হোম > মতামত

মাদুরোর পর আগ্রাসী ট্রাম্পের মুখোমুখি মোদি

মেনাকা দোশি ও আদভাইত পালেপু

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নরেন্দ্র মোদি

নতুন বছরের শুরুতেই বিশ্বটা যেন দ্রুত বদলাতে শুরু করেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এমনিতেই বেশ কঠিন পরিস্থিতিতে আছেন। গত বছরের চেয়ে এই অবস্থান আরো কঠিন হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দিক থেকে ভারত এরই মধ্যে দু-দুবার বড় ধরনের সতর্কবার্তা পেয়েছে। একটা সাবধান বাণী ছিল একেবারে সরাসরি। এ ঘটনাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বৈশ্বিক রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে যাচ্ছে। ভেনেজুয়ালায় কী ঘটছে এবং সেটা ভারতকে কীভাবে আক্রান্ত করতে পারে, সেদিকেও নজর দেওয়া দরকার। তাছাড়া ভারতে বিলিয়নপতিদের উত্থানের বিষয়েও নজর দেওয়া প্রয়োজন।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রথম সাবধান বাণীটি গেছে সারা বিশ্বের সবার উদ্দেশে। যুক্তরাষ্ট্রের খুবই আগ্রাসী আচরণের পর এই বার্তা দেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার দখল নিয়েছে যেন। এই দেশটি তাদের দীর্ঘদিনের শত্রু। বহু দেশকে যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ বিস্মিত করেছে। এমনকি ডেনমার্কের মতো যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্রও উদ্বেগ জানিয়েছে। ডেনমার্ক যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বারবার আবেদন জানাচ্ছে, যাতে গ্রিনল্যান্ডের ব্যাপারেও একই ধরনের পদক্ষেপ না নেওয়া হয়।

বিশেষজ্ঞরা বুঝতে চেষ্টা করছেন এই কথার অর্থ কী হতে পারে। বাদের আল-সাইফ কুয়েত ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক। চাথাম হাউসের সহযোগী ফেলো হিসেবেও কাজ করছেন তিনি। তিনি ব্লুমবার্গকে বলেন, ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডে দেখা যাচ্ছে একটা সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে। এর অর্থ হলো যুক্তরাষ্ট্র আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অন্য দেশের ওপর আরো বেশিশক্তি আর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সক্রিয় হয়েছে।

ভেনেজুয়েলার ঘটনাপ্রবাহের সরাসরি কোনো অর্থনৈতিক প্রভাব ভারতের ওপর পড়বে না। ভারত আর ভেনেজুয়েলার মধ্যে বাণিজ্যের বেশির ভাগই তেল নিয়ে। তবে, এই বাণিজ্যের পরিমাণ এমনিতেও অনেক কমে এসেছে। নিষেধাজ্ঞার কারণে গত বছরে তেল আমদানির পর দুই-তৃতীয়াংশ কমে গেছে। এখন দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ৩৪০ মিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি।

কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, কিছু ভারতীয় কোম্পানি হয়তো পরে লাভবান হতে পারে। রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ হয়তো ভেনেজুয়েলার সস্তা অপরিশোধিত তেল কেনার সুযোগ পেতে পারে। আরেকটি কোম্পানি হলো ওএনজিসি। দক্ষিণ আমেরিকায় উৎপাদনকেন্দ্রিক বেশ কিছু পাওনা রয়েছে তাদের। এই অর্থ তারা হয়তো উদ্ধার করতে পারবে। কিন্তু এসব সুবিধা অনেক দূরের বিষয়। ভেনেজুয়েলায় আমেরিকার স্বার্থ ঠিকঠাকমতো মিটলেই শুধু এসব সুযোগের দরজা খুলতে পারে। ভারতকে লাইনে দাঁড়িয়ে এ জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

ভারত যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে দ্বিতীয় সতর্কবার্তাও পেয়েছে। কথাটা বলা হয়েছে একেবারে সরাসরি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভারতকে রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল কেনা বন্ধ করতে বলেছেন। ভারত যদি সেটা না করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের হার এমনকি আরো বেড়ে যেতে পারে। এটাকে সরাসরি হুমকিই বলা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন একটি বিল নিয়ে আলোচনার সময় এই কথোপকথন হয়। এই বিলের লক্ষ্য রাশিয়ার সব অপরিশোধিত তেল বিক্রি বন্ধ করা। এর মাধ্যমে রাশিয়ার অর্থের সব উৎস বন্ধ করে ইউক্রেন যুদ্ধ থামাতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।

ডিসেম্বরে ভারতে রাশিয়ার তেলের প্রবাহ কমেছে। তিন বছরের মধ্যে কেনা তেলের হার সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যাচ্ছিল। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এরপরও খুশি নন। ভারতের চেষ্টা তাকে আশ্বস্ত করেনি। সে কারণে ভারতের ওপর বড় অঙ্কের শুল্ক এখনো কার্যকর রয়েছে। অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ কর দিতে হচ্ছে তাদের। সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা ভারতীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক দিতে হচ্ছে দিল্লিকে।

নতুন বছরে ভারত বহু পুরোনো আর কঠিন এক সমস্যায় পড়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে কীভাবে শান্তি বজায় রাখবে তারা? যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার। অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে ভারতকে এই বাজার রক্ষা করতেই হবে। একই সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে পুরোনো সম্পর্কটাও বজায় রাখতে চায় ভারত। চীনের সঙ্গে এক ধরনের সুসম্পর্ক ঠিক রাখতে চায় তারা।

এই ভারসাম্য বজায় রাখাটা কঠিন। আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কতদূর পর্যন্ত যেতে পারেন। পুরো বিশ্বটাই নিজের মতো করে সাজাতে চান তিনি। ভারতকে অবশ্যই এই নতুন ব্যবস্থা সতর্কতার সঙ্গে পাড়ি দিতে হবে।

আরেকটি ভিন্ন গল্পের দিকে দৃষ্টি দেওয়া যাক। বিশ্ব রাজনীতি যেখানে উত্তপ্ত, সেখানে ভারতে সম্পদের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে। মুম্বাইয়ে ব্লুমবার্গের রিপোর্টার হিসেবে কাজ করছেন আদভাইত পালেপু। ভারতের নতুন গড়ে ওঠা বিলিয়নপতিদের ওপর নজর রাখছেন তিনি।

মহামারির পর থেকে পুঁজিবাজারের আকার বাড়ছে। এ কারণে ২০২৫ সালে প্রত্যেক ছয় সপ্তাহে ভারতে নতুন নতুন বিলিয়নপতির জন্ম হয়েছে। এই হারটা বেশ দ্রুতগতির। ভারত এখন বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ। সম্পদ ব্যবস্থাপনার দিক থেকেও বিশ্বের অন্যতম বড় বাজার এখন তারা।

২০২৪ সালে ভারতে বিলিয়নপতি ছিল ১৮৮ জনের মতো। মিলিয়নপতি রয়েছে ৯১৭ হাজার। এই সংখ্যাটা এসেছে ইউবিএসের প্রতিবেদনে। সম্পদের এই বৃদ্ধির কারণে অর্থ-সংক্রান্ত উপদেষ্টাদের চাহিদা ব্যাপক বেড়ে গেছে। মানুষের এখন অর্থকেন্দ্রিক পরিকল্পনা দরকার। বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র দরকার। বহু ফার্ম এভাবে আকারে বেড়েছে। বহু বিশেষজ্ঞ সেই সঙ্গে তাদের পরামর্শ ব্যবসারও প্রসার ঘটিয়েছেন।

নতুন বিলিয়নপতিদের একজন অজয় ভারদাজ। তিনি ব্যাঙ্গালুরুর বাসিন্দা। অ্যানথিম বায়োসায়েন্সের ৫৩ শতাংশ শেয়ার তার আর তার ছেলের। এই কোম্পানি ওষুধ আর রাসায়নিক উৎপাদন করে। ইনিশিয়াল পাবলিক অফারিংয়ের (আইপিও) মাধ্যমে তারা জুলাই মাসে ৩৯৫ মিলিয়ন ডলার উত্তোলন করেছে। ওই সময়টায় কোম্পানিটি প্রথম তাদের শেয়ার প্রকাশ্যে জনগণের কাছে বিক্রি করেছে। এখন তাদের মূল্য দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার।

সম্পদ ব্যবস্থাপকরা এখন ভারদ্বাজের মতো ব্যক্তির সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। মতিলাল অসওয়াল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের সিইও অজয় মেনন। তিনি জানান, উচ্চমানের ব্যবসা এবং শক্ত পুঁজিবাজারের কারণে তাদের কোম্পানির প্রতি মালিকরা আকৃষ্ট হবে।

