জাতি গঠনের এক নীরব স্থপতি

এম-কবির-হাসান
এম কবির হাসান

জাতি গঠনের এক নীরব স্থপতি
শাহ্‌ আবদুল হান্নান

২০২১ সালের ২ জুন বাংলাদেশ তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান ও মহান সেবক শাহ্‌ আবদুল হান্নানকে হারিয়েছে। ১৯৩৯ সালে কিশোরগঞ্জে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি এমন এক প্রজন্মের প্রতিনিধি ছিলেন, যার মূল্যবোধ ও জীবনদৃষ্টি আজ ক্রমেই বিরল হয়ে উঠছে। তিনি আমাদের সময়ে বহন করে এনেছিলেন এক অনন্য জীবনবোধ ও বিশ্বাস, যেখানে জ্ঞান কেবল অর্জনের বিষয় নয়, বরং একটি পবিত্র আমানত; সরকারি দায়িত্ব ব্যক্তিগত সুবিধা নয়, বরং মানুষের কল্যাণে নিবেদিত এক পবিত্র দায়িত্ব; আর জীবনের প্রকৃত সার্থকতা নিহিত রয়েছে এই প্রশ্নে—আমরা কতটা অন্যের জীবনকে সমৃদ্ধ ও আলোকিত করতে পেরেছি। প্রশাসনের উচ্চপদ, প্রজ্ঞার গভীরতা এবং ইসলামি চিন্তার প্রতি অঙ্গীকার—সবকিছুকে তিনি একসূত্রে গেঁথেছিলেন সেবা ও মানবকল্যাণের দর্শনে। তার পরিচয় কেবল একজন সফল আমলা, শিক্ষাবিদ বা চিন্তক হিসেবে নয়; বরং এমন একজন মানুষ হিসেবে, যিনি নিজে আলোকিত হয়েছেন এবং অসংখ্য মানুষকে আলোকিত করেছেন। আজও তার কর্ম, চিন্তা ও আদর্শ নীরবে বহু মানুষের পথচলাকে প্রভাবিত করে চলেছে।

শাহ্‌ আবদুল হান্নানের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৯৪ সালে। তখন আমি বাংলাদেশের প্রথম আর্থিক খাত সংস্কার প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের পরামর্শক হিসেবে দেশে ফিরেছিলাম। প্রকল্পটি ছিল বাংলাদেশ ব্যাংককেন্দ্রিক, আর তিনি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ও সংস্কার প্রচেষ্টার অন্যতম প্রধান নেতৃত্ব। আমি ভেবেছিলাম, একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি; অথচ আমি তখন থেকে তাকে বাস্তবে পেয়েছিলাম একজন প্রাজ্ঞ বন্ধু ও শিক্ষক হিসেবে। সেই যে পরিচয়, তা তার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অটুট ছিল। গবেষণা, জ্ঞানচর্চা, পেশাগত সিদ্ধান্ত কিংবা জীবনের সাধারণ সংকট, অসংখ্য বিষয়ে আমি তার পরামর্শ ও প্রজ্ঞা থেকে উপকৃত হয়েছি। তার মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ আগে আমাদের শেষ কথা হয় ভার্চুয়ালি একটি ভিডিও কনফারেন্সে। তিনি হাসপাতালের শয্যা থেকে আমার সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছিলেন, আর আমি নিউ অরলিন্স থেকে। কিন্তু সেই কথোপকথনে তার অসুস্থতার প্রসঙ্গ তিনি তুলে আনেননি; বরং আমরা আলোচনা করেছিলাম বাংলাদেশে ইসলামি অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বৃহত্তর চিন্তা ও কল্যাণের প্রতি তার নিবেদনই ছিল তার চরিত্রের সবচেয়ে উজ্জ্বল পরিচয়।

বিজ্ঞাপন

শুধু তার সরকারি কর্মজীবন নিয়েই একটি পূর্ণাঙ্গ স্মারক রচনা সম্ভব। তিনি দুর্নীতি দমন ব্যুরোর মহাপরিচালক, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, ব্যাংকিং বিভাগ ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য ও চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার কর্মজীবনের দুটি অবদান আজও নীরবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামোকে প্রভাবিত করছে। মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ব্যবস্থার প্রবর্তন ও বিকাশে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন, যা আজ জাতীয় রাজস্বের অন্যতম ভিত্তি। একইভাবে, ব্যাংক খাতের সংস্কারেও তার অবদান ছিল সুদূরপ্রসারী। প্রজ্ঞা, দক্ষতা ও আপসহীন সততার জন্য তিনি ছিলেন সর্বজনশ্রদ্ধেয়।

এমন এক বাস্তবতায়, যেখানে ক্ষমতা অনেক সময় ব্যক্তিস্বার্থের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, সেখানে তার সততা ছিল সহকর্মী ও সমসাময়িকদের কাছে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। সেটিও তার এক অমলিন উত্তরাধিকার। তবু ভ্যাট ব্যবস্থা বা ব্যাংকিং সংস্কারের জন্যই আমি তাকে সবচেয়ে বেশি স্মরণ করি না, বরং আমি তাকে স্মরণ করি সরকারি দায়িত্বের সীমানার বাইরে, কোনো পদ, প্রতিদান বা আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির প্রত্যাশা ছাড়াই, নীরবে যে মানুষগুলো তিনি গড়ে তুলেছিলেন—তাদের জন্য।

বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের বিকাশে শাহ্‌ আবদুল হান্নান ছিলেন একজন প্রথম পর্যায়ের শীর্ষ অগ্রদূত। তবে তিনি এ কাজ করেছেন কোনো তাৎক্ষণিক আলোড়ন সৃষ্টি করে নয়; বরং একজন দক্ষ স্থপতির মতো ধৈর্য, দূরদর্শিতা ও পরিকল্পনার মাধ্যমে। সরকারি দায়িত্বে থাকাকালে তিনি দেশের প্রথম ইসলামি ব্যাংক তথা ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং ইসলামি ব্যাংকিং কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় আইনগত সংস্কারেও অবদান রাখেন। ডেপুটি গভর্নর থাকাকালে আরো দুটি ইসলামি ব্যাংক লাইসেন্স লাভ করে। কিন্তু তার দূরদৃষ্টি কেবল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। অবসরের পর তিনি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন; একই সঙ্গে ইসলামিক ইকোনমিকস রিসার্চ ব্যুরো এবং সেন্ট্রাল শরিয়াহ বোর্ড ফর ইসলামিক ব্যাংকস অব বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এ খাতের গবেষণা ও নীতিগত ভিত্তিও সুদৃঢ় করেন। তিনি শুধু প্রতিষ্ঠানই গড়ে তোলেননি; বরং নির্মাণ করেছিলেন তার স্থায়িত্বের প্রয়োজনীয় কাঠামোও। তার লক্ষ্য ছিল এমন এক ভিত্তি সৃষ্টি করা, যা কোনো ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল হবে না, বরং সময়ের পরীক্ষায় টিকে থাকবে। আজও সেই কাঠামো কার্যকর, সেই উত্তরাধিকার জীবন্ত; আর সেখানেই প্রতিফলিত হয় তার দূরদর্শিতা, প্রজ্ঞা ও নির্মাণশীল নেতৃত্বের প্রকৃত মহিমা।

শাহ্‌ আবদুল হান্নান ছিলেন একজন প্রখর লেখক, গভীর মননের অধিকারী এবং বিরল দূরদৃষ্টিসম্পন্ন চিন্তাবিদ। তিনি ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞানের মতো সামাজিক বিজ্ঞানগুলোকে পুনর্বিবেচনা ও পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছিলেন। এ লক্ষ্যেই তিনি বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন, সংবাদপত্রে নিয়মিত লিখেছেন এবং জ্ঞানচর্চার পরিসরকে সমৃদ্ধ করেছেন। একদল আলেম ও গবেষকের সহযোগিতায় তিনি বাংলায় ‘Codified Islamic Law’-এর দুই খণ্ড সংকলন ও প্রণয়ন করেন, যেখানে ইসলামি আইনের প্রায় এক হাজার ধারা সুশৃঙ্খলভাবে বিন্যস্ত হয়েছে। পাশাপাশি কোরআনের অর্থনীতি বিষয়ে দুই খণ্ডে গ্রন্থ রচনা করেন। দীর্ঘদিন তিনি উসুল আল-ফিকহ পাঠদান করেছেন এবং নতুন প্রজন্মের চিন্তাশীল আলেম ও গবেষক তৈরিতে অবদান রেখেছেন। তবে তার বিশেষত্ব শুধু লেখালেখি বা গবেষণায় সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং প্রচলিত আলোচনার গণ্ডি অতিক্রম করে মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপনে তার অসাধারণ পারঙ্গমতা ছিল। আমরা সুদ বা রিবার জুলুম ও অন্যায় নিয়ে যথার্থভাবেই আলোচনা করি; কিন্তু তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন আরো গভীরে; আর তা হলো—‘মুনাফা কখন অন্যায়ের রূপ নেয়?’ তিনি একচেটিয়া বাজার, কার্টেল, অযৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ এবং শ্রমিকের অধিকার নিয়ে ব্যাপক ও গভীর আলোচনা উপস্থাপন করেছেন। চিন্তার পরিসরে তিনি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে গেছেন; সেই পথ ধরে অগ্রসর হওয়ার দায়িত্ব এখন আমাদের।

‘উইটনেস পাইওনিয়ার’ নামের বুদ্ধিবৃত্তিক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তিনি যে জ্ঞান-বিতরণ আন্দোলনের সূচনা করেন, তার মধ্য দিয়ে শত শত তরুণ-তরুণীকে তিনি পরামর্শ, দিকনির্দেশনা ও অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। তাদের অনেকেই আজ বিশ্বের নানা প্রান্তে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে কর্মরত ও স্বমহিমায় আলোকিত হয়ে সুবাস ছড়াচ্ছেন।

আমি ইচ্ছাকৃতভাবেই বলছি, তরুণ ও তরুণী; কারণ এ বিষয়ে তিনি তার সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিলেন। তিনি প্রতিভাবান নারীদের পূর্ণ ও সমান অংশগ্রহণে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন। তার কাছে তারা কেবল দর্শক নন, বরং চিন্তা ও নেতৃত্বের সম্ভাব্য পতাকাবাহী। যারা তার বক্তব্য শুনেছেন, তারা কেবল প্রচলিত ধারণা নিয়ে ফিরে যাননি; ফিরে গেছেন বহু পুরোনো অনুমান নড়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে। তারা বুঝেছেন, আমরা যাকে ধর্মীয় অনুশাসন বলে ধরে নিই, তার অনেকটাই আসলে সামাজিক উত্তরাধিকার, যার সঙ্গে ধর্মের মৌলিক সম্পর্ক খুবই সীমিত। তিনি আধুনিক ও ধ্রুপদি জ্ঞানের এমন এক সমন্বয় করেছিলেন, যা তার সমসাময়িকদের মধ্যে বিরল। তিনি মুহাম্মদ আসাদ, ইসমাইল আল-ফারুকী, ইউসুফ আল-কারাদাভী, ড. এম উমর চাপরা, হাশিম কামালীসহ বহু সমকালীন মুসলিম চিন্তাবিদকে গভীরভাবে অধ্যয়ন করতেন; একই সঙ্গে সেক্যুলার শাস্ত্রগুলোকেও সমান গুরুত্ব দিতেন।

তার ছাত্রছাত্রী ও অধীনস্থরা সবসময় একটি কথা বলেন, আমিও তা-ই বলি, তিনি ধর্ম-বর্ণ ও পদমর্যাদা নির্বিশেষে সবাইকে সম্মানের দৃষ্টিতে দেখতেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নরের দায়িত্বে থেকেও সবার জন্য তার দরজা ছিল উন্মুক্ত। যে-ই তার কাছে যেত, সে তার সময় ও মনোযোগ পেত। তার অফিস থেকে কেউ কখনো নিজেকে ছোট মনে করে ফিরে আসত না। তিনি নিজের মত চাপিয়ে দিতেন না, আবার ভিন্নমতকেও কখনো অবজ্ঞা করতেন না। আমাদের এই আত্মবিশ্বাস ও অবজ্ঞার যুগে তার বিনয় ছিল হিমালয়ের মতোই উচ্চ ও অটল।

কিংবদন্তিতুল্য একজন মানুষ তার জীবদ্দশায় এমন বহু সৃজনশীল ও দূরদর্শী কাজ করে থাকেন, যেন তিনি নিজের কর্মের মাধ্যমে এক বিশাল সেতু নির্মাণ করেন, যার ওপর দিয়ে লাখো মানুষের যাতায়াত অব্যাহত থাকে। অথচ এই নির্মাণের আড়ালে থেকে যায় অজানা বহু গল্প, সংগ্রাম ও জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা। শাহ্‌ আবদুল হান্নান তার জীবন উৎসর্গ করেছিলেন ঠিক এমনই এক সেতু নির্মাণে; কিন্তু তিনি কখনো সেই সেতুর পাশে দাঁড়িয়ে কোনোরূপ ‘টোল’ গ্রহণ করেননি।

আমৃত্যু তিনি দুহাত ভরে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন অকৃপণ ও নিঃস্বার্থভাবে। তাই তিনি আমাদের কাছে শুধু একজন ব্যক্তি নন, বরং একটি জীবন্ত প্রতিষ্ঠান, একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত এবং পরম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার নাম।

তার চিরবিদায় আমাদের সামনে গুরুত্বপূর্ণ কতগুলো প্রশ্ন রেখে যায়, আর তা হলো—আমরা কীভাবে তার ঋণ পরিশোধ করব? কেবল তার প্রশংসা ও স্মৃতিচারণের মধ্যেই কি সেই দায় শেষ হবে? নাকি আমরা সেই সেতু দিয়ে কেবল যাতায়াত করেই থেমে থাকব, নাকি সেটিকে আরো প্রসারিত ও শক্তিশালী করে তুলব? আমরা কি তার মতো মানুষ গড়ে তুলতে পারব? তার যে অসমাপ্ত চিন্তা, গবেষণা ও কর্মযজ্ঞ রয়ে গেছে, তাকে কি আমরা একটি পূর্ণাঙ্গ পরিণতির দিকে এগিয়ে নিতে পারব?তিনি যে ন্যায়, মর্যাদা ও অন্তর্ভুক্তির পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন, আমরা কি তা আমাদের বাস্তব জীবনে ধারণ ও রক্ষা করতে সক্ষম হব? অথবা অন্তত আমাদের নিজ নিজ ক্ষুদ্র কর্মক্ষেত্রেও কি আমরা তার সততা ও নৈতিকতার সামান্য অংশ ধারণ করে নেতৃত্ব দিতে পারব? যদি আমরা তা পারি, তবেই সেটি হবে তার প্রতি আমাদের প্রকৃত ও অর্থবহ শ্রদ্ধা নিবেদন।

লেখক : এম কবির হাসান, পিএইচডি, যুক্তরাষ্ট্রের নিউ অরলিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও ফাইন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...