হোম > মতামত

জুলাই আন্দোলনের কারণে ভেঙে গেল নিউ ইয়র্ক বইমেলা

মনজুর আহমদ

নিউইয়র্কের আসন্ন বইমেলা নিয়ে এখন এক উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ৩৪ বছর ধরে একটানা চলে আসা এই আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলায় এবার ভাঙন ধরেছে। আর কদিন পরেই অনুষ্ঠিত হতে চলেছে এ বছরের মেলাটি। এই নগরীর ‘নন্দন’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া জ্যামাইকার পারফর্মিং আর্টস সেন্টারের মনোরম পরিবেশে চার দিনব্যাপী এই মেলা শুরু হবে আগামী ২৩ মে। এখানকার বাংলাদেশিদের প্রধান উৎসবে পরিণত হওয়া তাদের এই ‘প্রাণের মেলা’ এবার এক অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। মেলার কাছাকাছি সময়ে এসে ঘটে গেছে মেলার আয়োজকদের মধ্যে বিভক্তি। পদত্যাগ করেছেন মেলা আয়োজনের শীর্ষ ব্যক্তি মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের সভাপতি ড. নূরুন নবী।

কিন্তু হঠাৎ কেন এই ভাঙন? হঠাৎ কেন ড. নূরুন নবীর পদত্যাগ? দীর্ঘদিন ধরে যাদের সঙ্গে একাট্টা হয়ে কাজ করলেন, বইমেলার আয়োজন করলেন, হঠাৎ কেন তাদের সঙ্গে বিরোধ বাধল তার? প্রকাশ্যে যে কারণটি বেরিয়ে এসেছে তা হলো, বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার জুলাই অভ্যুত্থানের প্রতি মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের অধিকাংশ কর্মকর্তার সমর্থন। বলা হয়েছে, ওই আন্দোলন মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের দ্বারা সংগঠিত, ওই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন দান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী কাজ। তাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার যারা বিরোধী তাদের সঙ্গে একত্রে কাজ করা সম্ভব নয় বলেই তার এই পদত্যাগ। আরো একটি কারণ ড. নবী তার বিবৃতিতে প্রকাশ্যে উল্লেখ করেছেন যে, এবারের বইমেলার উদ্বোধক হিসেবে কথাসাহিত্যিক সাদাত হোসাইনকে আমন্ত্রণ জ্ঞাপন। তাকে আমন্ত্রণ জ্ঞাপনের বিরোধিতা করে তিনি লিখেছেন, সাদাত হোসাইন ‘সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী লেখকদের প্রতিনিধি হিসেবে ঢাকায় চিহ্নিত’। শুধু এটুকুই নয়, সাদাতের বিরুদ্ধে তার আরো অভিযোগ—‘তিনি জুলাই সন্ত্রাসের পক্ষে সক্রিয় ছিলেন। রাজপথে মাইক হাতে নেমে দখলদার ইউনূসের গভীর ষড়যন্ত্রকে সমর্থন করেছিলেন। আগস্ট থেকে এই অবৈধ সরকারের দোসর হিসেবে কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন...’ প্রভৃতি আরো কত কথা। এমন একজন মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী লেখককে নিউইয়র্ক বইমেলা উদ্বোধনের জন্য আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়টি ড. নবী মেনে নিতে পারেননি। কিন্তু কারা সাদাত হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানোর সিদ্ধান্ত নিলেন? এ সিদ্ধান্ত ড. নবীরই নেতৃত্বাধীন মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের নির্বাহী কমিটির। শুনেছি এ সিদ্ধান্ত এই নির্বাহী কমিটির সর্বসম্মত। এমনকি ড. নবীও নাকি সভায় কোনো আপত্তি করেননি। পরে হঠাৎ করেই তিনি এই মূর্তিতে আবির্ভূত হয়েছেন।

আসলে হঠাৎ করেই নয়, নিউইয়র্কের এই ঐতিহ্যবাহী বইমেলা নিয়ে বিতর্ক তোলা হচ্ছে বেশ কয়েক মাস আগে থেকেই। জুলাই আন্দোলনের ব্যাপকতা এবং হাসিনার পতনে হতাশ হয়ে পড়া নিউইয়র্কের একটি মহল নিজেদের ক্ষোভকে আর গোপন রাখতে পারেনি। তারা এখন নানাভাবে তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন। এখানে আওয়ামী লীগ করা হাসিনা শাসনামলের সুবিধাভোগীরা এমন আকস্মিক অকল্পনীয় পরিস্থিতিতে স্তম্ভিত হয়ে পড়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতি, সহসভাপতি প্রভৃতি পদে দীর্ঘদিন ধরে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিরা বাংলাদেশে হাসিনার আনুকূল্যে কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, ব্যাংক-বীমা প্রভৃতি ব্যবসা বাগিয়ে নিয়েছিলেন। সেসব ব্যবসায়ে নানা অপকীর্তি করে তারা বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক হয়ে গেছেন। স্বাভাবিকভাবেই তাদের চোখে অন্ধকার নেমে এসেছে। তারাই তাদের সমর্থকদের নিয়ে ব্যানার হাতে রাস্তায় নেমেছেন। আর নেমেছেন আওয়ামী লীগপন্থি, কিংবা আরো স্পষ্ট করে বললে বলতে হয়, হাসিনার ভক্ত সুশীল ব্যক্তিরা। এরা এতদিন পর্যন্ত সবার সঙ্গে মিলেমিশে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করতেন, রবীন্দ্র, নজরুল, লালন উৎসব করতেন, এমনকি সুচিত্রা সেন স্মরণোৎসব করে সেখানেও বিশিষ্টজনদের সমাবেশ ঘটাতেন। এখন দেখা যাচ্ছে, তারা তাদের উদার সর্বজনীনতার মুখোশ খুলে ফেলেছেন। হাসিনার পতনের পর ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ রক্ষার স্লোগান নিয়ে তারা রাস্তায় নেমে এসেছেন। হাসিনা বা আওয়ামী লীগ মানেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের আর তাদের বিরোধিতা মানেই মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী, এমন সহজ সরলীকরণ তত্ত্ব নিয়ে তারা নিউইয়র্কে হাসিনাকে পুনরুদ্ধারে তৎপর হয়ে উঠেছেন।

তবে এরাই নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটির সব নয়; কমিউনিটির সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ এদের সঙ্গে রয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। জুলাই আন্দোলনের সমর্থনে সে সময় টাইমস স্কয়ারে বাংলাদেশিদের স্বতঃস্ফূর্ত যে বিরাট সমাবেশ হয়েছিল, তা রীতিমতো এক ইতিহাস। এমন কোনো পাল্টা সমাবেশ হাসিনা সমর্থকরা এখন পর্যন্ত করতে পারেননি। বাঙালিপ্রধান জ্যাকসন হাইটসে ক্ষুদ্রতর সব সমাবেশে তারা তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।

হাসিনা বা আওয়ামী লীগের সমর্থনে বড় আয়োজনে কিছু করতে না পারলেও তারা সাফল্যজনকভাবে একটি কাজ করতে পেরেছেন। তারা এখানকার বুদ্ধিজীবী মহল বা সুশীল সমাজকে দ্বিধাবিভক্ত করে দিয়েছেন। জুলাই আন্দোলনের পক্ষে এই প্রবাসে যারা অবস্থান নিয়েছিলেন, তাদের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী আখ্যা দিয়ে কমিউনিটিতে তারা বিভাজন সৃষ্টি করেছেন। সাহিত্য কিংবা সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে যেসব অনুষ্ঠান-উৎসব এতদিন সম্মিলিতভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছিল, বিভাজিত কমিউনিটিতে সেসব অনুষ্ঠান আর হতে দেখা যাচ্ছে না। বিভাজন ঘটে গেছে এসব অনুষ্ঠানের আয়োজকদের মধ্যে, বিভাজন ঘটে গেছে সার্বিকভাবে প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটিতে। নিউইয়র্ক ছাড়া পৃথিবীর আর কোথাও হাসিনা-সমর্থকরা এমন সক্রিয় কি না আমার জানা নেই। সংখ্যায় কম হলেও কথায় কথায় তারা রাস্তায় নামছেন। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের প্রতিবাদেও কিছু লোক বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন।

মুক্তধারার বইমেলা নিয়ে হাসিনা-সমর্থকরা সক্রিয় হয়ে উঠেছিলেন মেলাটি তাদের দখলে নেওয়ার জন্য। ড. নবীর একজন সমর্থক স্পষ্টভাবেই লিখেছেন, ‘আমরা সবাই জানি দেশ আজ অবৈধ দখলদার স্বেচ্ছাচারীদের কুক্ষিগত। চক্রান্তের মাধ্যমে একটি প্রগতিশীল নির্বাচিত সরকারের পতন ঘটিয়ে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি মুছে দিতে চাইছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। তাই এবারের বইমেলা দেশের এই ক্রান্তিকালে স্বাধীনতার সপক্ষে সুদৃঢ় অবস্থান নিয়ে উদ্‌যাপিত হবে, এমনটাই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।’ কবে, কোন সভায় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তা তিনি উল্লেখ করেননি। তাদের ক্ষোভ বইমেলার কয়েকজন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে, যারা প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছিলেন জুলাই আন্দোলনের পক্ষে। ড. নূরুন নবীকে সামনে নিয়ে এই মহলটি তাদের লক্ষ্য হাসিলের চেষ্টা করেছে। উল্লেখ করা যেতে পারে, যাদের বিরুদ্ধে তাদের অভিযোগ, তারাই দীর্ঘদিন ধরে এই বইমেলা পরিচালনা করে আসছেন। এতদিন তাদের বিরুদ্ধে এদের কোনো ক্ষোভ ছিল না। সবাইকেই তারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হিসেবে সম্মান জানাতেন। কিন্তু যখনই এই ব্যক্তিরা যার যার অবস্থান থেকে একান্ত ব্যক্তিগতভাবে জুলাই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানালেন এবং হাসিনার গণহত্যার নিন্দা করলেন, তখনই হাসিনা অনুসারী মহলটি এদের বিরোধিতায় মুখর হয়ে উঠলেন। ড. নবী একজন মুক্তিযোদ্ধা, কাদের সিদ্দিকীর কাদেরিয়া বাহিনীতে ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তার স্মৃতিচারণমূলক কয়েকটি বই রয়েছে। এই বইগুলোর জন্য তিনি কয়েক বছর আগে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তার অনুরাগীরা তাকে ‘আজীবন মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে অভিহিত করে থাকেন এবং এই শিরোনামে তার ওপর একটি তথ্যচিত্রও নির্মাণ করেছেন। তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় এবং প্রায় ৩০ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি পদে অধিষ্ঠিত রয়েছেন।