২০২৫ সালে ভারতে আইপিওর পরিমাণ বেড়ে রেকর্ড ২২ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে পৌঁছেছে। পুঁজিবাজারে যোগ দেওয়ার সময় এক বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদের অধিকারী কোম্পানির সংখ্যা ছিল ২২টির মতো। ২০২৪ সালে এই ধরনের কোম্পানির সংখ্যা হয়েছে ২৯। বিলিয়ন ডলারের কোম্পানির সংখ্যা কম হলেও নতুন বিলিয়নপতি প্রতিষ্ঠাতার সংখ্যা বেড়েছে বেশি। ২০২৪ সালে এই ধরনের প্রতিষ্ঠাতার সংখ্যা ছিল সাতজন। ২০২৫ সালে সেটা হয়েছেন ৯ জন।

২০২৪ সালে বেশির ভাগ নতুন বিলিয়নপতি এসেছিলেন জ্বালানি আর সবুজ জ্বালানি কোম্পানিগুলো থেকে। ২০২৫ সালে নেতৃত্ব নিয়েছে প্রযুক্তি কোম্পানি। আলাখ পাণ্ডে আর প্রতীক বুব মিলে প্রতিষ্ঠা করেছেন ফিজিকসওয়ালাহ। তাদের কোম্পানি নভেম্বরে ৩৯২ মিলিয়ন ডলার উত্তোলন করেছে। এই প্রতিষ্ঠাতাদের প্রত্যেকেরই সম্পদ এখন দেড় বিলিয়ন ডলারের মতো।

আলাখ পাণ্ডের গল্পটা মজার। তার বয়স ৩৩ বছর। কলেজে থাকতেই লেখাপড়া ছেড়ে দিয়েছেন। ২০১৬ সালে ফিজিকসওয়ালাহ শুরু করেছিলেন তিনি। শুরুতে এটা ছিল একটা ইউটিউব চ্যানেল মাত্র। হাইস্কুলের শিক্ষার্থীদের ইঞ্জিনিয়ারিং পরীক্ষার জন্য সাহায্য করতেন তিনি। চ্যানেলটা দ্রুত বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে এসে ওয়েস্টব্রিজ ক্যাপিটাল আর লাইটস্পিড ভেনচার্জের মতো ফার্মগুলো এই ব্যবসায় অর্থ বিনিয়োগ করে।

গত বছরে আরো কিছু প্রযুক্তি খাতের ব্যক্তিরা বিলিয়নপতি হয়েছেন। ডিজিটাল ব্রোকারেজ কোম্পানি ‘গ্রোও’-এর প্রধান ললিত কেশরে তাদের একজন। অনলাইন স্টোর মিশোর সিইও ভিদিত আত্রেও এই তালিকায় আছেন। অন্যান্য শিল্প থেকেও অনেকে এই তালিকায় যুক্ত হয়েছেন।

সম্পদ বাড়লেও ঝুঁকিতে আছে বেশ কিছু খাত। বিমান পরিবহন খাতে ৯০ শতাংশ আসনের নিয়ন্ত্রণ এখন চলে গেছে দুটো এয়ারলাইনসের হাতে। ফলে পুরো সিস্টেমটা নড়বড়ে হয়ে গেছে। এই খাতে সামান্য যেকোনো সমস্যা হলে পুরো দেশ একটা বড় ঝাঁকি খাবে।

ভারত একটা বড় পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র আর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চাপ এখন তাদের ওপর। আবার একই সময় তাদের নাগরিকরা দেশের ভেতরে সম্পদ গড়ে তুলছে। কীভাবে এই দ্বিমুখী বাস্তবতা মোকাবিলা করবে ভারত, সেটাই ঠিক করে দেবে দেশের ভবিষ্যৎ।

ব্লুমবার্গ অবলম্বনে জুলফিকার হায়দার

বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক অবনমনে ভারতের দায়

পাতানো নির্বাচনের শঙ্কা ও গণভোটে ঘনঘটা

ড্রামাটিক ডেকাপিটেশন স্ট্রাইক ও মাদুরোকে তুলে আনা মাস্তানি কেন?

এনসিপি-জামায়াত সমঝোতা কেন?

ভেনেজুয়েলায় আগ্রাসন ও বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা

তারেক রহমানকেই রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করতে হবে

যেভাবে হতে পারে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং

ওসমান হাদির সাংস্কৃতিক আন্দোলন

ইউজিসির গবেষণা ফান্ড বরাদ্দে বৈষম্য কেন?

ক্যাম্পাস থেকে ক্ষমতার করিডর