হোম > মতামত

ফ্যাসিবাদের গুলির শিকার মুসা খানদের আত্মত্যাগ

ফরিদা আখতার

ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ছাত্র-জনতা মাঠে নেমেছিল, তাদের হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না, কিন্তু ছিল দৃঢ় মনোবল এবং ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্ত হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। তৎকালীন ফ্যাসিবাদী সরকার তার পুলিশ বাহিনী দিয়ে নির্বিচার হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। গুলি মেরে ঝাঁজরা করে দিয়েছে হাজারো তরুণ প্রাণ।

আমরা তাদের নাম পাই নানাভাবে। গুলিতে আহত বা নিহত হওয়ার ঘটনাও শুনি। এগুলো সহ্য করা কঠিন। জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শহীদ পরিবারের মা-বাবা, ভাইবোনের সঙ্গে দেখা হয়। তাদের করুণ চোখে পানি দেখি, কিন্তু কোনো ক্ষোভ দেখি না। তারা শহীদ সন্তান বাবা-মা– এই গৌরব তারা বোঝে। আমাদের কর্তব্য হচ্ছে শহীদের রক্তের মর্যাদা রক্ষা করা।

আহতদের দেখেছি দেশের হাসপাতালে। কেউ চোখ হারিয়েছেন, কেউ পা বা হাত। পেটের মধ্য দিয়ে গুলি ভেদ করে বের হয়েছে, কিংবা ভেতরেই রয়ে গেছেÑ এমন বহু ঘটনা আছে। জুলাই মাসে আহতরা হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা পেতে বেগ পেতে হয়েছে। সেখানেও আক্রমণ হয়েছে। তবুও এ দেশের ডাক্তাররা যথাসম্ভব চেষ্টা করেছেন চিকিৎসা দিয়ে প্রাণ বাঁচানোর।

আগস্টের ৫ তারিখে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে গিয়েছেন। গঠিত হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। নতুন করে দেশ গড়ার বিশাল দায়িত্ব কাঁধে। তবে একটি কথা বলব, এ সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজের মধ্যে অন্যতম প্রধান কাজ হচ্ছে, শহীদ পরিবারকে সহায়তা করা এবং আহতদের দেশে এমনকি প্রয়োজনে বিদেশে পাঠিয়েও চিকিৎসা করানো। বেশ কয়েকজন আহতকে সরকারের উদ্যোগে সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক ইত্যাদি দেশে পাঠানো হয়েছে।

পুলিশের নির্মম গুলি থেকে শিশুরাও রক্ষা পায়নি। তেমনি এক আহত শিশুর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে ৭ জানুয়ারি। নাম তার বাসিত খান মুসা। সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি হাসপাতালের কেবিনের সামনে নামফলকে লেখা মুসা খান। এত ভারিক্কি নাম হলেও বয়স মাত্র ছয় বছর।

হেসে-খেলে-দুষ্টামি করে বেড়াত এই ছেলেটি রামপুরা বনশ্রীতে মেরাদিয়া হাট এলাকায় তার বাসায় তার মা, বাবা দাদির সঙ্গে। কিন্তু গত ১৯ জুলাই, ২০২৪ সালের বিকাল ৩টা ৩০ মিনিটের পর তার জীবন পাল্টে গেছে। সে তার দাদির সঙ্গে বাসার নিচে গিয়েছিল, এমন সময় পুলিশের গুলি এসে লাগে তার মাথায়। সেই গুলি তার মাথা ভেদ করে দাদির গায়ে গিয়ে লাগে। দাদি (৫০) পরদিন ২০ জুলাই সকালে মারা যান। পত্রপত্রিকায়ও তার খবর এসেছে।

বাবা মুস্তাফিজুর রহমান খান এবং মা নিশা খান দুজন তরুণ-তরুণী সন্তানের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পড়ে রয়েছেন সেই তখন থেকে। প্রথমে ঢাকায় সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসার পর বর্তমানে সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে আছেন। এখানে ডা. অধ্যাপক ভিনসেন্ট এনজিএ তার চিকিৎসার দায়িত্বে আছেন।

ডা. ভিনসেন্ট ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি হাসপাতালের অ্যাডাল্ট এবং পিডিয়াট্রিক সিনিয়র কনসালট্যান্ট নিউরো সার্জন। নিউরো সার্জন হিসেবে তার সুখ্যাতি রয়েছে। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সহায়তায় মুসা এখানে আসতে পেরেছে। সরকার তার চিকিৎসার খরচ বহন করছে।