ড. নবী শুধু মুক্তধারা থেকে পদত্যাগই করেননি, তিনি সঙ্গে সঙ্গেই পাল্টা একটি বইমেলা অনুষ্ঠানের ঘোষণা দিয়েছেন। মুক্তধারার বইমেলার একই সময়ে তিনি করবেন দুই দিনের বইমেলা। এই বইমেলার নাম তিনি দিয়েছেন ‘বঙ্গবন্ধু বইমেলা’। তার এসব কর্মকাণ্ড নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহল বিরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছে। একজন বলেছেন, ভদ্রতার খাতিরে তার মতো একজন সম্মাননীয় ব্যক্তি সম্পর্কে আমরা কিছু বলি না। কিন্তু তার অপকর্মগুলো আমাদের অজানা নয়। নিউইয়র্কের একজন কবি-সাংবাদিক লিখেছেন, বইমেলা নিয়ে আবার রাজনীতি কেন? বাংলা বর্ষবরণ ও বইমেলা অরাজনৈতিক বলেই বিবেচিত। নিউইয়র্কে এই প্রথম শুনছি, বইমেলা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারীদের হতে হবে। যারা এই দাবি তুলছেন তারা কট্টর আওয়ামী সমর্থক ও জুলাই বিপ্লবের বিরোধী। যিনি এই দাবিতে পানি ঘোলা করছেন, তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। অনেক বছর ধরে যাদের সঙ্গে তিনি বইমেলার আয়োজনে সম্পৃক্ত ছিলেন, তাদের এখন তিনি মুক্তিযুদ্ধবিরোধী বলে অভিযোগ তুলে আস্ফালন করছেন। হঠাৎ করে তিনি নিউইয়র্ক বইমেলাকে বিতর্কিত ও বিভক্ত করার পথে কেন নামলেন, তা তিনিই ভালো বলতে পারবেন। ড. নবী সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, প্রবাসীদের নামে অনুমোদিত ‘এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক’ থেকে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে। ওই ব্যাংকের তিনি ছিলেন নির্বাহী পরিচালক। দেশের মানুষের বিপুল অর্থ লোপাটের যে কলঙ্ক, তার গায়েও কিন্তু তা লেপ্টে আছে।

সর্বশেষ যা দেখা যাচ্ছে, ড. নূরুন নবী বঙ্গবন্ধু বইমেলার পাশাপাশি ফেসবুকে লাল পোস্টার দিয়ে প্রবাসীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ইউনূস-সমর্থকদের রুখে দাঁড়াতে। তিনি লিখেছেন, ‘প্রবাসে রুখে দাঁড়াও ইউনূস-সমর্থকদের। বাঁচাও বাংলাদেশ।’

নিউইয়র্ক, ১২ মে ২০২৫

সিরিয়ায় ওয়াইপিজির বিলুপ্তি ইরাকের জন্য সতর্কবার্তা

চিন্তার স্বাধীনতা বনাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব

বিধ্বস্ত শিক্ষাব্যবস্থা

ভাষার কোনো বিদেশ নেই, নেই কোনো খাঁচা

নৌবিদ্রোহ ও রাজনীতির বিশ্বাসঘাতকতা

চ্যালেঞ্জের মুখে খামেনির নেতৃত্ব ও ইসলামি বিপ্লব

শব্দের রাজনীতি, ক্ষমতার ভয়

নতুন প্রধানমন্ত্রীর শুরুটা কেমন হলো

কূটনীতিক, পণ্ডিত ও বাংলাদেশের বন্ধু

কৃষি পর্যটন : টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত