হোম > মতামত

স্বচ্ছ নির্বাচন অনুষ্ঠানে প্রযুক্তির ব্যবস্থাপনা

মাহমুদুল হাসান

বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের ‘স্মার্ট ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট’ নামক একটি অ্যাপ রয়েছে, যার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে নির্বাচনের সময় প্রার্থীদের তথ্য সাধারণ ভোটারদের কাছে উপস্থাপন করা। এই অ্যাপের মাধ্যমে প্রার্থীদের হলফনামা, আয়কর রিটার্নের প্রমাণপত্র, নির্বাচনী খরচ, ব্যক্তিগত সম্পদের হিসাবসহ গুরুত্বপূর্ণ সব তথ্য সরাসরি জনগণের দৃষ্টিগোচর হয়। একইসঙ্গে কোন ভোটার কোন কেন্দ্রে ভোট দেবেন, তাও এই অ্যাপেই জানা যায়। এতে একটি এক নজরের পাতাও রয়েছে, যেখানে ভোটারসংখ্যা, তাদের মধ্যে নারী, পুরুষ ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের পরিসংখ্যান, ভোটদানের ন্যূনতম বয়স, নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা, প্রার্থীদের সংখ্যা ও তাদের বয়স প্রভৃতি উপস্থাপন করা হয়।

অ্যাপটিতে একটি নোটিস বোর্ডও আছে, যেখানে বিভিন্ন সময়ে নির্বাচন-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বা নির্দেশনা নোটিস আকারে প্রকাশ করা হয়। ভোটের দিনে ও প্রতি ঘণ্টায় বিভিন্ন কেন্দ্রে কত ভোট পড়েছে, তার আপডেট দেওয়ার ব্যবস্থাও আছে এবং নির্বাচন শেষে কেন্দ্রভিত্তিক ফল ও চূড়ান্ত ফলও এখানে আপলোড করা হয়। তবে এই ফলাফলের সত্যতা যাচাই করার কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা এই অ্যাপে নেই। কারণ কোনো রাজনৈতিক দলের এজেন্টের সত্যায়ন এ ফলাফলে থাকে না এবং সেইসঙ্গে কোনো নির্বাচনী কর্মকর্তা ভুল বা ইচ্ছাকৃতভাবে ফলাফল আপলোড করেছেন কি না, তা জানানোরও কোনো উপায় রাখা হয়নি।

ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, এত টাকা ব্যয় করে এই অ্যাপটি তৈরি করার তাৎপর্য কী? অনেকেই মনে করেন, এটি স্বৈরাচারী সরকারের তৈরি একটি যন্ত্র, যার কোনো কার্যকর প্রয়োগ নেই, বরং এটি বাতিলযোগ্য। অন্য অনেক স্বৈরাচারী উদ্যোগের মতো এটিকেও বাতিলের খাতায় ফেলা উচিত বলে অনেকে মনে করেন। তবে একটি বিদ্যমান প্রযুক্তিগত প্ল্যাটফর্মকে পরিপূর্ণতা দেওয়ার মাধ্যমে নির্বাচনকে আরো স্বচ্ছ ও কার্যকর করা সম্ভব। এজন্য কিছু প্রয়োজনীয় আপগ্রেডেশন জরুরি।

আমরা দেখছি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সরকারের আলোচনা চলছে এবং সরকারও নির্বাচনের প্রস্তুতির কথা বলছে। বিএনপি ডিসেম্বরে এবং জামায়াত আগামী রমজানের আগে নির্বাচন চায়। ধারণা করা যায় নির্বাচন ২০২৬ সালের এপ্রিলের মধ্যে অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এমনকি তার আগেও হতে পারে। ধরে নেওয়া যাক, ডিসেম্বরেই নির্বাচন হবে, তা হলে হাতে অন্তত আট মাস সময় থাকছে। এই সময়ের মধ্যেই অ্যাপটিকে কাঙ্ক্ষিত উন্নত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। এখন আসা যাক, অ্যাপটিতে কী করতে হবে সে বিষয়ের আলাপে।

প্রথমত, নির্বাচনের আগে প্রার্থীদের যাচাই-বাছাইয়ের সময় অ্যাপটিকে আরো কার্যকর কীভাবে করা যায়, তা নিয়ে ভাবতে হবে। বহু প্রার্থী আচরণবিধি লঙ্ঘন করেন, কিন্তু সঠিক প্রমাণের অভাবে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যায় না। তাই এই অ্যাপে একটি অপশন যোগ করা যেতে পারে, যেখানে নাগরিকরা প্রার্থীর আচরণবিধি ভঙ্গের ছবি কিংবা ভিডিও সরাসরি অ্যাপ থেকেই ধারণ করে আপলোড করতে পারবেন। তবে শর্ত থাকবে, শুধু অ্যাপের লাইভ রেকর্ড অপশন থেকেই ছবি বা ভিডিও আপলোড করা যাবে, আগে ধারণকৃত কোনো কনটেন্ট যেন আপলোড করা না যায়। এতে ভুয়া ভিডিও ছড়িয়ে কোনো প্রার্থীকে বদনাম করার সুযোগ থাকবে না। এতে দুটি সুবিধা হবে—ওই প্রার্থী সম্পর্কে জনগণ সচেতন হবে, তার কৃতকর্মের একটি প্রমাণও থাকবে এবং দুর্নীতিপরায়ণ ও অযোগ্য ব্যক্তিকে ভোট প্রদানে মানুষ নিরুৎসাহিত হবে।

এ ছাড়া মনোনয়নপত্র জমা, কাগজপত্র আবার আপলোড, প্রতীক বরাদ্দ, প্রার্থিতা প্রত্যাহার, আপিল ও আপিল নিষ্পত্তি—সবকিছু অ্যাপের মাধ্যমে করা সম্ভব হলে নির্বাচন কমিশন অফিসে ভিড় এবং মনোনয়নপত্র জমাকে কেন্দ্র করে সহিংসতা কমবে। পাশাপাশি কোনো প্রার্থী যখন কোনো তথ্য সাবমিট করবেন, তা যেন সঙ্গে সঙ্গে অ্যাপে দৃশ্যমান হয়। এতে যদি কোনো প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল হয়, তবে জনগণ তাৎক্ষণিকভাবে দেখতে পারবে তার কাগজপত্রে সমস্যা ছিল কি না, নাকি নির্বাচনী কর্মকর্তা কোনো পক্ষকে সুবিধা দিতে এমনটি করেছেন। এতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি দুই-ই নিশ্চিত হবে। পাশাপাশি বাতিলকৃত প্রার্থীরা বা অন্য কেউ যদি কোনো বিষয়ে আপিল করতে চান, তবে তাদের নির্বাচন অফিসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হবে না। নির্বাচন কর্মকর্তা অ্যাপের মাধ্যমে ভিডিও কনফারেন্সে শুনানি করতে পারেন বা প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট অ্যাপ থেকেই সংগ্রহ করতে পারেন। তারপরও কোনো জটিলতা থাকলে আইনি পথ তো খোলা আছেই।

এবার আসা যাক ভোটের দিনের প্রসঙ্গে। এই দিন অ্যাপটি হতে পারে একান্তভাবে স্বচ্ছতার হাতিয়ার। যেমন প্রতিটি ভোটকেন্দ্রের প্রতিটি বুথে বিভিন্ন দলের এজেন্ট থাকে। কিন্তু ভোট গণনার সময় সাধারণত সব ব্যালট এক জায়গায় এনে গণনা করা হয়। এই স্থানান্তরের সময়ই অনেক দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়। তাই অ্যাপে এমন ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে যে বুথে যে এজেন্ট উপস্থিত ছিলেন, সেই বুথেই ভোট গণনা হবে এবং সে বুথ থেকেই অ্যাপে ফলাফল আপডেট করা হবে। ট্র্যাকিংয়ের জন্য এক্ষেত্রে জিপিএস ট্র্যাকিং ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কারণ যে ডিভাইস থেকে ফলাফল আপলোড করা হবে, সেটিই জিপিএস গ্রহণে সক্ষম। যে বুথের ফলাফল আপলোড করা হবে শুধু ওই বুথের এজেন্টরা অ্যাপে ডিজিটাল সত্যায়ন করবেন। এখন যেমন কাগজে স্বাক্ষর করানো হয়, সেভাবে অ্যাপে তা হয় না। ফলে কেউ চাইলে ইচ্ছামতো তথ্য পরিবর্তন করে দিতে পারে। সে কারণে কিছু কাজ আগেই করে রাখা যেতে পারে অ্যাপটির মাধ্যমে।

প্রার্থীরা অ্যাপে তাদের এজেন্টদের নাম, ভোটার আইডি ও অন্য প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে বুথভিত্তিক নিবন্ধন করবেন। কে কোন বুথে এজেন্ট হচ্ছেন, তা আগেই অ্যাপে প্রকাশিত থাকবে। এক্ষেত্রে কয়েকজনকে বিকল্প রাখার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। ভোটের দিন নির্বাচন কর্মকর্তা কেন্দ্রে তা যাচাই করে কে কোন দলের প্রার্থীর এজেন্ট তা প্রমাণিত করে সংশ্লিষ্ট বুথে ওই এজেন্টকে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেবেন। এরপর সকালবেলায় নির্বাচন কর্মকর্তা ভোট গ্রহণের আগে বুথে উপস্থিত সব এজেন্টের ফিঙ্গার প্রিন্ট নিয়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করবেন এবং ভোটগ্রহণ শেষে আবার একবার হাজিরা নেবেন। যেহেতু নির্বাচন কমিশনের কাছে আগেই ভোটারদের বায়োমেট্রিক তথ্য সংরক্ষিত আছে, তাই এতে আলাদা করে কিছুই করতে হবে না, শুধু ফিচারটি অ্যাপে যুক্ত করলেই চলবে।

পরে ফল ঘোষণার সময় উপস্থিত সব এজেন্টের ফিঙ্গারপ্রিন্ট সত্যায়ন না হলে ফলাফল কেন্দ্রীয় সার্ভারে পাঠানো যাবে না, এমন ব্যবস্থা রাখতে হবে। কারণ দেখা যায়, অনেক সময় সকালবেলায় হাজিরা দেওয়া এজেন্টকে সন্ত্রাসী দ্বারা কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হয়। কিন্তু যদি সত্যায়ন ছাড়া ফলাফল পাঠানো না যায়, তাহলে কেউ কোনো দলের এজেন্টকে বের করে দেওয়ার সাহস পাবে না। এতে কেন্দ্র দখলের চেষ্টা ও সহিংসতা অনেকাংশে কমে যাবে।

সবশেষে চূড়ান্ত ফলাফল অ্যাপেই প্রদর্শিত হবে এবং সেই ফলাফল যেন সরাসরি উপজেলা, জেলা এবং বিভাগীয় ও কেন্দ্রীয় কমিশনের সার্ভারে চলে যায় এবং কেউ যেন তা পরিবর্তন করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে অ্যাপটি থেকে বুথভিত্তিক ফলাফলের ডিজিটালি সত্যায়িত একটি পিডিএফ কপি সংশ্লিষ্ট প্রার্থী ও তাদের এজেন্টদের যোগাযোগ মাধ্যমে পৌঁছে যাবে। অ্যাপের নির্বাচনি আসনভিত্তিক ফলাফলের ড্যাশবোর্ডের প্রথম পৃষ্ঠায় বুথ ও কেন্দ্রভিত্তিক ভোটের মোট হিসাব প্রকাশযোগ্য হতে হবে এবং তা অটোমেটেড এক্সেল ফরম্যাটে ডাউনলোডের উপযোগী হতে হবে।

যদি এ প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাটি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কারচুপি, সহিংসতা ও হানাহানির মতো দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে। তবে এই কর্মসূচি কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যেগুলোর সঠিক সমাধান প্রয়োজন।

প্রথমত, ভোটকেন্দ্রগুলোয় নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। নির্বাচনের পূর্ববর্তী সময়কে বিবেচনায় নিলে এ চ্যালেঞ্জটি অতিক্রম করা কঠিন কিছু নয়, বরং কার্যকর পরিকল্পনার মাধ্যমেই এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব। দ্বিতীয়ত, যেহেতু নির্বাচন চলাকালে অ্যাপটির মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক নির্বাচন কর্মকর্তা কাজ করবেন, তাই অ্যাপটিকে দিনভর কার্যক্ষম রাখতে হবে। যদি অ্যাপটি অতিরিক্ত চাপ সহ্য করতে না পারে, তাহলে ফলাফল প্রাপ্তিতে অনাকাঙ্ক্ষিত বিলম্ব হতে পারে। এজন্য অ্যাপটি তৈরি ও পরীক্ষামূলকভাবে চালনার সময় থেকেই এর সক্ষমতা, স্থিতিশীলতা ও নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করা আবশ্যক।

তৃতীয়ত, হ্যাকিংয়ের সম্ভাবনা রোধে সর্বোচ্চ সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি রাজনৈতিক দলের প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের এ সিকিউরিটি ফিচার সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা প্রদান করা উচিত, যাতে তারা আস্থা অর্জন করতে পারেন। তবে যে গুরুত্বপূর্ণ আশঙ্কাটি থেকে যায় তা হলো, কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে ভোটারদের কেন্দ্রে আসতে বাধা দেওয়া। এই হুমকি প্রতিহত করতে সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, আনসার ও সাধারণ জনগণের সমন্বয়ে শক্তিশালী নিরাপত্তা ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। দূরদর্শী পরিকল্পনা ও আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমেই বাংলাদেশে একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দেওয়া সম্ভব।

লেখক : পিএইচডি গবেষক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সিরিয়ায় ওয়াইপিজির বিলুপ্তি ইরাকের জন্য সতর্কবার্তা

চিন্তার স্বাধীনতা বনাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব

বিধ্বস্ত শিক্ষাব্যবস্থা

ভাষার কোনো বিদেশ নেই, নেই কোনো খাঁচা

নৌবিদ্রোহ ও রাজনীতির বিশ্বাসঘাতকতা

চ্যালেঞ্জের মুখে খামেনির নেতৃত্ব ও ইসলামি বিপ্লব

শব্দের রাজনীতি, ক্ষমতার ভয়

নতুন প্রধানমন্ত্রীর শুরুটা কেমন হলো

কূটনীতিক, পণ্ডিত ও বাংলাদেশের বন্ধু

কৃষি পর্যটন : টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত