশক্তি হওয়ার পথে, এবং ভারতীয় রাজনীতিতে পাকিস্তান-বিরোধী উন্মাদনা জনপ্রিয়তার হাতিয়ার। অন্যদিকে সৌদি আরব জানে, ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলো যে কোনো সময় আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। তাই উভয় রাষ্ট্রের মধ্যে নিরাপত্তা নির্ভরতা (Security Interdependence) তৈরি হলো।

তবে এ চুক্তিকে শুধু বাস্তববাদ দিয়ে ব্যাখ্যা করলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। উদারবাদ (Liberalism) বলে যে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, প্রতিষ্ঠান ও পারস্পরিক নির্ভরতা যুদ্ধ ঠেকাতে সক্ষম। রবার্ট কিওহেন ও জোসেফ নাইয়ের "Complex Interdependence" ধারণা অনুযায়ী, রাষ্ট্রগুলো অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে একে অপরের সাথে এতটাই জড়িয়ে পড়ে যে সংঘাত কমে আসে। পাকিস্তান–সৌদি সম্পর্ক এ দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরব পাকিস্তানকে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করবে, আর পাকিস্তান সামরিক দিক দিয়ে সৌদির নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। এখানে আমরা পারস্পরিক নির্ভরতার স্পষ্ট চিত্র দেখতে পাচ্ছি। আলেকজান্ডার ওয়েন্ডটের গঠনবাদী (Constructivist) দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কেবল শক্তি ও অর্থনীতির খেলা নয়; বরং ধারণা, পরিচয় ও আদর্শও গুরুত্বপূর্ণ। মুসলিম বিশ্বের ভেতরে একটি “ইসলামি প্রতিরক্ষা জোট” গড়ে তোলার চিন্তা আদতে একটি পরিচয়ভিত্তিক কৌশল। পশ্চিমা বিশ্বের ন্যাটো যেখানে খ্রিস্টীয় সভ্যতার ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার বহন করছে, সেখানে পাকিস্তান–সৌদি জোট মুসলিম বিশ্বের জন্য বিকল্প এক সভ্যতাগত শক্তি হিসেবে দাঁড়াচ্ছে। বোধ করি এই চুক্তি ভবিষ্যতে আরও বড় জোটে রূপ নিতে পারে। কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, এমনকি তুরস্কও এতে যুক্ত হতে পারে। তখন এটি মুসলিম বিশ্বের একটি “মিনি ন্যাটো”তে পরিণত হবে। পাকিস্তান এর কেন্দ্রে থাকবে তার পারমাণবিক শক্তির কারণে। চীন এই জোটকে সমর্থন করবে কারণ এতে ভারত দুর্বল হবে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত আরও আক্রমণাত্মক কূটনীতি শুরু করতে পারে। আর বাংলাদেশকে সতর্ক থাকতে হবে, যেন এই আঞ্চলিক সংঘাতের বলি না হয়।

যাইহোক, পাকিস্তান–সৌদি প্রতিরক্ষা চুক্তিকে যদি আমরা স্যামুয়েল পি. হান্টিংটনের বহুল আলোচিত Clash of Civilizations তত্ত্বের আলোকে দেখি, তাহলে এটি সভ্যতাগত ব্লকের জন্ম দেওয়ার ইঙ্গিত বহন করে বলে গুমান করি। হান্টিংটন যুক্তি দিয়েছিলেন যে ঠান্ডা যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বিশ্ব আর কেবল আদর্শবাদ বা অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার কারণে বিভক্ত হবে না; বরং সভ্যতা ও সংস্কৃতির ভিত্তিতেই বড় সংঘাত তৈরি হবে। তার মতে, ইসলামিক সভ্যতা এবং পশ্চিমা সভ্যতার মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত অনিবার্য। পাকিস্তান–সৌদি জোট আসলে সেই সভ্যতাগত ঐক্যের প্রতিফলন, যেখানে মুসলিম রাষ্ট্রগুলো নিজেদেরকে আলাদা এক শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করছে। ন্যাটো যেমন খ্রিস্টীয় পশ্চিমা ঐতিহ্যের নিরাপত্তা কাঠামো, তেমনি এই চুক্তি ইসলামি সভ্যতার মধ্যে এক ধরনের প্রতিরক্ষা ব্লক তৈরি করবে। ভারতের মতো রাষ্ট্র, যা হান্টিংটনের ভাষায় “হিন্দু সভ্যতার কেন্দ্র”, স্বাভাবিকভাবেই এই মুসলিম জোটের বিপরীতে অবস্থান করবে এবং এর ফলে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা তৈরি হবে। অন্যদিকে এডওয়ার্ড সাঈদের Orientalism আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গি প্রায়শই “পূর্ব” বা মুসলিম সমাজকে একরৈখিকভাবে, হুমকিস্বরূপ ও পশ্চাৎপদ হিসেবে উপস্থাপন করে। হান্টিংটনের তত্ত্বও সমালোচিত হয়েছে এই কারণে—কারণ এটি ইসলামি সভ্যতাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংঘাতপ্রবণ বলে চিত্রিত করে। এটি আসলে মুসলিম বিশ্বের পাল্টা-বর্ণনা (Counter-narrative), যেখানে তারা পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে নিজেদের নিরাপত্তা, আত্মপরিচয় ও ঐক্যের কাঠামো দাঁড় করাচ্ছে। পশ্চিমা শক্তিগুলো সবসময় মুসলিম বিশ্বের অভ্যন্তরে বিভাজন বজায় রাখতে চেয়েছে, কিন্তু এই চুক্তি তার উল্টো দিক—একটি ঐক্যবদ্ধ সভ্যতাগত পরিচয়ের রাজনীতি। হান্টিংটন ও সাঈদের দৃষ্টিভঙ্গি পাশাপাশি রাখলে বোঝা যায়, পাকিস্তান–সৌদি চুক্তি দ্বিমুখী অর্থ বহন করে। একদিকে এটি হান্টিংটনের ভবিষ্যদ্বাণীর সাথে মিলে যাচ্ছে, কারণ এটি সভ্যতা–ভিত্তিক ব্লক রাজনীতির জন্ম দিচ্ছে। অন্যদিকে এটি সাঈদের সমালোচনাকেও সত্য প্রমাণ করছে, কারণ মুসলিম রাষ্ট্রগুলো পশ্চিমা আধিপত্যবাদী বর্ণনাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে নিজেদের বিকল্প ঐতিহাসিক পরিচয় ও ঐক্য তৈরি করছে। ফলে পাকিস্তান–সৌদি প্রতিরক্ষা চুক্তি কেবল নিরাপত্তার হিসাব নয়; এটি সভ্যতাগত রাজনীতির এমন এক নতুন অধ্যায়, যা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তত্ত্ববিদদের জন্য ভবিষ্যতে বড় কেস স্টাডি হয়ে থাকবে।

পাকিস্তানের ভূরাজনৈতিক অবস্থান এখানে বিশেষভাবে আলোচ্য। দক্ষিণ এশিয়ায় একমাত্র মুসলিম পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র পাকিস্তান। তার কাছে আছে প্রতিরোধ (Deterrence) নীতি—অর্থাৎ শক্তিশালী প্রতিশোধের আশঙ্কা তৈরি করে শত্রুকে যুদ্ধ থেকে বিরত রাখা। এডওয়ার্ড লুটওয়াক বা থমাস শেলিং-এর মতো কৌশলবিদরা দেখিয়েছেন যে পারমাণবিক শক্তি আসলে যুদ্ধ কমিয়ে আনে, কারণ এর পরিণতি উভয় পক্ষের জন্য ধ্বংসাত্মক। পাকিস্তান এতদিন পর্যন্ত একা এই নীতি অনুসরণ করলেও এখন সৌদি আরবকে পাশে পেয়ে এর কার্যকারিতা দ্বিগুণ হলো। অন্যদিকে সৌদির হাতে আছে বিপুল অর্থ, তেল ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, যা পাকিস্তানের সামরিক যন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করবে। চীন থেকে অস্ত্র, সৌদি থেকে টাকা আর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো–এ ত্রয়ী শক্তি পাকিস্তানকে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করছে।

সৌদির জন্যও এই জোট সমান তাৎপর্যপূর্ণ। এতদিন ধরে সৌদি মূলত অর্থনৈতিক শক্তি, ধর্মীয় প্রভাব ও সফট পাওয়ারের উপর নির্ভর করতো। কিন্তু ইরান, কাতার বা তুরস্কের মতো আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলো ক্রমশ সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হচ্ছে। তাই সৌদি জানে, কেবল অর্থের উপর নির্ভর করলে হবে না, সামরিক জোটও প্রয়োজন। পাকিস্তানের সাথে চুক্তি করে সৌদি দেখালো যে তারা মুসলিম বিশ্বে নিজেদের নেতৃত্ব বজায় রাখতে চায়। একই সঙ্গে ভারত–পাকিস্তান সংঘাত হলে সৌদি সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে না গিয়েও ভারতীয় শ্রমিকদের বহিষ্কার করার মাধ্যমে বিশাল কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারবে। এটি নরম শক্তিকে (Soft Power) কাজে লাগানোর এক অভিনব কৌশল।

ভারতের জন্য এই চুক্তি এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা। ভারতীয় রাজনীতিতে পাকিস্তানকে আক্রমণ করা বা নিয়ে কটূক্তি করা এক ধরনের “পপুলার স্পোর্টস”। কিন্তু এখন পাকিস্তান আক্রমণ মানে সৌদি আক্রমণ—যা সরাসরি মুসলিম বিশ্বের বৃহৎ অংশকে সংঘাতে টেনে নেবে। ভারতের অভ্যন্তরীণ উগ্র জাতীয়তাবাদী শক্তিগুলোর কাছে এটা বড় ধাক্কা। একই সঙ্গে ভারত–আমেরিকা সম্পর্কের টানাপোড়েনের কারণে ভারতের কূটনৈতিক বিকল্পও সীমিত হচ্ছে। আমেরিকা পাকিস্তানকে চাপে রাখার জন্য ভারতকে ব্যবহার করতো, কিন্তু এখন চীন–সৌদি–পাকিস্তান জোট ভারতের চারপাশে নতুন এক নিরাপত্তা ঘেরাটোপ তৈরি করছে।

এই নতুন আঞ্চলিক পরিস্থিতির নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশকে সামলাতে হবে। ভারতের উগ্র জাতীয়তাবাদীরা এখন পাকিস্তানকে সরাসরি আক্রমণ করার পরিবর্তে বাংলাদেশকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে পারে। কারণ পাকিস্তানের সাথে সংঘাত করলে সৌদি আরবসহ মুসলিম বিশ্বের একাংশ জড়িয়ে পড়বে, কিন্তু বাংলাদেশের সাথে সংঘাত করলে সে ঝুঁকি নেই। ইতিহাস বলে, বাংলাদেশ বহুবার ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বলি হয়েছে। সীমান্তে গুলি, অভিবাসন, জলবণ্টন বা আঞ্চলিক উগ্রতা—সবই নতুন করে মাথাচাড়া দিতে পারে। তাই বাংলাদেশের জন্য কূটনৈতিক সতর্কতা ও বহুমুখী সম্পর্ক গড়ে তোলা জরুরি। এই পুরো ঘটনাকে আমরা দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকেও ব্যাখ্যা করতে পারি। টমাস হোবস বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক অরাজকতা এক ধরনের “War of All against All”, যেখানে প্রত্যেকে বাঁচার জন্য লড়াই করে। পাকিস্তান–সৌদি জোট হোবসীয় নিরাপত্তাহীনতার প্রতিক্রিয়া। অন্যদিকে জন লক বলেছিলেন, মানুষ বা রাষ্ট্র চুক্তির মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে। এই চুক্তি লকীয় সামাজিক চুক্তির প্রতিরূপ। ফুকো’র ক্ষমতা তত্ত্ব অনুযায়ী, রাষ্ট্র শুধু সামরিক শক্তির মাধ্যমে নয়, বরং জ্ঞান, অর্থনীতি ও সামাজিক কৌশলের মাধ্যমে ক্ষমতা বিস্তার করে। পাকিস্তান–সৌদি জোট এই ক্ষমতাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে। গ্রামশির হেজেমনি ধারণা দিয়ে বললে, মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব কে নেবে—সৌদি না ইরান—এখনো সেই সাংস্কৃতিক আধিপত্যের লড়াই চলছে।

সবশেষে বলা যায়, পাকিস্তান–সৌদি প্রতিরক্ষা চুক্তি দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন এক অধ্যায় রচনা করলো। এটি শুধু দুই দেশের নিরাপত্তা জোট নয়, বরং মুসলিম বিশ্বের ভেতরে একটি সভ্যতাগত ঐক্যের চেষ্টাও। পাকিস্তান এখন কার্যত দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত হলো, কিন্তু এর ফলাফল শুধু পাকিস্তান বা ভারতের জন্য নয়; বাংলাদেশ ও গোটা অঞ্চলের জন্যও সুদূরপ্রসারী হতে পারে। আগামী দিনে এই চুক্তি এশিয়ার রাজনৈতিক মানচিত্রকে যেভাবে বদলে দেবে। বাংলাদেশের জন্য তাই বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি জরুরি। চীন, সৌদি, তুরস্ক, ইউরোপ ও আমেরিকা—সব দিকেই কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। পাকিস্তান–সৌদি জোট বাংলাদেশকে একধরনের সুযোগও দিচ্ছে। মুসলিম বিশ্বের ঐক্যের আলোচনায় বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি উঠতে পারে। তবে একইসাথে ঝুঁকি আছে—ভারতীয় জাতীয়তাবাদী শক্তি বাংলাদেশকে আরও বেশি চাপ দিতে চাইতে পারে। এই অপদার্থ সরকারকে বলবো লন্ডনে গিয়ে কাটিগিরি,আসন ভাগাভাগি ও সমঝোতা না করে আর কোন দেশের রাষ্ট্রদূতকে লন্ডনে না পাঠিয়ে বাংলাদেশের স্বার্থ আয়েন্দা দিনগুলোতে কিভাবে রক্ষা করা যাবে সেই ব্যাপারে নিবিড়ভাবে কাজ করার জন্য।

লেখক: সাবেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, লেখক ও গবেষক, ফ্রাই ইউনিভার্সিটি বার্লিন, জার্মানি। গবেষণার আগ্রহ: উপনিবেশ ও উত্তর-উপনিবেশ, আধুনিকতা ও উত্তর-আধুনিকতা (ইংরেজি সাহিত্য), সংস্কৃতি, উপমহাদেশ ভাগ, পরিবেশ, রাজনীতি, ধর্মতত্ত্ব ও ইতিহাস।

সিরিয়ায় ওয়াইপিজির বিলুপ্তি ইরাকের জন্য সতর্কবার্তা

চিন্তার স্বাধীনতা বনাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব

বিধ্বস্ত শিক্ষাব্যবস্থা

ভাষার কোনো বিদেশ নেই, নেই কোনো খাঁচা

নৌবিদ্রোহ ও রাজনীতির বিশ্বাসঘাতকতা

চ্যালেঞ্জের মুখে খামেনির নেতৃত্ব ও ইসলামি বিপ্লব

শব্দের রাজনীতি, ক্ষমতার ভয়

নতুন প্রধানমন্ত্রীর শুরুটা কেমন হলো

কূটনীতিক, পণ্ডিত ও বাংলাদেশের বন্ধু

কৃষি পর্যটন : টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত