হোম > মতামত

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক সুনামি

এলাহী নেওয়াজ খান

আরব বসন্ত থেকে দক্ষিণ এশিয়ার জেন-জি সুনামি। যাকে বলা হয় তরুণদের ডিজিটাল রাজনীতি, যা সূচিত হয়েছিল ১৯১১ সালের ডিসেম্বরে তিউনিসিয়ায়। তারপর তা ছড়িয়ে পড়েছিল উত্তর আফ্রিকা থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশে। সেই পৃথিবী কাঁপানো বসন্ত বিপ্লবের ১৩ বছর পর একই স্টাইলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় একের পর এক ঘটে চলেছে তরুণ প্রজন্মের সুনামি। তাদের তোড়ে ভেসে গেছে স্বৈরশাসকদের সিংহাসন। কিন্তু আরব বসন্ত পরবর্তী অভিজ্ঞতার আলোকে দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তনগুলোর পরিণতি কী হতে পারে, তা নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা।

এই যে বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লবের কথাই ধরা যাক। এই বিপ্লব আমাদের মনোজগতে বিপুল পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তুললেও কেন যেন তার প্রাণশক্তি ক্রমান্বয়ে হারিয়ে যাচ্ছে। বিপ্লবোত্তর ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার তীব্র অনৈক্য এবং অনেক ক্ষেত্রে একে অন্যের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ প্রকাশ পরিস্থিতিকে আরো নাজুক করে তুলেছে। দেখে-শুনে মনে হচ্ছে, আরব বসন্তের ব্যর্থতার আরেকটি নজির ঘটতে যাচ্ছে এখানে।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আরব বসন্তের ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা থেকে প্রশ্ন তুলেছেন, কেন তরুণদের ডিজিটাল রাজনীতিবঞ্চিত মানুষদের ক্রোধে আগুন জ্বালাতে পারছে, কিন্তু রূপান্তর ঘটাতে পারছে না? যদিও এই তরুণরা প্রমাণ করেছে, তারা সরকারের পরিবর্তন ঘটাতে পারে। কিন্তু আরব বসন্তের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যাচ্ছে, সংগঠন, আদর্শ ও অর্থনৈতিক রূপান্তর ছাড়া তাদের এই বিপ্লব কার্যত পুরোনো দুর্নীতিগ্রস্ত এবং শোষণমূলক ব্যবস্থাকেই আরো শক্তিশালী করে তুলছে। তাই দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে তরুণসমাজের আন্দোলনের মুখে সাম্প্রতিক সরকার পরিবর্তনের ঘটনাবলির সঙ্গে আরব বসন্তের তুলনামূলক পর্যালোচনা করে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন, এই জেন-জি জেনারেশন অবহেলিত ও বঞ্চিত মানুষদের অন্তরে ক্রোধের আগুন জ্বালাতে পেরেছে ঠিকই; কিন্তু কার্যকর রূপান্তর করতে কতটা সফল হবে, তা এখন দেখার বিষয়।

তারা মনে করেন, আরব বসন্ত-পরবর্তী সময়ে দেখা গেছে, সাংগঠনিক কাঠামোর অভাব, সুদৃঢ় আদর্শগত অবস্থানের দুর্বলতা ও অর্থনৈতিক রূপান্তর ছাড়াই এই জেন-জি জেনারেশন সরকারের পতন ঘটাতে সক্ষম হলেও প্রচলিত সামাজিক ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে বিপ্লবোত্তর পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় সংস্কার করার ব্যর্থতা। তাছাড়া প্রশাসনের ভেতরে বসে থাকা ফ্যাসিবাদের দোসরদের অপসারণ না করার ফলে বিপ্লবের মূল চেতনা দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যায়। এ কারণে পুরোনো ব্যবস্থা আরো কঠিনভাবে ফিরিয়ে আনতে বেগ পেতে হয়নি কুশীলবদের। আরব বসন্তের ব্যর্থতা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে তাই দেখিয়ে দিয়েছে।

নিশ্চয়ই তিউনিসিয়ার মোহাম্মদ বোয়াজিজি নামের সেই ফল বিক্রেতার কথা হয়তো অনেকের মনে আছে। সেটি ছিল ১৯১১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের ঘটনা। সুশিক্ষিত এই যুবক রাজপথে ফল বিক্রি করে জীবন নির্বাহ করতেন। কিন্তু একদিন তিনি পুলিশের দুর্নীতি ও নির্যাতনের প্রতিবাদে গায়ে আগুন ধরিয়ে আত্মাহুতি দিলে তা অতিদ্রুত সরকারের বিরুদ্ধে গণবিদ্রোহে রূপ নেয়। তরুণসমাজ জেগে ওঠে বিদ্রোহের আগুন নিয়ে, যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে। আলজেরিয়া, ইয়েমেন, মিসর, জর্দান, ওমানসহ অনেক দেশে। গণবিদ্রোহের প্রচণ্ড চাপে তিউনিসিয়ার স্বৈরশাসক প্রেসিডেন্ট আবেদীন বেন আলি গদি ছেড়ে সৌদি আরব আশ্রয় গ্রহণ করতে বাধ্য হন।

ওদিকে একই ঘটনা ঘটে মিসরে। গণআন্দোলনের মুখে সে দেশের একনায়ক হোসনি মোবারক পদত্যাগ করেন এবং কারাগারের নির্জন কক্ষ তার শেষ আবাসস্থল হয়। কিন্তু পরে দেখা গেছে, তিউনিসিয়া ও মিসরে কোনো যুগান্তকারী কোনো পরিবর্তন তো ঘটেইনি; বরং প্রচলিত শাসনব্যবস্থা আরো কঠোর রূপ নিয়ে ফিরে এসেছে।

এখন তিউনিসিয়া ও মিসরের রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাব, ওই দুটি দেশে ফ্যাসিবাদী শাসন আরো কঠোরভাবে গেড়ে বসেছে। আরব বসন্তের পর তিউনিসিয়ায় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ভালোভাবেই শুরু হয়েছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে তা আবার ফিরে যেতে থাকে কর্তৃত্ববাদী শাসনের দিকে। বর্তমানে দেশটির প্রেসিডেন্ট কায়েস সাঈদ এমন এক ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম করেছে, যেখানে বিরোধী দলের ওপর নিপীড়ন ও নির্যাতন সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে।

একই পরিস্থিতি আরো কঠোরভাবে সংঘটিত হয়েছে মিসরের রাজনীতিতে। সেখানেও গণঅভ্যুত্থানের মুখে দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসক হোসনি মোবারক ক্ষমতাচ্যুত হলে গণতন্ত্রের অভিযাত্রাটা শুরু হয়েছিল ভালোভাবেই। কিন্তু গণতন্ত্রের সেই সুবাতাস বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। কারণ ক্ষমতালোভী মিসরের সেনাপ্রধান আবদেল ফাততাহ আল-সিসি, যিনি স্বৈরশাসন থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণের পথ সহজ করে দিয়েছিলেন, তিনিই শেষ পর্যন্ত নির্বাচিত মুরসি সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করে ফেলেন। তিনি ক্ষমতা দখল করে ক্ষান্ত হননি, প্রতিষ্ঠা করেছেন একনায়কতন্ত্র।

এখন দেখা যাচ্ছে, উভয় দেশে বিপ্লবের পর নির্বাচনে ইসলামপন্থিরা বিজয়ী হয়েছিল। তবে তিউনিসিয়ার ক্ষেত্রে ফল ছিল একটু মিশ্র। সেখানে মূলত ইসলাম ও মধ্যপন্থিরা বিজয়ী হয়েছিল। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে লুকিয়ে থাকা দুর্নীতিগ্রস্ত এলিট শ্রেণির কাছে এই ফল মনঃপূত হয়নি। আর বিপ্লবের পর যেহেতু প্রশাসনে কোনো সংস্কার আনা হয়নি, সেহেতু আগের রিজিমের আমলারাই বহাল ছিলেন। পরে তারাই মূলত সেক্যুলার রাজনৈতিক নেতাদের সহায়তায় দেশকে আবার অতীতের ফ্যাসিবাদী শাসনে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।

অন্যদিকে মিসরের নির্বাচনে মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতারাই জয়লাভ করেছিলেন। তাদের দলের নাম ছিল ‘ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি’। মোহাম্মদ মুরসি ছিলেন সেই দলের নেতা। ২০১২ সালের ৩০ জুন অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মো. মুরসি বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। তার শাসনের এক বছরের মাথায় আন্দোলনের দোহাই দিয়ে সেনাপ্রধান জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি ক্ষমতা দখল করে ফেলেন এবং কারারুদ্ধ করা হয় প্রেসিডেন্ট মুরসিকে। অভিযোগ রয়েছে, মোহাম্মদ মুরসি বিনাচিকিৎসায় কারাগারেই মৃত্যুবরণ করেন।

আরব বসন্তের ব্যর্থতার কারণগুলো নির্ণয় করে আমরা যদি ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে ধারণ ও বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থতার পরিচয় দিই, তাহলে ১৮ কোটি মানুষের এই দেশ এমন এক রক্তাক্ত সংঘাতের দিকে এগিয়ে যাবে, যা আমাদের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বকে বিপন্ন করে তুলবে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক

পিলখানার অসমাপ্ত অধ্যায়

হাদি হত্যায় ভারত এবং গোয়েন্দা স্লিপার সেল

ইচ্ছাকৃত রাজনৈতিক সংকট

সিরিয়ায় ওয়াইপিজির বিলুপ্তি ইরাকের জন্য সতর্কবার্তা

চিন্তার স্বাধীনতা বনাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব

বিধ্বস্ত শিক্ষাব্যবস্থা

ভাষার কোনো বিদেশ নেই, নেই কোনো খাঁচা

নৌবিদ্রোহ ও রাজনীতির বিশ্বাসঘাতকতা

চ্যালেঞ্জের মুখে খামেনির নেতৃত্ব ও ইসলামি বিপ্লব

শব্দের রাজনীতি, ক্ষমতার ভয়