মুসার মাথার বাঁদিক ঢেবে আছে। তাই ডানদিকের হাত-পা সবকিছু অবশ হয়ে আছে। এখন সে চারদিকে তাকিয়ে দেখে, কিন্তু কিছু বোঝে কি না বলা মুশকিল। নিশা বলছিলেন, মনে হয় কখনও সে মা-বাবাকে চেনে আবার কখনও মনে হয় চেনে না। তবুও আলহামদুলিল্লাহ, নিশা বললেন, আমার বাচ্চা রিকভার করছে।

সিঙ্গাপুরে আমি অন্য একটি কাজে গিয়েছিলাম। হাসপাতালে জুলাই আন্দোলনের আহতদের মধ্যে একজন এখনও হাসপাতালে আছে শুনে দেখতে গিয়েছিলাম। সঙ্গে ছিলেন কবি ফরহাদ মজহার এবং মেজর (অব) আহমদ ফেরদৌস।

আমি ডাক্তার ভিনসেন্টের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছি। তিনি জানালেন, আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যে মুসার মাথায় কৃত্রিম খুলি প্রতিস্থাপন করে তার ব্রেইনের চিকিৎসা করবেন। এতে তার ডান দিকের অবশ ভাব কেটে গেলে, তাকে দেশে পাঠানো যাবে দীর্ঘ মেয়াদের চিকিৎসার জন্য। তার অর্থোপেডিক চিকিৎসাও লাগবে।

মুস্তাফিজ তার ইলেকট্রনিকসের ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে গত অক্টোবর থাকে সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে নিশা ও মুসার সঙ্গে পড়ে আছেন। তার আয়-রোজগার সব বন্ধ। তবুও ছেলের সুস্থতার জন্য সবকিছু মেনে নিয়েছে। নিশা এবং মুস্তাফিজ হাসপাতালেই থাকেন, কেবিনে একটি সোফা আছে, সেখানেই রাতে পালা করে ঘুমান।

খাওয়া-দাওয়া বাইরে থেকে কিনে খেতে হয়। মুসার খাবার হাসপাতাল থেকেই দেয়। এখন সে শুধু নাক দিয়ে পাইপের মাধ্যমে দুধ খেয়ে বেঁচে আছে। তার বিছানার সামনের দেয়ালে টিভিতে কার্টুন চলছে। সেদিকেই সে চেয়ে আছে। মাঝেমধ্যে বা হাত ও পা হাল্কাভাবে নাড়ছে।

জুলাই অভ্যুত্থানে ছাত্র ও সাধারণ মানুষ অনেক শহীদ হয়েছেন, অনেকেই আহত হয়েছেন। প্রত্যেকেরই অবস্থা খুব কষ্টের। মুসার মতো বয়সের তিনজন শিশু শহীদের নাম পাওয়া যায় যেমন রিয়া গোপ (৬), জাবির ইব্রাহিম (৬) এবং আবদুল আহাদ (৪)। পুলিশের হিংস্র থাবা থেকে এই শিশুরা রেহাই পায়নি।

এত কষ্টের মধ্যেও অন্য সবার মতোই মুস্তাফিজুর ও নিশাকে অভিযোগ করতে দেখলাম না। নতুন বাংলাদেশের জন্য তাদের এই আত্মত্যাগ জাতি মনে রাখবে।

মুসা সুস্থ হয়ে উঠুক, এই কামনা করি।

সিরিয়ায় ওয়াইপিজির বিলুপ্তি ইরাকের জন্য সতর্কবার্তা

চিন্তার স্বাধীনতা বনাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব

বিধ্বস্ত শিক্ষাব্যবস্থা

ভাষার কোনো বিদেশ নেই, নেই কোনো খাঁচা

নৌবিদ্রোহ ও রাজনীতির বিশ্বাসঘাতকতা

চ্যালেঞ্জের মুখে খামেনির নেতৃত্ব ও ইসলামি বিপ্লব

শব্দের রাজনীতি, ক্ষমতার ভয়

নতুন প্রধানমন্ত্রীর শুরুটা কেমন হলো

কূটনীতিক, পণ্ডিত ও বাংলাদেশের বন্ধু

কৃষি পর্যটন : টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত